- দে । শ
- নভেম্বর ৬, ২০২৬
শরণার্থী অভিবাসন নীতিতে সংশোধন কেন্দ্রের, নেপাল-ভুটান যাতায়াতেও বদলাল নিয়ম
অভিবাসন নীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। একদিকে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নিয়ম আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া কয়েকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত বিধিতে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষত, ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করা কিছু নাগরিকের পাসপোর্ট পুনর্নবীকরণের ক্ষেত্রে শিথিলতা আনা হয়েছে। পাশাপাশি, ধর্মীয় নিপীড়নের আশঙ্কায় ভারতে আশ্রয় নেওয়া ছয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের জন্যও বিশেষ বিধান বহাল রেখেছে কেন্দ্র।
২০২৫ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স (এক্সেম্পশন) অর্ডার’-এর একাধিক ধারায় সংশোধন এনে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। বুধবার, ৪ নভেম্বর প্রকাশিত ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স (এক্সেম্পশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডার, ২০২৬’-এ এই পরিবর্তনগুলির কথা জানানো হয়েছে। ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর ৩৩ নম্বর ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ সংশোধনী এনেছে কেন্দ্র। নতুন নির্দেশিকায় এক দিকে ভারত, নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপারের নিয়মে পরিবর্তন করা হয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের ভারতে বসবাস ও ভ্রমণ সংক্রান্ত নথির ক্ষেত্রেও ছাড় ও শর্ত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করা কিছু নাগরিক তাঁদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট বা ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি পুনর্নবীকরণ করতে না পারলে বিশেষ ছাড় পাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের কাছেই পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘কম্পিউটারাইজ়ড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড’ (সিএনআইসি) নেই। ফলে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ কিংবা পুরনো নথি পুনর্নবীকরণ করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পাসপোর্ট পুনর্নবীকরণের সাধারণ বাধ্যবাধকতা থেকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই সুবিধা নিঃশর্ত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পাকিস্তানে বিয়ে করে থাকলে কিংবা সে দেশে তাঁদের স্থাবর সম্পত্তি থাকলে এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না। ভবিষ্যতে আর পাকিস্তানে ফিরে যাবেন না, এই মর্মে তাঁদের লিখিত অঙ্গীকারও দিতে হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি অভিযোগ কিংবা নিরাপত্তা সংস্থার আপত্তি থাকা চলবে না। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করলেও প্রত্যেক পাকিস্তানি নাগরিক এ সুবিধা পাবেন না। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলেই কেবল পাসপোর্ট পুনর্নবীকরণ সংক্রান্ত বিধিতে ছাড় মিলবে।
পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসা ছয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের জন্যও বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা বহাল রেখেছে কেন্দ্র। যে সব সম্প্রদায়ের, যে সমস্ত মানুষ ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে অথবা নিপীড়নের আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই বিধান কার্যকর হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর অথবা তার আগে ভারতে প্রবেশ করতে হবে। ছাড়ের আওতায় থাকবেন এমন ব্যক্তিরাও, যাঁরা বৈধ পাসপোর্ট কিংবা ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। প্রবেশের সময় বৈধ নথি থাকলেও পরে তার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে একই সুবিধা প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, নথির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আইনি বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। তবে ভারতে প্রবেশের পর অনির্দিষ্ট কাল বসবাসের সুযোগ থাকছে না। এ দেশে থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপযুক্ত শ্রেণির ভিসা সংগ্রহ করতে হবে। সংশোধিত নির্দেশিকায় এই শর্ত স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতেও ছয়টি সম্প্রদায়ের নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নতুন সংশোধনীতে সে সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে ২০১৯ সালের ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ বা ‘সিএএ’-র যোগ রয়েছে। ওই আইনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা ছয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছিল। তবে ‘সিএএ’-র ক্ষেত্রে ভারতে প্রবেশের নির্ধারিত সময়সীমা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক অভিবাসন নির্দেশিকায় বিশেষ ছাড়ের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরকে শেষ সময়সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি বিধানের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের ক্ষেত্র এক নয়। সংশোধিত নির্দেশিকায় শ্রীলঙ্কার তামিল শরণার্থীদের জন্যও আগের বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৯ জানুয়ারি বা তার আগে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নথিভুক্ত শ্রীলঙ্কার তামিল নাগরিকেরা বৈধ পাসপোর্ট, ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি কিংবা ভিসা না থাকলেও নির্দিষ্ট আইনি ছাড় পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসকারী এই শরণার্থীদের ক্ষেত্রে নথিপত্র সংক্রান্ত জটিলতা যাতে নতুন করে সমস্যার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়টিও