- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ৩, ২০২৬
উত্তরবঙ্গে ঝটিকা সফরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, উত্তরকন্যায় দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
বর্ষার দাপটে ইতিমধ্যেই নাজেহাল উত্তরবঙ্গ । পাহাড়ে ধস, সমতলে বন্যার আশঙ্কা, একের পর এক নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা — এ পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে শুক্রবার এক দিনের ঝটিকা সফরে শিলিগুড়ি যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । উত্তরকন্যায় উত্তরবঙ্গের আট জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক করবেন । প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে ।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার, কলকাতার নিউটাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার উদ্যোগে আয়োজিত নবনির্বাচিত বিধায়কদের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা । পাশাপাশি থাকবেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু, কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব । অনুষ্ঠান শেষ করেই দমদম বিমানবন্দর থেকে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেবেন মুখ্যমন্ত্রী । উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠক শেষে বিকেলের বিমানে কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে তাঁর ।
দু-মাসের মধ্যে এটি মুখ্যমন্ত্রীর তৃতীয় উত্তরবঙ্গ সফর । প্রশাসনের মতে, এ সফরের মূল লক্ষ্য উত্তরবঙ্গে বর্ষাজনিত পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করা এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন কতটা প্রস্তুত, তা সরাসরি খতিয়ে দেখা । শুক্রবার দুপুর ২টো নাগাদ উত্তরকন্যায় বৈঠক শুরু হওয়ার কথা । দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ির জেলা শাসক, পুলিশ সুপার সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে । কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ জেলার প্রশাসনিক কর্তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেবেন । মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল-সহ রাজ্যের একাধিক শীর্ষ আমলা ও সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রীদেরও উপস্থিত থাকার কথা ।
রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনের দাবি, উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক তৎপরতাকে বিজেপি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে । তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রীর ধারাবাহিক উত্তরবঙ্গ সফরই প্রমাণ করে, এ অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে সরকার সক্রিয় ও দায়বদ্ধ । যদিও এদিন কলকাতাতেই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতিতে বিধায়কদের দুই দিনের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি থাকায় উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ বিধায়কের পক্ষে উত্তরকন্যার বৈঠকে উপস্থিত থাকা সম্ভব হবে না । তবে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিতেই বৈঠক হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর ।
প্রশাসনের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক পরিস্থিতিই মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে । গত কয়েক সপ্তাহে বালাসন নদীর প্রবল স্রোতে দুধিয়ার অস্থায়ী হিউমপাইপের সেতু ভেসে গিয়েছে । ফলে শিলিগুড়ি ও মিরিকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে । পাহাড়ের একাধিক এলাকায় ধস নামায় বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশ । সিকিম ও কালিম্পংয়ের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগও বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে । অন্যদিকে, সমতলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা-সহ একাধিক নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ফলে প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে । বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও কোথাও ফাটলও দেখা দিয়েছে । যদিও উত্তরে আপাতত ভারী বৃষ্টির তীব্রতা কমেছে । আলিপুর আবহাওয়া দফতর আগামী কয়েক দিনের জন্য কোনো লাল বা কমলা সতর্কতা জারি করেনি, তবু আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে নিম্নচাপ অক্ষরেখা ও ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে ফের সক্রিয় হতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু । ফলে নতুন করে ভারী বৃষ্টি ও দুর্যোগের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে ।
এ পরিস্থিতিতে শুক্রবারের বৈঠকে প্রতিটি জেলার বর্তমান অবস্থা, উদ্ধার ও ত্রাণ ব্যবস্থার প্রস্তুতি, কন্ট্রোল রুমের কার্যকারিতা, জরুরি পরিষেবার সক্ষমতা, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও সড়কের মেরামতির অগ্রগতি সহ প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সরকারি সহায়তা নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা হবে বলে জানা গিয়েছে । প্রশাসনিক সূত্রের খবর, প্রথম দফার বর্ষাজনিত দুর্যোগের সময় থেকেই মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে চলেছেন । তাঁর নির্দেশেই প্রতিটি জেলায় কন্ট্রোল রুম ও হেল্পলাইন চালু করা হয়েছিল । সে সময় যে সব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলির বাস্তবায়ন কতদূর হয়েছে, শুক্রবারের বৈঠকে তারও বিস্তারিত রিপোর্ট চাইবেন তিনি । একই সঙ্গে আগামী দিনে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আরও কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন ।
রাজ্যের এক শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকের জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গে আপাতত আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় এই সময়টাকেই ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার । তাই বর্ষার দ্বিতীয় দফার আগে প্রশাসনিক সমন্বয় আরও জোরদার করতেই এই বৈঠকের আয়োজন । উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২০ মে প্রথমবার উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠক করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী । সেদিনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় । পরে ১৬ জুন কার্শিয়াংয়ে জনকল্যাণ শিবিরে যোগ দিতে দ্বিতীয়বার উত্তরবঙ্গ সফরে যান তিনি । শুক্রবারের সফর মিলিয়ে মাত্র দু’মাসের মধ্যে তিনবার উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠক করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী । রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতেই ধারাবাহিকভাবে এই সফরগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার ।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে ঝটিকা সফরের আগেই বৃহস্পতিবার নবান্নে সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শুভেন্দু অধিকারী । দুই রাজ্যের পারস্পরিক সহযোগিতা, সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে । এছাড়াও, শিলিগুড়ির এসএনটি কমপ্লেক্সে বহুদিন ধরে আটকে থাকা ‘সুস্বাস্থ্য ভবন সিকিম’ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত পারস্পরিক পরিবহণ চুক্তি বা ‘রেসিপ্রোকাল এগ্রিমেন্ট’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে ।
২০২৩ সালের ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’-এর পর তিস্তার তলদেশে ব্যাপক পলি জমে যাওয়ায় জাতীয় সড়ক ১০-সহ সিকিমের যোগাযোগ ব্যবস্থা যে সমস্যার মুখে পড়েছে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয় । নদীর পলি অপসারণ এবং যৌথভাবে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার বিষয়েও দুই রাজ্যপ্রধান ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন । বৈঠকের পর সামাজিক মাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী লেখেন, সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীকে নবান্নে স্বাগত জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত । দুই রাজ্যের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে । পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । প্রেম সিং তামাং জানান, পরিবহণ চুক্তি, জাতীয় সড়ক ১০, তিস্তার ড্রেজিং এবং শিলিগুড়িতে সিকিমের স্বাস্থ্য ভবন নির্মাণ-সহ একাধিক বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে । তাঁর দাবি, নতুন চুক্তি কার্যকর হলে সিকিমের আরও বেশি সংখ্যক ট্যাক্সি পশ্চিমবঙ্গে চলাচলের সুযোগ পেতে পারে ।
তবে এ ঘোষণার পরই পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ও পরিবহণ মহলে নতুন প্রশ্ন উঠেছে । দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ, সিকিমের যানবাহন পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র চলাচল করতে পারলেও পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনবাহী গাড়ি সিকিমের নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার বাইরে যেতে পারে না । নতুন চুক্তিতে সে বৈষম্য দূর হবে কি না, সেটাই এখন ব্যবসায়ীদের প্রধান কৌতূহল । যদিও, পর্যটন ও পরিবহণ সংগঠনগুলির আশা, নতুন চুক্তিতে দু-রাজ্যের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে । তাঁদের মতে, পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সীমান্তবর্তী পর্যটন শিল্প এবং পরিবহণ ব্যবসা নতুন গতি পাবে ।
❤ Support Us






