- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৫
প্রকাশনায় ‘শিব্রাম বিভ্রাট’! বই প্রকাশে স্থগিতাদেশ জারি আদালতের
বাংলা রম্যসাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বি সম্রাট শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা নিয়ে নতুন করে আইনি টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা আদালত সম্প্রতি এক কড়া অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে জানিয়েছে—শিবরামের বই প্রকাশ ও বিক্রি করার একচেটিয়া অধিকার রয়েছে একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার। তাই তাদের অনুমতি ছাড়া শিবরামের যে কোনো রচনার ‘অনৈতিক ও আইনবিরুদ্ধ’ প্রকাশ আপাতত বন্ধ রাখতে হবে। শিবরামের মৃত্যুর ৪৫ বছর পরে যখন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে শুরু হয়েছে এক ‘প্রকাশন-যুদ্ধ’।
১৯৮০ সালে শিবরামের অনন্তযাত্রা। তার ঠিক দশ বছর আগে, ১৯৭০ সালে একটা উইল করে যান তিনি। সেখানে নিজের ‘ভাইপো’ গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে যান নিজের লেখার সমস্ত স্বত্ব ও কলেজ স্ট্রিটের তাঁর নামে থাকা বইয়ের দোকান। তার পর কেটে গিয়েছে ৪ দশক। শিবরামের লেখা সমেত বয়ে গিয়েছে গঙ্গার জল। লেখকের মৃত্যুর পরে লেখকের কপিরাইট থাকে ৬০ বছর পর্যন্ত। সে হিসাবে ২০৪০ সাল পর্যন্ত লেখকের স্বত্ব রক্ষিত থাকা কথা। কিন্তু বহু প্রকাশনা সংস্থা শিবরামের লেখা ছেপেছে তাঁদের ‘নিজস্ব’ উদ্যোগে। কখনো কখনো কোনো স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়াই।
এ নিয়েই আদালতের দ্বারস্থ হন বুকফার্ম-এর কর্ণধার শান্তনু ঘোষ। তাঁর অভিযোগ, লেখকের উইল অনুযায়ী শিবরামের ভাগ্নে গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে লেখার স্বত্ব ছিল। পরবর্তীকালে গোপালের পরিবার থেকে সেই স্বত্ব কিনে নেয় তাঁদের সংস্থা। তবু, দেখা যায়—‘হর্ষবর্ধন গোবর্ধন সমগ্র’, ‘শিবরাম রচনা সমগ্র’, ‘কালজয়ী বাংলা কল্পবিজ্ঞান’-এর মতো বই অন্য সংস্থা ছাপছে, লেখকস্বত্বের পাতাটি বাদ দিয়েই। শান্তনু ঘোষের বলেছেন, ‘আমাদের বইয়ে গ্রন্থস্বত্ব সংক্রান্ত পরিষ্কার উল্লেখ থাকে। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি, তাঁদের বইয়ে সে পাতাটাই নেই।’ ‘শিব্রামিক অস্বস্তি’-তে আদালত জানায়, শিবরামের লেখা ছাপার আগে প্রকাশকের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কেউ যদি তা না মেনে থাকে, তবে তা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন। পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে, যাঁরা অনুমতি নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আপাতত সমস্যা নেই। কিন্তু যাঁরা বেআইনি ভাবে প্রকাশ করেছেন, তাঁদের কাছে আইনি নোটিস পাঠানো হবে। প্রধান অভিযুক্ত প্রকাশনা সংস্থা ‘কল্পবিশ্ব’।
শিবরামের জীবন এবং সাহিত্য নিজেই ছিল এক দীর্ঘ রম্যপ্রবন্ধ। মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের একটি মেসে কাটিয়েছেন জীবনের ৬ দশক। নিজের কথায় নিজেকে বর্ণনা করতেন—‘মুক্তারামের মেসে, শুক্তারাম খেয়ে, তক্তারামে শুয়ে।’ বিছানার পাশে ছড়িয়ে থাকা খবরের কাগজ, দেওয়ালে হাতের লেখা ফোন নম্বর, পাওনাদারের নামের পাশে লাল দাগ, পাওয়ার কথা যাঁদের তাঁদের নামের পাশে নীল কালি—এ ভাবেই চলত তাঁর হিসেবপত্র। তাঁর জীবনের অন্যতম আনন্দ ছিল সিনেমা দেখা। পকেটে শেষ কয়েকটি টাকা থাকলেও রাতের শো মিস করতেন না। আর অন্যটি ছিল খাওয়া। বহরমপুর জেলে নজরুল ইসলামের হাতে রান্না খেয়ে যেমন ‘টিঙটিঙে’ চেহারা ‘মোগলাই’ হয়ে উঠেছিল, সে কাহিনি নিজেই লিখেছেন তাঁর স্মৃতিকথায়।
তবে জীবন যে কেবল হাসির ছিল না, তা বোঝা যায় তাঁর মৃত্যুর গল্পেও। ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট এসএসকেএম হাসপাতালে নিঃসঙ্গভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিচয় না মেলায় তাঁর দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয় মর্গে। পরে অবশ্য পরিচিতদের উদ্যোগে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। আজ সেই শিবরাম, যাঁর লেখা পড়ে শিশু-কিশোর থেকে প্রৌঢ় সকলের মুখে হাসি ফুটেছে, তাঁকে ঘিরেই চলছে আইনি লড়াই। এক দিকে অমর রচনা, অন্য দিকে কপিরাইট বিতর্ক। যদি শিবরাম থাকতেন, হয়তো বলতেন—‘এই তো জীবন! আদালতেও পান খাওয়া চলে!’
❤ Support Us







