- দে । শ
- জুলাই ৭, ২০২৬
শীতলকুচিতে মীনাক্ষী মুখার্জির গাড়িতে হামলা
কোচবিহারের শীতলকুচিতে নিহত দলীয় কর্মী মন্টু মিঞার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফেরার পথে হামলার মুখে পড়লেন মীনাক্ষী মুখার্জি। মঙ্গলবার সকালে শীতলকুচি বাজার সংলগ্ন এলাকায় তাঁর গাড়িকে লক্ষ্য করে পরপর ডিম ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। গাড়ির ভিতর থেকেই মোবাইলে গোটা ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করতে দেখা যায় তাঁকে। সে সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিপিআইএম নেত্রী।
তাঁর অভিযোগ, পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের আটকানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে হবে, তারপর গাড়ি সরানো হবে। প্রশ্ন তোলেন, তাঁর অপরাধ কী ? রাজ্যের রাস্তায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন না কেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার জন্য সরাসরি বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের দায়ী করেছে সিপিআইএম। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপির দাবি, এটি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ।
পাল্টা, বামেদের দাবি, শীতলকুচির ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়, বরং পালাবদলের পর রাজ্যে ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব কালচার’-এর বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ। দলের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতভেদকে গণতান্ত্রিক পরিসরে মোকাবিলা করার পরিবর্তে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে জনতার নামে সংগঠিত ভিড়ের মাধ্যমে দমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। আর এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসন যদি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তবে তা আইনের শাসনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যদি প্রশ্রয় পায়, তা হলে আগামী দিনে যে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন বা সাধারণ নাগরিক একই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে পারেন। দলের আরও অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের সভা, মিছিল, পথসভা কিংবা সফর ঘিরে বিক্ষোভ, অবরোধ এবং হামলার ঘটনা বাড়ছে। এর ফলে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। সিপিএম রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য, ‘মব কালচার’কে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তার পরিণতি গোটা সমাজকেই ভোগ করতে হবে।
শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ থাকার পর রবিবার সকালে শীতলকুচির খুটামারি নদীর ধারে উদ্ধার হয় সিপিএম কর্মী মন্টু মিঞার দেহ। সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার সকালে নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে নগর সিংহিমারি গ্রামে যান মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ অলকেশ দাস-সহ দলের একাধিক নেতা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সেখান থেকে ফেরার সময় শীতলকুচি বাজারের কাছে আচমকাই উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ, একদল ব্যক্তি মীনাক্ষীর গাড়িকে লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম ছুড়তে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির সামনের কাচ ডিমে ঢেকে যায়। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় রাস্তার মাঝেই গাড়ি থামিয়ে দিতে বাধ্য হন চালক।
মীনাক্ষী জানান, প্রয়োজনে নিজের রেকর্ড করা ভিডিওই তদন্তের স্বার্থে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতা হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি কোচবিহার শহরের উদ্দেশে রওনা দেন। পরে পুলিশ সুপারের দফতরে পৌঁছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান বিক্ষোভেও বসেন। থানায় পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে মীনাক্ষী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা যদি চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটতে দেয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? তাঁর দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, বিজেপি এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। দলের কোচবিহার জেলা সভাপতি অভিজিৎ বর্মনের দাবি, একটি মৃত্যুর ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে শীতলকুচির শান্ত পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছে বামেরা। তাঁর বক্তব্য, যদি কোনো সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে ডিম নিক্ষেপ করে থাকেন, তার জন্য বিজেপিকে দায়ী করা যায় না। বিজেপির কোনো কর্মী এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন বলেও দাবি করেন তিনি। মন্টু মিঞার মৃত্যুকে ঘিরেও দুই পক্ষের বক্তব্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। পরিবারের অভিযোগ, গোরু কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই তথাকথিত ‘গোরক্ষক’দের হাতে তিনি আক্রান্ত হন এবং পরে তাঁকে খুন করা হয়। শনিবার একটি গোরু ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দিতে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে নদীর ধারে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের দাবি, দেহে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, শুধু মন্টু মিঞার ঘটনাই নয়, একই এলাকার এক পরিযায়ী শ্রমিকের মুম্বইয়ে মৃত্যুর পর তাঁর দেহ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। ওই পরিবারের সঙ্গেও দেখা করার কথা ছিল বাম নেতৃত্বের। এই দুই ঘটনাকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছে সিপিআইএম।
❤ Support Us







