Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ২৪, ২০২৬

হড়পা বান, ধসের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত অরুণাচল। ভেসে গেল বাড়ি-সেতু, নিখোঁজ অন্তত বহু। অসমে চরম সতর্কতা জারি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হড়পা বান, ধসের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত অরুণাচল। ভেসে গেল বাড়ি-সেতু, নিখোঁজ অন্তত বহু। অসমে চরম সতর্কতা জারি

মাত্র দেড়-দু ঘণ্টার প্রবল বর্ষণ । আর তাতেই বিপর্যস্ত অরুণাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা । পাহাড়ি নদীর ফুলেফেঁপে ওঠা স্রোত, হড়পা বান, ধস আর কাদামাটির ঢলে কার্যত লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে সুবনসিরি ও কেয়ি পানিয়র জেলার একাধিক গ্রাম। ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর, কৃষিজমি, উপড়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা । বুধবার পর্যন্ত অন্তত তিন জনের নিখোঁজ থাকার খবর মিলেছে । পরিস্থিতির জেরে উদ্বেগ ছড়িয়েছে প্রতিবেশী অসমেও । উজানের জল নেমে এলে ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির জলস্তর দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের ।

অরুণাচলের বিপর্যয়ের নামে মঙ্গলবার ভোরে । ইটানগরের আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন সুবনসিরি জেলার ইয়াজালি এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৭২.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে । আপাতদৃষ্টিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এ অঞ্চলে খুব অস্বাভাবিক না-হলেও আবহাওয়াবিদদের নজর কেড়েছে বৃষ্টির ধরন । কারণ, বৃষ্টির বেশিরভাগ ঝরেছে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে । রাডার ও উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সবচেয়ে প্রবল বর্ষণ হয়েছে সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির জল পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসতেই নদী ও ঝরনাগুলির জলধারণ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে । তার পরেই শুরু হয় হড়পা বানের তাণ্ডব ।

সর্বপ্রথম বিপর্যয়ের কবলে পড়ে তোরু অঞ্চলের লুকসিন, ইয়িয়ে-১ এবং ইয়িয়ে-২ গ্রাম । স্থানীয়দের দাবি, সকাল সাড়ে ৬টার কিছু পর থেকেই আচমকা জল ঢুকতে শুরু করে । চোখের পলকে নদীর জল ফুলে ওঠে। ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে কাদা-মেশানো স্রোত । বহু কৃষক দেখেন, তাঁদের ফসলের জমি মুহূর্তের মধ্যে নদীর অংশে পরিণত হয়েছে । প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্টে জানা গিয়েছে, লুকসিন গ্রামের একাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । শুধু বসতবাড়িই নয়, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কৃষি ও উদ্যানপালন ক্ষেত্রেও । আনারস, কলা, কমলালেবুর বাগান ও অন্যান্য চাষের জমি জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে । অরুণাচল প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। সমীক্ষার কাজ চলছে ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইয়িয়ে গ্রাম । জানা যাচ্ছে, মুহূর্তেই গ্রামটির বিস্তীর্ণ অংশ জলের তলায় চলে যায় । যদিও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ করায় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে । তাঁদের অনেককে প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে । প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি । তবে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে কেয়ি পানিয়র জেলার ইয়াজালির ৪৩ কিলোমিটার এলাকায় অবস্থিত এনইইপিসিও কলোনিতে । বুধবার সকালে প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের জেরে সেখানে বিশাল ভূমিধস নামে । পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে ফেলে আবাসিক এলাকা, রাস্তা আর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ।

স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, অন্তত ১৮টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেসে গিয়েছে বা ধসে পড়েছে । ধ্বংস হয়েছে ১৫টিরও বেশি আবাসিক কোয়ার্টার । উদ্ধারকারী দল তাঁদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে । তবে লাগাতার বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে । জেলার ডেপুটি কমিশনার শ্বেতা নাগারকোটি জানিয়েছেন, ধসের জেরে এলাকার একটি হেলিপ্যাডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । ফলে সেনাবাহিনী এবং ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে । ইয়াজালির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সেতু জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে । ফলে বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে । প্রশাসন বিকল্প রাস্তার সন্ধান করছে, যদিও পাহাড়ি অঞ্চলে সেই কাজ সহজ নয়। যদিও, ইতিমধ্যেই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (এসডিআরএফ) দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে ।

অন্যদিকে, প্রবল বর্ষণের অভিঘাত পড়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ জাতীয় সড়ক ৩১৫(এ)-তেও। অসমের ডিব্রুগড় এবং অরুণাচলের তিরাপ জেলার মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী এ সড়কের তিনটি অংশে ব্যাপক ধস নেমেছে । জয়পুর বনাঞ্চলের কাঠালগুড়ি বিট অফিস সংলগ্ন এলাকায় রাস্তা খাদে তলিয়ে গিয়েছে । কোথাও কোথাও সড়কের প্রায় অর্ধেকটাই ধসে পড়েছে । উদ্বেগের বিষয়, দিহিং-পাটকাই জাতীয় উদ্যানের ভিতর দিয়ে যাওয়া এ রাস্তার সম্প্রসারণ ও সংস্কারের কাজ মাত্র গত বছর শেষ হয়েছিল। এক বছরের মধ্যেই তা ধসের কবলে পড়ল । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রশাসন জয়পুর-কাঠালগুড়ি অংশে সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আরও বৃষ্টি হলে তিরাপ জেলার সঙ্গে অসমের একমাত্র সরাসরি সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে । বিপাকে পড়তে পারেন খোঁসা, দেওমালি, নামসাং-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা । বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ অসমের ডিব্রুগড় ও তিনসুকিয়ার উপর নির্ভরশীল। সড়ক বিচ্ছিন্ন হলে তাঁদের জীবনযাত্রা কার্যত থমকে যেতে পারে ।

অরুণাচলের পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে অসম সরকারও। কারণ, উজানে প্রবল বর্ষণের ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। অসম সরকারের তরফে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইয়াজালি এলাকায় আকস্মিক জলবৃদ্ধির ফলে ‘পানিয়র লোয়ার হাইড্রোইলেকট্রিক’ প্রকল্পে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি গেট খুলে জল ছাড়তে হয়েছে। অসম সরকারের আশঙ্কা, ধেমাজি, লখিমপুর, বিশ্বনাথ ও শোণিতপুর জেলায় আগামী কয়েক দিনে নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে পারে। জেলা প্রশাসনগুলিকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকা ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এনডিআরএফ, এসডিআরএফ-সহ জরুরি পরিষেবা সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে প্লাবিত এলাকায় না যেতে, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়াতে, ব্রহ্মপুত্র বা অন্য নদীতে ছোট নৌকা ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এ ঘটনা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ‘চরম আবহাওয়া’-র আরও একটি উদাহরণ। স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি নদীর আচমকা ফুলে ওঠা এবং ধস— তিনের সম্মিলিত অভিঘাত আগামী দিনেও বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, অরুণাচল প্রদেশ, অসম সংলগ্ন এলাকায় আগামী কয়েক দিন আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিপর্যস্ত অঞ্চলে স্বস্তি ফেরার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!