- বি। দে । শ
- জুন ১৫, ২০২৬
‘ক্রিস্টিজ়’-এর নিলামে বাংলার শিল্পের জয়যাত্রা ! গুডরিকের শিল্পসংগ্রহ বিক্রি ২৪০ কোটিরও বেশি টাকায়, শীর্ষে গণেশ পাইন, অবনীন্দ্রনাথ
লন্ডনের সাংস্কৃতিক মহলে দক্ষিণ এশীয় শিল্পের জয়জয়কার। আর সেই উজ্জ্বল অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলা। ব্রিটিশ নিলাম সংস্থা ‘ক্রিস্টিজ়-এর হাত ধরে লন্ডনে গড়ে উঠল নতুন ইতিহাস। একক সংগ্রহ থেকে আয় হলো ১ কোটি ৮৯ লক্ষ ১০ হাজার পাউন্ড, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২৪০ কোটি টাকার সমান। নিলামে উঠেছিল গুডরিক বা ক্যামেলিয়া সংগ্রহের ৯৩টি শিল্পকর্ম। বিক্রি হয়েছে প্রতিটি কাজই। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত দর ছাড়িয়ে গিয়েছে অনুমিত মূল্যকে বহু গুণ।
দক্ষিণ এশীয় আধুনিক শিল্পের ক্ষেত্রে ‘ক্রিস্টিজ়’-এর ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ বিক্রির নজির। এক লহমায় তৈরি হয়েছে ১৭টি নতুন বিশ্বরেকর্ড। আর সে তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছেন বাংলার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী গণেশ পাইন। দীর্ঘ সাত বছর পর লন্ডনে দক্ষিণ এশীয় শিল্পের নিলাম নিয়ে ফিরেছিল ‘ক্রিস্টিজ়’। এককালীন এ আয়োজনের নাম ছিল ‘সাবলাইম শ্যাডোজ়: সাউথ এশিয়ান আর্ট ফ্রম আ ডিস্টিংগুইশড কালেকশন’। শিল্পমহলের মতে, নিলামঘরে ছবি নিয়ে এমন উন্মাদনা সাম্প্রতিক অতীতে খুব কমই দেখা গিয়েছে।
নিলামে ওঠা এই সংগ্রহের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চা-শিল্পের সঙ্গে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের গোড়ায় ব্রিটিশ সংস্থা ‘ক্যামেলিয়া পিএলসি’-র উদ্যোগে গড়ে ওঠে এই শিল্পভাণ্ডার। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের চা-বাগান ব্যবসার উত্তরাধিকার বহনকারী গুডরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এ সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বাংলার শিল্পঐতিহ্য এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক শিল্পচর্চা। এবারের নিলামের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ছিলেন গণেশ পাইন। তাঁর ২৬টি শিল্পকর্ম ছিল এ সংগ্রহের অংশ। টেম্পেরা, মিশ্র মাধ্যম, স্কেচ এবং কাগজে আঁকা নোট— সব মিলিয়ে শিল্পীর দীর্ঘ সৃজনযাত্রার দুর্লভ দলিল উঠে এসেছিল নিলামমঞ্চে।
নিলামের একের পর এক রেকর্ড তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালে আঁকা গণেশ পাইনের বিখ্যাত টেম্পেরা চিত্র ‘দ্য ফিশারম্যান’ বিক্রি হয় ৩৮ লক্ষ পাউন্ডে, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৪৪ কোটি টাকার সমান। এই দাম শিল্পীর আগের শিল্পকর্ম বিক্রির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয়। মাত্র তিন মাস আগে নিউ ইয়র্কে তাঁর একটি কাজের দাম উঠেছিল ২৫.১ লক্ষ মার্কিন ডলার। লন্ডনে সে রেকর্ডও ছাপিয়ে গেল। ১৮ ইঞ্চি বাই ২২ ইঞ্চির ছবিটিতে গভীর নীল জলের বুকে কাঠের নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকা এক জেলেকে দেখা যায়। ‘ক্রিস্টিজ়’-এর মতে, ছবির চরিত্রটি যেন ‘সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অন্তর্মুখী মানুষ’। গণেশ পাইনের আরও দুটি টেম্পেরা চিত্র প্রত্যেকটি বিক্রি হয়েছে ২৩ লক্ষ ৭০ হাজার পাউন্ডে। অথচ প্রতিটি কাজের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল মাত্র ৩ লক্ষ পাউন্ড।
প্রবাদপ্রতিম শিল্পী গণেশ পাইনের শিল্পজগতের মূল উপাদান ছিল লোককথা, পুরাণ, মৃত্যু, স্মৃতি আর অতিপ্রাকৃতের রহস্যময় আবহ। ‘বেঙ্গল স্কুল’-এর উত্তরাধিকারকে তিনি আধুনিকতার সঙ্গে মিশিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। শিল্পসমালোচকদের মতে, ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পভাবনায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। এক সময়ে এম এফ হুসেন তাঁকে ভারতের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর বলেও অভিহিত করেছিলেন। তবে এদিনের নিলামের শুরুতেই চমক দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মহাত্মা গান্ধীকে কেন্দ্র করে আঁকা তাঁর ‘দ্য স্পিনার অব আ নেশনস ডেসটিনি’ বিক্রি হয় ১০ লক্ষ ৪০ হাজার পাউন্ডে। ছবিটির আনুমানিক মূল্য ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার পাউন্ড। কাজটি অবনীন্দ্রনাথের কাগজে আঁকা ছবির ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
