- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ২৫, ২০২৫
বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতি গোষ্ঠীদের পৃথকভাবে গণনার পথে সরকার, আদমশুমারিতে প্রথমবারের মতো এমন উদ্যোগ
প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতমদের মুখ তুলে ধরার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। আসন্ন আদমশুমারিতে দেশের ‘বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতি গোষ্ঠী’গুলিকে পৃথকভাবে গণনার জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আদমশুমারি কমিশনারকে সুপারিশ পাঠিয়েছে উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রক। চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে, আসন্ন ২০২৭ সালের আদমশুমারিতে এসব গোষ্ঠীর তথ্য পৃথকভাবে সংগৃহীত হোক।
এ পদক্ষেপ গ্রহণ হলে, আদমশুমারির দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কিছু উপজাতিকে ‘তফসিলি উপজাতি’ শ্রেণি থেকে আলাদা করে গণনা করা হবে। এ পর্যন্ত আদমশুমারিতে এঁরা ‘তফশিলি উপজাতি’ গোষ্ঠীর ছাতার তলায় গণনা হতেন। এবার সে ছাতা সরিয়ে, নিজস্ব পরিচয়ে দেশের গণনায় স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা জাগল প্রায় ৪৫ লক্ষাধিক ভারতীয় নাগরিকের।
বর্তমানে, দেশে মোট ৭৫টি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উপজাতি গোষ্ঠী স্বীকৃত, যাদের বিস্তৃতি রয়েছে ১৮টি রাজ্য ও আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। তাদের পরিচিতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ টি মূল মাপকাঠির ওপর—নিম্ন সাক্ষরতার হার, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, কৃষিপূর্ব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অতি পশ্চাদপদ অর্থনৈতিক অবস্থান। তবে, এখনো পর্যন্ত এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মাত্র ৪০টি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ‘তফসিলি উপজাতি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় আদমশুমারিতে তাদের তথ্য পাওয়া গেছে, বাকি ৩৫টি গোষ্ঠী আজও ‘অদৃশ্য’ থেকে গিয়েছেন সরকারি পরিসংখ্যানে।। ফলে সেসব গোষ্ঠীর জনসংখ্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক সূচক সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যের অভাব থেকে গেছে। ফলে, ঠিক কোন গোষ্ঠীর অবস্থান কোথায়, জীবিকা কী, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর হাল কী— সেই সমস্ত প্রশ্নে জবাব মেলে না। এর প্রভাব পড়েছে নীতিনির্ধারক ও উন্নয়নকারীদের উপর, যাঁরা লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন করতে চাইলেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
উপজাতি মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বঞ্চিত ও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি একীভূত ও বিস্তারিত তথ্যভান্ডার থাকা অত্যাবশ্যক। কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া তাঁদের জন্য কার্যকর উন্নয়নমূলক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের এই গোষ্ঠীগুলো অবশেষে স্বতন্ত্র মর্যাদা পাবে এবং তাদের প্রতিটি পরিবার ও সদস্যের তথ্য নথিভুক্ত হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আদমশুমারির তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নাম ও গোষ্ঠীভিত্তিক কিছু জটিলতা রয়েছে। অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক কামাল কে মিশ্র বলেছেন, ‘রাজ্যভেদে একই গোষ্ঠীর বিভিন্ন নামে পরিচয় থাকায় তথ্য সংগ্রহে বিভ্রাট ঘটছে, কোথাও কিছু গোষ্ঠী বাদ পড়ছে, আবার কোথাও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বর্তমানে ৭৫টি পিভিটিজি রয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এর সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। তাই আদমশুমারির আগে সংশ্লিষ্ট মানদণ্ডগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আদমশুমারিতে একবার আলাদা গণনা শুরু হলে, একটি উন্নয়ন সূচকও তৈরি করা উচিত, যাতে গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কার উন্নয়নের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা যায়।’ কেন্দ্রের প্রাথমিক ধারণা ছিল, দেশের বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতি জনসংখ্যা ২৮ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ‘গতি শক্তি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত বসতি-ভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সংখ্যাটি প্রায় ৪৫.৫৬ লাখ। এর মধ্যে মধ্যপ্রদেশ (১২.২৮ লাখ), মহারাষ্ট্র (৬.২ লাখ) এবং অন্ধ্রপ্রদেশ (৪.৯ লাখ) ৩ টি রাজ্যেই উপজাতি গোষ্ঠীর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
প্রসঙ্গত, ২০২৭ সালের আদমশুমারি হবে ২ টি ধাপে, যেখানে প্রথম ধাপে গৃহতালিকা ও আবাসন শুমারি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে, তারপরে জনসংখ্যা গণনা। এর পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো জাতিগত গণনাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পদ্ধতিতে জাতিগত ও উপজাতি সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পিভিটিজি গোষ্ঠীগুলোর পৃথক তথ্য সংগ্রহকে আদালাভাবে সরকারী স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে। আর যদি একাজে কেন্দ্র সরকার সফল হয়, তবে এটিই হবে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষে প্রথমবার পশ্চাদপদ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও উন্নয়নকে নতুন মাত্রা দেওয়ার প্রক্রিয়া। পাশাপাশি, দেশের সবচেয়ে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়গুলো ‘অদৃশ্যতা’ বাধা থেকে বেরিয়ে আসবে, সুষ্ঠু ও লক্ষ্যভিত্তিক উন্নয়নের পথও সুগম হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঝাড়খণ্ডে প্রধানমন্ত্রী মোদি উদ্বোধন করেন ‘প্রধানমন্ত্রী জনজাতি আদিবাসী ন্যায় মহা অভিযান’। যার লক্ষ্য ২০০-রও বেশি জেলার বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতি গোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। এই প্রকল্পে আগামী ৩ বছরের মধ্যে সেসব প্রান্তিক অঞ্চলে স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, সড়ক ও শিক্ষা সহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একাধিক মন্ত্রক সমন্বয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
❤ Support Us






