- দে । শ
- আগস্ট ৬, ২০২৬
যৌন নির্যাতন মামলায় দোষী সাব্যস্ত ‘তেহেলকা’-র প্রাক্তন সম্পাদক তরুণ তেজপাল
‘তেহেলকা’ সংবাদপত্রের প্রাক্তন সম্পাদক তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের বহুচর্চিত যৌননির্যাতন মামলায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, বৃহস্পতিবার বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ২০২১ সালে গোয়ার ট্রায়াল কোর্ট যে রায়ে তেজপালকে বেকসুর খালাস দিয়েছিল, সে রায়কে আইনসঙ্গত নয় বলে ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এর ফলে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এ মামলায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
বিচারপতি ড. নীলা গোখলে, বিচারপতি অমিত জামসানদেকরের ডিভিশন বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানির পর এদিন রায় ঘোষণা করে। হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিম্ন আদালত অভিযোগকারিণীর আচরণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন কিছু পূর্বধারণা ও সামাজিক স্টিরিওটাইপের উপর নির্ভর করেছে, যা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
মামলার সূত্রপাত ২০১৩ সালের নভেম্বরে। সে সময় গোয়ায় ‘তেহেলকা’ আয়োজিত ‘থিঙ্কফেস্ট’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন সংস্থার বহু কর্মী ও অতিথি। অভিযোগ, অনুষ্ঠানের ফাঁকে একটি বিলাসবহুল হোটেলের লিফটের ভিতরে তৎকালীন সম্পাদক তরুণ তেজপাল তাঁর এক জুনিয়র মহিলা সহকর্মীকে যৌন নির্যাতন করেন। অভিযোগকারিণী পরে সংস্থার অভ্যন্তরীণ ই-মেল মারফত ঘটনার বিবরণ দেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়া পুলিশ মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। পরে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় তেজপালের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
২০১৭ সালে গোয়ার ম্যাপুসার সেশনস কোর্টে এই মামলার বিচারপর্ব শুরু হয়। দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানির পর ২০২১ সালে আদালত তরুণ তেজপালকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেয়। সে রায়ে আদালত অভিযোগকারিণীর আচরণ ও ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং প্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করে। তবে, আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট হয়নি গোয়া সরকার। নিম্ন আদালতের পর্যবেক্ষণকে আইন ও প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যা বলে দাবি করে সরকার বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চে আপিল দায়ের করে।
হাইকোর্টে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। শুনানির সময় তিনি যুক্তি দেন, ট্রায়াল কোর্ট ধর্ষণের অভিযোগ বিচার করার সময় অভিযোগকারিণীর আচরণকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ধারণার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছে, যা আইনসম্মত নয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, যৌন নির্যাতনের শিকার প্রত্যেক মানুষের প্রতিক্রিয়া একরকম হয় না। কারও শিক্ষা, মানসিক গঠন, সামাজিক অবস্থান, কর্মক্ষেত্র ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তাঁর আচরণ ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো নির্যাতিতা ঘটনার পর কীভাবে আচরণ করবেন, তার কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড হতে পারে না। মেহতার যুক্তি ছিল, নিম্ন আদালত অভিযোগকারিণীর আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অস্বাভাবিক’ বলে বিচার করে ভুল করেছে। আদালতের দায়িত্ব প্রমাণের মূল্যায়ন করা, কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে ভুক্তভোগীর আচরণ মিলিয়ে দেখা নয়।
দীর্ঘ শুনানির শেষে হাইকোর্ট গোয়া সরকারের সে যুক্তি গ্রহণ করে। আদালত জানায়, নিম্ন আদালতের রায়ে আইনি ত্রুটি রয়েছে, সে কারণে খালাসের রায় বহাল রাখা সম্ভব নয়। ফলে ২০২১ সালের রায় বাতিল করে তরুণ তেজপালকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই রায়ের পরই আদালতে তুষার মেহতা তেজপালের অবিলম্বে গ্রেফতারের আবেদন জানান। আদালতে তিনি বলেন, অভিযোগকারিণী তাঁর মেয়ের বয়সী ছিলেন এবং কর্মক্ষেত্রে তিনি একজন পিতৃসুলভ অবস্থানে ছিলেন। সে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এমন অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। আদালতের মাধ্যমে সমাজের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা যাওয়া প্রয়োজন যে, কোনও নারী ‘না’ বললে তার অর্থ ‘না’— সে সম্মতি অগ্রাহ্য করার কোনো অধিকার কারও নেই।
অন্যদিকে, সাজা ঘোষণার আগে আদালতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তরুণ তেজপাল নিজের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের আবেদন জানান। তিনি বলেন, তাঁর বয়স এখন ৬২ বছর। তিনি নিজেকে একজন ভুক্তভোগী বলেই মনে করেন। তাঁর পরিবার রয়েছে। আদালতের কাছে তিনি দয়া প্রদর্শনের অনুরোধ জানান। পাশাপাশি ইঙ্গিত দেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিলের পথও খোলা রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত করার রায় ঘোষণার পর আদালত জানায়, শাস্তির পরিমাণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ঘোষণা করা হবে। সে রায়ের দিকেই এখন নজর আইনি মহল ও দেশজুড়ে এই বহুচর্চিত মামলার পর্যবেক্ষকদের।
❤ Support Us