ছবিতে দেখা যায়, গান্ধীর আঙুলে ধরা রয়েছে তিনটি সূক্ষ্ম সুতো, যার রঙ ভারতীয় জাতীয় পতাকার অনুরণন বহন করে। শিল্পবিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতা আন্দোলনে চরকা ও খাদির রাজনৈতিক তাৎপর্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এ কাজ। শুধু গণেশ পাইন বা অবনীন্দ্রনাথ নন, রেকর্ড গড়েছেন আরও বহু শিল্পী। মীরা মুখোপাধ্যায়ের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ‘হুইল বিল্ডার্স’ বিক্রি হয়েছে ৩ লক্ষ ৮১ হাজার পাউন্ডে, যা তাঁর পূর্ববর্তী রেকর্ডকে অনেকটাই ছাপিয়ে গিয়েছে। ১৯৫৯ সালে আঁকা কে কে হেব্বারের ‘উইমেন মেকিং চাপাটিস’ বিক্রি হয়েছে ৪ লক্ষ ৬ হাজার ৪০০ পাউন্ডে। নতুন রেকর্ড গড়েছেন বীরেন দে, রামকিঙ্কর বেইজ, বদ্রী নারায়ণ এবং অর্পণা কৌরও। অর্পণার ‘ব্লু বুদ্ধ’; কাগজে আঁকা ছবি বিক্রি হয়েছে ৮,৮৯০ পাউন্ডে, অনুমিত মূল্যের ১১ গুণ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এ নিলামের শীর্ষে নেই ‘বম্বে প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপ’-এর শিল্পীরা। সাধারণত দক্ষিণ এশীয় শিল্পের বড়ো বড়ো নিলামগুলিতে তৈয়েব মেহতা, এম এফ হুসেন বা এফ এন সৌজার কাজই সর্বোচ্চ দর পায়। এ বার সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙে বাংলা-কেন্দ্রিক সংগ্রহই নজর কাড়ল আন্তর্জাতিক সংগ্রাহকদের। শিল্পমহলের একাংশের মতে, এ সাফল্য প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয়, বিশেষত বাংলা আধুনিক শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে।
গুডরিক বা ক্যামেলিয়া সংগ্রহের নেপথ্যেও রয়েছে এক দীর্ঘ কর্পোরেট ইতিহাস। কানাডীয় বিনিয়োগকারী গর্ডন ফক্সের উদ্যোগে ৬০–৭০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের একাধিক চা-বাগান একত্রিত করা হয়। ১৯৭৭ সালে গড়ে ওঠে গুডরিক গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে ক্যামেলিয়া পিএলসি এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। প্রথম দিকে সংস্থার শিল্পসংগ্রহে ছিল কোম্পানি স্কুলের ছবি, ভারতীয় মিনিয়েচার, উদ্ভিদবিষয়ক জলরং ও ডাকটিকিট। পরে গুরুত্ব পেতে শুরু করে কলকাতার সমকালীন শিল্পীরা। সে সময়েই সংগ্রহের কেন্দ্রে উঠে আসেন গণেশ পাইন।
২০১৮ সালে গর্ডন ফক্সের সরে দাঁড়ানোর পর সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের পর থেকে মূল ব্যবসায় অধিক বিনিয়োগের লক্ষ্যে অ-প্রধান সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে কৌশলেরই অংশ এই নিলাম। গণেশ পাইনের কাজ নিয়ে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘গণেশ পাইন: রিভেলেশনস’ শীর্ষক গ্রন্থ। গুডরিকের সহযোগিতায় প্রকাশিত সে বইয়ে ‘লরি’ এবং ‘গুডরিক’ সংগ্রহের নথিভুক্ত বিবরণ রয়েছে। গুডরিকের নিজস্ব পত্রিকার প্রচ্ছদেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক কাজ। ফলে, বিশাল এই শিল্পসংগ্রহের প্রকৃত মালিক ক্যামেলিয়া হলেও, জনমানসে এখনো ‘গুডরিক’ নামটিই বেশি পরিচিত। ফলে লন্ডনের নিলামঘরে এদিন যেন ফিরে এসেছিল ভারতীয় চা-বাগানে ব্রিটিশ প্রভাবের সেই দীর্ঘ ইতিহাসও। ফলে, এই নিলাম কেবল বিপুল অর্থমূল্যের জন্য নয়, বাংলার শিল্পঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার কারণেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শিল্পবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ‘এ শুধু ছবির নিলাম নয়, আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের পুনর্মূল্যায়ন।’
❤ Support Us