সংশোধিত নির্দেশিকায় বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তিব্বতি নাগরিকদের জন্যও বিশেষ বিধান রয়েছে। ১৯৫৯ সালের পর থেকে ২০০৩ সালের ৩০ মে-র আগে কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসের দেওয়া ‘এন্ট্রি পারমিট’ নিয়ে ভারতে প্রবেশ করা তিব্বতিরা নতুন ছাড়ের আওতায় থাকবেন। একই ভাবে, ২০০৩ সালের ৩০ মে-র পরে বিশেষ প্রবেশ অনুমতিপত্র নিয়ে ভারত-নেপাল সীমান্তের নির্দিষ্ট অভিবাসন কেন্দ্র দিয়ে ভারতে প্রবেশ করা তিব্বতি নাগরিকেরাও সুবিধা পাবেন। তবে তাঁদের সংশ্লিষ্ট নথিভুক্তিকরণ আধিকারিকের কাছে নাম নথিভুক্ত করাতে হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া, কর্তব্যরত অবস্থায় ভারতে প্রবেশ কিংবা দেশ ছাড়ার সময় ভারতীয় স্থলসেনা, নৌসেনা ও বায়ুসেনার সদস্যদের জন্য পাসপোর্ট ও ভ্রমণ নথি সংক্রান্ত বিশেষ ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। সরকারি পরিবহণে তাঁদের সঙ্গে যাতায়াত করা পরিবারের সদস্যেরাও এইসুবিধা পাবেন। মেরামতির জন্য ভারতে আসা বিদেশি সামরিক জাহাজের নাবিকদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ছাড় থাকবে। তবে তাঁদের সংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য মিলিটারি শিপ রিপেয়ার পারমিট থাকতে হবে।
অভিবাসন নীতির সংশোধনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ভারত, নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপার সংক্রান্ত। এত দিন এই তিন দেশের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট সংক্রান্ত যে বিশেষ ছাড় ছিল, তা বহাল থাকলেও পরিচয় যাচাইয়ের নিয়ম আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, নেপাল বা ভুটানে যাওয়া কিংবা সেখান থেকে ভারতে ফেরার সময় ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা ম্যানুয়ালে উল্লিখিত পরিচয়পত্রগুলির মধ্যে যে কোনো একটি দেখাতে হবে। স্থলপথে হোক বা আকাশপথে, উভয় ক্ষেত্রেই এই নিয়ম কার্যকর হবে। অভিবাসন আধিকারিকেরা পরিচয় যাচাইয়ের জন্য যে তথ্য চাইবেন, তা-ও দিতে হবে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে। একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও। ভারতে প্রবেশ কিংবা ভারত থেকে বেরোনোর সময় তাঁদের ভিসা ম্যানুয়ালে নির্দিষ্ট পরিচয়পত্রগুলির মধ্যে যে কোনো একটি পেশ করতে হবে। অভিবাসন আধিকারিকেরা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে চাইলে তা দিতে হবে। অর্থাৎ, ভারত-নেপাল এবং ভারত-ভুটান সীমান্তে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও আনুষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক করা হল।
তবে এই বিশেষ ছাড়ের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে যাতায়াত করা যাবে না। কোনো ভারতীয় নাগরিক নেপাল বা ভুটানের সীমান্ত ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে যেতে চাইলে তাঁকে বৈধ পাসপোর্ট রাখতে হবে। একই ভাবে, নেপাল ও ভুটানের নাগরিকেরা ভারতকে ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে যাতায়াত করতে চাইলে তাঁদের ক্ষেত্রেও পাসপোর্টের বাধ্যবাধকতা থাকবে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিবাসন কেন্দ্র দিয়েই ভারতে প্রবেশ কিংবা দেশ ছাড়তে হবে ভারতীয় নাগরিকদের। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত হয়েছে নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের জন্য। চিন, ম্যাকাও, হংকং কিংবা পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করলে অথবা ওই দেশগুলির কোনো একটির মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করলে তাঁদের বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা — দুটিই থাকতে হবে। অর্থাৎ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সরাসরি যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে বিশেষ ছাড় রয়েছে, তা এই দেশগুলির মধ্যে দিয়ে আসা বা তৃতীয় দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।
সংশোধিত নির্দেশিকায় আরও কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশভাগের সময় পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর পুনরায় ভারতে ফিরে এসে কেরালায় বসবাস শুরু করা কয়েকটি শ্রেণির মানুষ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমন কিছু ব্যক্তি, যাঁরা পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, কিন্তু নিজেদের পাসপোর্ট পুনর্নবীকরণ করতে পারছেন না, তাঁদের জন্যও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এই শ্রেণির ব্যক্তিদের ভারতে বসবাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত শ্রেণির ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।নতুন সংশোধনীতে ‘ভিসা ম্যানুয়াল’-এর একটি আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞাও যুক্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত ওই ম্যানুয়ালে ভিসা, অভিবাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশিকা ও নিয়মাবলি রয়েছে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের নাগরিকদের সীমান্ত পারাপারের সময় কোন পরিচয়পত্র গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই ম্যানুয়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স (এক্সেম্পশন) অর্ডার’-এর মাধ্যমে পাসপোর্ট ও বিদেশি নাগরিক সংক্রান্ত একাধিক পুরনো বিজ্ঞপ্তিকে একত্রিত করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এ বার সে নির্দেশিকায় নতুন করে সংশোধন এনে এক দিকে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের নিয়ম কঠোর ও নির্দিষ্ট করা হল, অন্যদিকে শরণার্থী, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসকারী কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের নথিপত্র সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হলো।
❤ Support Us






