- এই মুহূর্তে দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৫
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত ‘আবাস’ এ প্রমোটারের হাত । বোলপুর পুরসভার হস্তক্ষেপে থামলো কাজ
গড়া হবে বহুতল ! শান্তিনিকেতনে ভাঙা হচ্ছিল অবনীন্দ্রনাথের বাড়ি। সমালোচনার ঝড় উঠতে, অবশেষে স্মৃতি বিজড়িত সেই বাড়ি ভাঙার কাজ, বন্ধ করে দিল বোলপুর পুরসভা।
‘অনেক কালের ধনী গরিব হয়ে গেছে, তাদেরই ঐ বাড়ি।
দিনে দিনে ওর উপরে দুঃসময়ের আঁচড় পড়ছে।
দেয়াল থেকে বালি খসে পড়ে,
ভাঙা মেঝে নখ দিয়ে খুঁড়ে চড়ুইপাখি ধুলোয় পাখা ঝাপট দেয়।’
— বড়ো, আক্ষেপে, বড়ো অভিমানে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই ঠাকুর পরিবারের পুরনো বাড়ির দীর্ঘশ্বাস এখন শান্তিকেতনের বাতাসে, কোপাইয়ের জলে। বোলপুরবাসীর কাছে বড়ো গর্বের, স্মতিমেদুর জায়গা ‘অবনপল্লী’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বভারতীর দ্বিতীয় আচার্য । তাঁর ছেলে অলকেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে তৈরি করেছিলেন একটি বাড়ি। ‘আপন কথা’ বইয়ে অবন ঠাকুর লিখেছিলেন ‘মানুষের সঙ্গ পেয়ে বেঁচে থাকে বসত বাড়িটা’। ‘আবাস’-এর কথা ফিরে ফিরে আসে তাঁর লেখায়। সেই বাড়িই এখন প্রমোটারদের কড়াল গ্রাসে, নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। সেখানে তৈরি হবে বহুতল। বাড়িটি ভাঙচুরের খবর সামনে এসেছিল কয়েক আগে। সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে সে নিয়ে তুমুল সমালোচনার স্রোত তৈরি হয়। অবশেষে বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিল বোলপুর পুরসভা। চোখের সামনে এমন কাণ্ড দেখে স্থানীয়রা বলছেন, এভাবেই সব একদিন ঠিকাদার, জমি মাফিয়াদের দখলে চলে যাবে ! এদিকে বাড়ি ভাঙার প্রসঙ্গে ঠাকুর পরিবারের উত্তরসূরীদের এবং বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। যদিও বিশ্বভারতীর সঙ্গে এ বাড়িটির কোনো যোগ নেই, বাড়িটি বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকাধীন।
এই ঘটনার খবর পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রশাসন। বর্তমানে জমিটির কী পরিস্থিতি, সে নিয়ে ভূমি সংস্কার দফতরের কাছে রিপোর্ট তলব করেছেন বীরভূম জেলাশাসক। বুধবার সকালে সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকদের দল সেখানে গিয়ে মাপজোক করেছেন। বৃহস্পতিবার পুরসভার আধিকারিকরা বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। পৌরপ্রধান পর্ণা ঘোষ বলেছেন, আমরা বাড়ি ভাঙবার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। অনেক পরে সংবাদপত্রের সূত্রে জানি। জানার পরেই উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্মৃতি বিজড়িত বাড়িগুলি রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য, আমরা তা করে যাব। জেলাশাসককেও পুরো বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ অথবা শান্তিনিকেতনে ইউনেস্কোর ঘোষণা করা বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্রের মধ্যে বাড়িটি না থাকলেও, কেন এমন ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন অবনীন্দ্রনাথের উত্তরসূরীরা, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত প্রাক্তন ও বর্তমান অধ্যাপক, কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আক্ষেপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এ বাড়িটির মালিকঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি স্বর্গীয় অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী উত্তর ২৪ পরগনার সল্টলেক, বিধাননগরের বাসিন্দা অরুন্ধতী ঠাকুর এবং অমিতেন্দ্রনাথের পুত্র অয়নেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁরা গত বছর এপ্রিলে বাড়ি সমেত পুরো জমিটি বিক্রি করে দেন । হোক না ব্যক্তিগত সম্পত্তি, কিন্তু তা বলে এমনভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে বাঙালির ঐতিহ্য, স্মৃতিময় আখ্যান !
বিশ্বভারতীর পাঠভবনের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, শান্তিনিকেতনের প্রবীণ আশ্রমিক সুব্রত সেন মজুমদার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত বাড়ির কাছেই থাকেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে তাঁর ছেলেদেরও বসবাস করতে দেখেছি। এই বাড়ি ভেঙে ফেলাটা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বাড়ির কাঠামো ও গঠন অবন ঠাকুর, অলক ঠাকুরদের পরিকল্পিত ছিল। ইট-কাঠে জড়িয়ে আছে সেসব। এই বাড়ির কারণেই এলাকার নাম ‘অবনপল্লী’। ভাবতেও পারছি না এত সুন্দর বাড়ি এভাবে ভেঙে ফেলা হবে । শ্যাওলার মতো আস্তে আস্তে একটা আদর্শের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ধরছে রিসর্ট, হোটেল।’ বিশ্বভারতীর এক প্রাক্তন কর্মী আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘এমন করেই এক সময়ে রতনপল্লিতে দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত ‘সুরোপুরী’ বাড়িটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।’
❤ Support Us







