- বি। দে । শ
- এপ্রিল ৯, ২০২৬
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই প্রাক্তন পুলিশকর্মীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের
২০২৪ সালে পদ্মাপাড়ে ছাত্র আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ‘ঐতিহাসিক’ রায় ঘোষণা করল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার ঢাকার ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলায় দুই প্রাক্তন পুলিশকর্মীকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন প্রাক্তন সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন এবং প্রাক্তন কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। রায় ঘোষণার সময় তাঁরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন, সাজা ঘোষণার পরই বিচারাঙ্গনে নেমে আসে তীব্র উত্তেজনা।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বেঞ্চ এদিন রায় ঘোষণা করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে, আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৪ সালের সেই ছাত্র আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড়ো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় তিনি পুলিশের দমন-পীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শী ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হাতে ছোটো বাঁশের লাঠি নিয়ে তিনি দু-হাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ দৃশ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই গোটা দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি ঘটনার ছবি ও ভিডিওই পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত গণআন্দোলনের রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ঘটনাপ্রবাহ ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। নির্বাসিত হন মুজিবকন্যা।
এদিনের রায়ে মোট ৩০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালত জানায়, অপরাধের প্রকৃতি, দায়িত্বের স্তর এবং প্রমাণের ভিত্তিতে পৃথকভাবে সাজা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল অভিযোগের মধ্যে রয়েছে খুন, হত্যার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার মতো বিষয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২ পুলিশকর্মী ছাড়াও মামলায় আরও ৩ প্রাক্তন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক রবিউল ইসলাম এবং সাবেক উপপরিদর্শক বিভূতিভূষণ রায়। তবে এ তিনজনই বর্তমানে পলাতক বলে ঢাকা সূত্রে জানা গেছে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রাক্তন কর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক। একই সাজা দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলের ক্ষেত্রেও, তাঁরাও পলাতক রয়েছেন। এছাড়াও নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া ছাত্রলীগের এক প্রাক্তন নেতাকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম রায় ঘোষনার পর বলেন, ‘আবু সাঈদ নিজের প্রাণ দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন। আদালতের এ রায় সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি।’ আবু সাঈদের পরিবার রায়কে স্বাগত জানালেও আরও কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছে। নিহতের এক ভাই রমজান আলি বলেন, ‘নিম্নপদস্থদের শাস্তি হলেও উচ্চপদস্থদের তুলনায় শাস্তি অনেকটাই হালকা। আমরা ন্যায়বিচারের পূর্ণতা চাই।’ অন্যদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত দুই প্রাক্তন পুলিশকর্মীর আইনজীবী আজিজুল হক দুলু জানিয়েছেন, তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। তাঁর দাবি, এ রায়ের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
❤ Support Us







