Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ৭, ২০২৬

বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ মুখ্যমন্ত্রীর । ডিজি-কে ৭২ ঘণ্টায় রিপোর্টের নির্দেশ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ মুখ্যমন্ত্রীর । ডিজি-কে ৭২ ঘণ্টায় রিপোর্টের নির্দেশ

বারুইপুরের নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য জুড়ে যখন তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক তরজা অব্যাহতসে আবহেই মঙ্গলবার সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে  গেলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে গিয়ে তিনি প্রথমে নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। পরে গণপিটুনিতে নিহত যুবক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গেও পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি জানানপুলিশের প্রাথমিক তদন্তে গণপিটুনিতে নিহত যুবক নির্দোষ বলেই উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে নবান্ন থেকে সরাসরি বারুইপুরের এসপি অফিসে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তজেলার শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক এবং তদন্তকারী দলের সদস্যেরা। নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন তিনি। পরে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের তিন সদস্যের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেননির্যাতিতার পরিবার সরকারের উপর আস্থা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘ওঁরা আমাদের উপর ভরসা রেখেছেনএটাই আমার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।’ একই সঙ্গে তিনি জানাননিহত যুবকের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন।

গণপিটুনির ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘মব লিঞ্চিংয়ে যাঁকে পিটিয়ে মারা হয়েছেসেই ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল অপরাধে জড়িত ছিলেন না। এটা আমার ব্যক্তিগত মত নয়পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছেআমি সেটাই বলছি।’ তাঁর বক্তব্যযে কোনো নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু সমানভাবে দুঃখজনক এই হত্যাকাণ্ডেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। যারা আইন হাতে তুলে নিয়ে ওই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছেতাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে। গত রবিবার নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর বারুইপুরের বিভিন্ন এলাকায় যে ব্যাপক বিক্ষোভভাঙচুরঅগ্নিসংযোগ এবং রেল অবরোধের ঘটনা ঘটেতা নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানানসিসিটিভি ফুটেজড্রোন চিত্রমোবাইল ভিডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যেই প্রায় ২০০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের গাড়িতে হামলাসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুররেললাইন উপড়ে ফেলা এবং এলাকায় অশান্তি ছড়ানোর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলতাদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।

অশান্তির নেপথ্যে রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবিনির্বাচনে মানুষের সমর্থন হারানো কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং দেশবিরোধী শক্তি পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তোলার চেষ্টা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা ভোটে মানুষের সমর্থন পাননিকেউ ক্ষমতা হারিয়েছেনকেউ প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছেনতাঁদের মধ্যে কয়েক জন পিছন থেকে এই অশান্তিতে উসকানি দিয়েছেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।’ তদন্তকারী সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই একাধিক কল রেকর্ডডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। এ ঘটনার নেপথ্যে যারা পরিকল্পিতভাবে উস্কানি দিয়েছেতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইন আইনের পথেই চলবে।’ নির্যাতিতার পরিবারের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানানসূর্যপুর এলাকায় অবিলম্বে একটি নতুন পুলিশ আউটপোস্ট গড়ে তোলা হবে। স্থায়ী ভবন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ভাড়া বাড়িতে হলেও ওই আউটপোস্ট চালু করতে ডিজি  স্বরাষ্ট্রসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি আবার বারুইপুরে আসবেন। সে সময় নির্যাতিতার পরিবারগণপিটুনিতে নিহত যুবকের পরিবারের সঙ্গে ফের দেখা করবেন। পাশাপাশি নতুন পুলিশ আউটপোস্টের কাজও পর্যালোচনা করবেন।

ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে এ দিন এসপি অফিসেই জেলার শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তদন্ত কতদূর এগিয়েছেফরেনসিক রিপোর্টের বর্তমান অবস্থাপ্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহঅভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং চার্জশিটের প্রস্তুতি— প্রতিটি বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি ঘটনার আগের রাতে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার পর থেকে পুলিশ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলসে প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানানঘটনার আগের দিন রাত ১১টা ৫০ মিনিট নাগাদ থানায় নিখোঁজ ডায়েরি নথিভুক্ত হয়েছিল। তার পর থেকে উদ্ধার অভিযান এবং তদন্তে কোনো গাফিলতি ছিল কি নাতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূর্যপুর ক্যাম্প ইনচার্জতৎকালীন আইসিএসডিপিও এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ভূমিকা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে যদি কোনো পুলিশ আধিকারিকের সামান্যতম অবহেলা বা দায়িত্বে শিথিলতা প্রমাণিত হয়তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট করে দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি মনে করিয়ে দেনঅতীতেও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে শীর্ষ আইপিএস আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

এদিন, বারুইপুর থেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত থানার সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্তে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)পকসো আইনসুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকাজাতীয় মহিলা কমিশনজাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনের গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি। প্রতিটি থানাকে দ্রুত তদন্তনিরপেক্ষ পদক্ষেপ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনপ্রতিনিধিরাও। সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংসদ সায়নী ঘোষস্থানীয় বিধায়ক ও প্রাক্তন বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একান্তে আলোচনা করেন তিনি। বিজেপির বিধায়ক বিকর্ণ নস্কররূপা গঙ্গোপাধ্যায়  দেবাশিস ধরও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বৈঠকের পর রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেনমুখ্যমন্ত্রী সকলের বক্তব্য মন দিয়ে শুনেছেন এবং স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেনকোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। দোষীদের এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবেযাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।

জানা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। যে পুকুর থেকে নাবালিকার দেহ উদ্ধার হয়েছিলসে এলাকা ঘুরে দেখেন তিনি। ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহঅভিযুক্তদের গতিবিধিপ্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডিজি বলেনতদন্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে তিন জন অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছেক, তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছেসেটিও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্যগত শনিবার বন্ধুর জন্মদিনে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী। পরদিন বাড়ি থেকে কিছু দূরের একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার দেহ উদ্ধার হয়। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে যৌন নির্যাতন এবং নৃশংস অত্যাচারের প্রমাণ মিলেছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। এমনও জানা গিয়েছেপুকুরে ফেলে দেওয়ার সময়ও কিশোরীর প্রাণ ছিল। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতারের পর তার বয়ান এবং কল ডিটেলসের সূত্র ধরে প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দারকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। আরও কয়েক জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্টডিজিটাল প্রমাণকল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মিলিয়ে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাচ্ছে ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। প্রশাসনের দাবিদ্রুত চার্জশিট পেশ করে দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দিকেই এগোচ্ছে তদন্ত।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!