Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • এপ্রিল ৭, ২০২৫

‘সুপ্রিম কোর্ট যোগ্যদের চাকরি না ফেরালে, বিকল্প ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার’ — নেতাজি ইন্ডোরে দাঢ্য-কণ্ঠে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘সুপ্রিম কোর্ট যোগ্যদের চাকরি না ফেরালে, বিকল্প ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার’ — নেতাজি ইন্ডোরে দাঢ্য-কণ্ঠে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

সুপ্রিম কোর্টের এসএসসি-২০১৬ চাকরি বাতিল মামলায় চাকরি হারিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মচারী। সোমবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আগামী পদক্ষেপ নিয়ে জরুরি বৈঠক করবেন রাজ্যের চাকরিহারারা। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী কী বলেন সেদিকেই চোখ ছিল সকলের। বৈঠকে যোগ দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে চাকরিহারাদের পাশে থাকবার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি চাকরিহারাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, কারও চাকরি যাবে না। তিনি সুপ্রিম কোর্টে রায়ের ব্যাখ্যা চাইবেন। নেতিবাচক উত্তর এলে তিনি যোগ্য চাকরিহারাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করে দেবেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সভায় উপস্থিত শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। পরে যোগ দেন রাজ্যের চার মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, পুলক রায় ও মানস ভুঁইয়া। ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, সাহিত্যিক আবুল বাশার, কবি সুবোধ সরকার সহ আরো কয়েকজন সরকারি কর্তা, আইনজ্ঞরা।

সভার শুরুতেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে একে একে দাবি পড়ে শোনালেন চাকরিহারারা। বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দিতে হবে। পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। রায় দানকারী বিচারপতির পরিবর্তে অন্য বেঞ্চে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হবে। পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্তের চিঠি দেওয়া যাবে না। এতে আদালতের কোনো অবমাননা হবে না। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে পরীক্ষার কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করা যাবে না। চাকরিহারারা পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে যেতে চাইছেন না। তাঁদের আরো দাবি, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে, সিবিআইয়ের নথিতে যোগ্য এবং অযোগ্যের ভাগাভাগি রয়েছে। যোগ্যদের পরিচ্ছন্ন তালিকা নিয়ে রিভিউ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। তাঁরা যে সব বিরোধী দল তাঁদের প্রতি সহমর্মী, সেগুলির সাথে সর্বদল বৈঠকের আবেদন জানিয়েছেন। এছাড়াও দক্ষ আইনজীবীর অভাবের কথা তাঁরা তুলে ধরেছেন, তাঁরা বলেছেন, ‘ রাজ্য সরকারকে আমাদের জন্য একজন দক্ষ আইনজীবীর ব্যবস্থা করে দিতে হবে।’

নিজের বক্তব্যের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে বলেছেন,’সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আমার হৃদয় পাথর হয়ে গিয়েছে। লাল, নীল, গেরুয়া কোনও রঙ দেখব না। আমাকে জেলে ভরলে ভরুক। যোগ্য ব্যক্তির চাকরি যাতে না যায়, আমরা সেটা সবসময় চাই।’ বিরোধীদের প্রতি কঠাক্ষ করে, তিনি বলেন, চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, চাকরি কাড়ার ক্ষমতা আছে। তাঁদের ধিক্কার জানাই। যাত্রাপালার মাধ্যমে আপনাদের ভুল বোঝাচ্ছে। রাজ্য সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল। ২০২২ থেকে নোংরা খেলা শুরু করেছে।’ সিপিএমের কাছে জবাব চেয়ে তিনি দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের অনেক কথা জেনেও, কারো চাকরি খায় নি তৃণমূল সরকার। তাহলে কেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য মামলা করলেন, এর জবাব সিপিএমকেই দিতে হবে। এরপর তিনি বেঁচে থাকতে যোগ্যদের চাকরি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তার অভিযোগ ‘বিরোধীরা পশ্চিমবঙ্গেগের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেবার চক্রান্ত করছে।’ চাকরিহারাদের বরখাস্তের নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত স্কুলের স্বেচ্ছায় কাজ করবার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

