- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২৪, ২০২৬
অমরনাথ যাত্রায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়, মোতায়েন এক লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী
আর মাত্র কয়েক দিন। তার পরই শুরু হবে হিমালয়ের কোলে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় তীর্থযাত্রা— অমরনাথ যাত্রা। কিন্তু এ বার শুধু আধ্যাত্মিক আবেগ নয়, সমানভাবে আলোচনায় নিরাপত্তা। কারণ, এবারের অমরনাথ যাত্রাকে ঘিরে যে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে, তা যাত্রার ইতিহাসে নজিরবিহীন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে খবর, এ বছর যাত্রার নিরাপত্তার দায়িত্বে মোতায়েন করা হচ্ছে ৬৭০-রও বেশি কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ)। এর সঙ্গে থাকছেন ভারতীয় সেনাবাহিনী, জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ, রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। সব মিলিয়ে উপত্যকাজুড়ে অন্তত এক লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকবেন বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। গত বছর যেখানে প্রায় ৫৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী দায়িত্বে ছিল, সেখানে এ বার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭০-এ। ফলে কার্যত দুর্গে পরিণত হতে চলেছে অমরনাথ যাত্রাপথ এবং তার সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা।
৩ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ৫৭ দিনের অমরনাথ যাত্রা। দক্ষিণ কাশ্মীরের ৩,৮৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পবিত্র গুহা-মন্দিরে পৌঁছতে ভক্তদের জন্য থাকবে দুই পথ— অনন্তনাগ জেলার ঐতিহ্যবাহী ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নুনওয়ান-পহেলগাম রুট এবং গান্দেরবাল জেলার তুলনামূলক ছোটো, কিন্তু অধিক দুর্গম ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বালতাল রুট। এই পথ ধরে প্রায় ট্রেক করে পৌঁছতে হয় অমরনাথ গুহায়। ২৮ অগস্ট রাখিবন্ধনের দিন শেষ হবে এ বছরের যাত্রা। শ্রী অমরনাথজি শ্রাইন বোর্ড সূত্রে খবর, গত সপ্তাহ পর্যন্ত সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি তীর্থযাত্রী ইতিমধ্যেই নাম নথিভুক্ত করেছেন। সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। যাত্রা শুরুর আগে একাধিক উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকের পর কেন্দ্র বিপুল বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মূল্যায়ন অনুযায়ী, উপত্যকায় জঙ্গি হুমকি এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পারাপারের অনুপ্রবেশের চেষ্টা ও জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কাকে মাথায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সূত্রের খবর, নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন শুরু হয়ে যাবে যাত্রা শুরুর অনেক আগেই। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তীর্থযাত্রীরা উপত্যকায় পৌঁছনোর আগেই গোটা নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকর হয়ে যাবে। লক্ষণপুর থেকে শুরু করে জম্মুর ভগবতী নগর যাত্রী নিবাস, পাঠানকোট-জম্মু মহাসড়ক, জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়ক, বিভিন্ন ট্রানজিট ক্যাম্প, নুনওয়ান ও বালতাল বেস ক্যাম্প, রেল স্টেশন এবং শেষ পর্যন্ত গুহামন্দির— সর্বত্রই থাকবে কড়া নজরদারি। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘রোড ওপেনিং পার্টি’ বা আরওপি-র উপর। প্রতিদিন ভোরে তীর্থযাত্রীদের কনভয় যাত্রা শুরু হওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ দল রাস্তা পরীক্ষা করে দেখবে। কোথাও বিস্ফোরক পোঁতা রয়েছে কি না, সন্দেহজনক গতিবিধি চোখে পড়ছে কি না, কোনও জঙ্গি হুমকি রয়েছে কি না— সব কিছু নিশ্চিত করার পরেই এগোতে দেওয়া হবে যাত্রীবাহী যানবাহনকে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি এবার যাত্রী পরিষেবার উন্নয়নেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অমরনাথ যাত্রাকে আরও সুসংগঠিত ও ভক্তবান্ধব করতে একাধিক নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জম্মুর ভগবতী নগর যাত্রী নিবাস ৩০ জুন থেকে খুলে দেওয়া হবে। প্রায় আড়াই হাজার তীর্থযাত্রীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। ভিড় বাড়লে অতিরিক্ত আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হবে। খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসা, নিরাপত্তা— সব ধরনের পরিষেবা এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যেই যাত্রাপথের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়েছে লঙ্গরখানা, চিকিৎসা শিবির ও অস্থায়ী বিশ্রাম কেন্দ্র। দুর্গম পাহাড়ি আবহাওয়া এবং হঠাৎ তাপমাত্রা হ্রাসের কথা মাথায় রেখে ভক্তদের পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, বৃষ্টির সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক এবং উদ্ধারকারী দলগুলিকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য।
‘অন-দ্য-স্পট রেজিস্ট্রেশন’ প্রক্রিয়াকেও অনেক সহজ করা হয়েছে। জম্মুর তাওয়ি অঞ্চলে তৈরি হয়েছে সমন্বিত সহায়তা কেন্দ্র। সেখানে নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট সংগ্রহ, নথি যাচাই-সহ যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ এক ছাদের তলায় সম্পন্ন করা যাবে। এদিকে, জম্মু ও শ্রীনগরের মধ্যে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা চালু হওয়ার পর এ বছর যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি ভক্ত অমরনাথ যাত্রার জন্য নাম নথিভুক্ত করেছেন। ফলে রেলপথের নিরাপত্তাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রেললাইন, সেতু, টানেল এবং অন্যান্য রেল অবকাঠামোতেও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আরপিএফ এবং গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাত্রী ও রেল সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
অন্যদিকে, যাত্রাপথের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে মোতায়েন থাকবে ভারতীয় সেনাবাহিনী। সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ, জঙ্গি তৎপরতা অথবা পাহাড়ি রুট ব্যবহার করে হামলার যে কোনো সম্ভাবনা রুখতেই এ ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী মূলত যাত্রাপথের উঁচু কৌশলগত অবস্থানগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখবে। একই সঙ্গে সেনা, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের মধ্যে ‘রিয়েল-টাইম’ সমন্বয় নিশ্চিত করতে বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। উপত্যকার প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অমরনাথ যাত্রাকে ঘিরে এত বিস্তৃত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি আর দেখা যায়নি। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম, নতুন রেল সংযোগ, দীর্ঘায়িত যাত্রা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ— সব কিছু মাথায় রেখেই এ বার কার্যত সামরিক কৌশলে সাজানো হয়েছে অমরনাথ যাত্রার গোটা রূপরেখা। কেন্দ্রের আশা, এ বছরের অমরনাথ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ ভাবেই সম্পন্ন হবে।
❤ Support Us