সুপ্রিমকোর্টের কাছে এই রায়ের ব্যাখা চাইবে তৃণমূল। অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি, কপিল সিব্বল, রাকেশ দ্বিবেদী, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত ভূষণ রাজ্য সরকারের হয়ে যোগ্যদের সমর্থনে আইনি লড়াই চালাবেন। মমতা বলেছেন, ‘শীর্ষ আদালতের কাছে আমরা ব্যাখ্যা চাইব। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে, যাঁরা স্কুলে পড়াতেন, তাঁদের জন্য আদালতের ব্যাখ্যা কী? স্কুল কে চালাবেন? বাকি কাজ কে চালাবেন? কাউকে না খাইয়ে মারার অধিকার তো কারো নেই। চাকরি যখন দিতে পারবেন না, আমার অনুরোধ তাঁরা যেন চাকরি কেড়ে না নেন। শিক্ষা দপ্তর এ নিয়ে যা করার করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ যোগ্যদের চাকরি সুনিশ্চিত করবার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। এ নিয়ে কিছু লুকোনোর ব্যবপার নেই। আইন অনুযায়ী যা করাবর করা হবে। বিকল্প রাস্তা ঠিক খুঁজে বের করা হবে।’ যোগ্যদের সমস্যা মিটে গেলে ‘অযোগ্য’-দের বিষয়েও ভাবনা চিন্তা করবার পরিকল্পনা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি বলেছেন, ‘যোগ্যদের বিষয়টা আগে মিটে যাক। তার পর যাদের ‘অযোগ্য’ বলা হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী কী তথ্য আছে আমি দেখব। তখনো আমি আপনাদের ডাকব। তাঁরা যদি সত্যিই ‘অযোগ্য’ বলে প্রমাণিত হন, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করবার থাকে না। কিন্তু নতুন করে তদন্ত করা দরকার। কার্যত কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের উপর অনাস্থার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। যোগ্য-অযোগ্যের মধ্যে গোলমাল না লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। রাজ্য সরকারের প্ল্যান-এ রেডি, বি রেডি, সি রেডি, ডি রেডি, ই রেডি আছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর এ আশ্বাসে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে চাকরিহারাদের।

এদিকে, আজ সকালে নেতাজি ইন্ডোরে ঢোকার গেট পাস নিয়ে সকাল থেকে দফায় দফায় অশান্তির খবর এসেছে। বচসা ও হাতাহাতিতে জড়িয়েছে দুই পক্ষ। অসুস্থ হয়ে পড়েন বেশ কয়েকজন। চাকরিহারাদের একাংশের অভিযোগ, টকার বিনিময়ে ওই পাস যোগ্যদের না দিয়ে, অযোগ্যদের দেওয়া হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে বচসাতেও জড়িয়ে পড়েন ‘শিক্ষক-শিক্ষিকা’রা পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় অন্য গেট দিয়ে তাঁদের ভিতরে প্রবেশ করানোর বন্দোবস্ত করেন। যদিও কারা এই পাসগুলি ইস্যু করেছে আর কোন মাপকাঠিতেই বা পাস দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে স্পষ্ট করে কোনো উত্তর দিতে পারেনি পুলিশ। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘যে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাঁদের কাছে বোইঢ পাস আছে তাঁদেরকেই কেবল ঢুকতে দেওয়া। ঝামেলার ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’।

অন্যদিকে, শীর্ষ আদালতে এদিনই রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে দিল্লিতে চাকরিহারাদের একাংশ। তবে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দপ্তর কিংবা এসএসসি এখনো পর্যন্ত রিভিউ পিটিশনের ব্যপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি। এদিকে, রবিবার শহীদ মিনারের পাদদেশে, জমায়েত করে চাকরিহারাদের একাংশ সমস্ত রাজনৈতিক দলকে বিক্ষোভে সামিল হবার আহ্বান জানিয়ে, কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ‘দ্রুত এ সমস্যা সমাধান না হলে, ২৬-এর বিধানসভা অবরুদ্ধ করা হবে’ রবিবারের সভা থেকে নিজেদের দাবি স্পষ্ট করেছেন চাকরিহারা প্রার্থীরা। এই পরিস্থিতির জন্য রাজ্য সরকার ও এসএসসিকে দায়ী করেছেন তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের রায় ও সিবিআই-এর রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দায়িত্বহীনতার জন্যই আজকের এই পরিস্থিতি। যোগ্যদের চাকরি ফেরানোর জোরদার দাবি তুলেছেন আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তা না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।, আগামী ২১ এপ্রিল নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছেন বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিহারা ঐক্য মঞ্চ। অভিযানে সাধারণ মানুষদের যোগ দেবার আহ্বান জানানো হয়েছে।নির্বাচনে কাউকে লড়তে দেব না। রাস্তা নে বের হলে, আমাদের লাশের উপর নির্বাচন হবে।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মৃত্যুদণ্ডের সামিল বলে মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, এই মামলায় সিবিআই-এর তদন্দ রিপোর্ট গ্রাহ্য করেন নি মাননীয় বিচারপতি, তথ্য বিশ্লেষণ করে নি শীর্ষ আদালত। তাহলে কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তদন্তের কারণ কী? সে নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন চাকরিহারা শিক্ষিক-শিক্ষিকারা। এমত অবস্থায় আজ নেতাজি ইন্ডোরের বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আশ্বাস ও ভবিস্যৎ পরিকল্পনার খতিয়ান পেশ করবার পর, চাকরিহারাদের আন্দোলনের অভিমুখ কোনদিকে যাবে, সে দিকে চোখ থাকবে সকলেরই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!