- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৫
নাগরিক অধিকার ও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ২৬-এর নির্বাচনী লড়াই; ঝাড়গ্রাম থেকে ঘোষণা জননেত্রী মমতার
ঝাড়গ্রামের আদিবাসী দিবস উদযাপন সফরে গতকাল থেকে ঝোড়ো ইনিংস খেলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবারের একাধিক কর্মসূচী, মিছিল শেষে বৃহস্পতিবার, ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়াম থেকে রাজ্য সরকারের আয়োজিত আদিবাসী দিবসের উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪ দিন ধরে চলবে এই বিশেষ অনুষ্ঠান, উদ্দেশ্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অধিকারকে সম্মান জানানো। দিনের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রীকে দেখা যায় একেবারে ঘরের মেয়ের মতোই আদিবাসী নৃত্যের ছন্দে পা মেলাতে। নিজে হাতে মাদল বাজিয়ে সকলের মন জয় করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেন, আত্মীয়ের মতো ভাব প্রকাশ করেন। এরপর মূলমঞ্চে উঠে অনুষ্ঠানের বাকি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বিশ্ব আদিবাসী দিবস প্রতিবছর ৯ আগস্ট পালিত হলেও, রাজ্য এই উৎসবকে ঘিরে আগেভাগেই আয়োজন শুরু করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মমতা নিজে। এই উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রশাসনিক, অন্যদিকে আবেগঘন সাংস্কৃতিক সংযোগের বার্তাও বহন করে।
আজ অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে স্পষ্ট করে জানালেন যে, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে, একদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এবং অন্যদিকে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষাকে সামনে রেখে তিনি লড়বেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ উদ্যোগে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ প্রক্রিয়ার আড়ালে নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে নাম সরিয়ে দেওয়ার তৎপরতা চলছে, এনআরসি করবার চেষ্টা করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এপিক কার্ড থাকলেই চলবে না, পুরনো নাম দেখলেই কাজ চলবে না। যে কোনো আইনি অসঙ্গতি তৈরি করে ভোট থেকে অনেকের নাম মোছার চেষ্টা হচ্ছে। ২০০২ সালের আগে জন্মগ্রহণকারীদের বাবা–মায়ের জন্ম সনদ দাবি করা হচ্ছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। এই বেনিয়াদের আড়ালে এনআরসি–র সূচনা করা হতে পারে। জনগণকে সতর্ক করে বলেন, ‘না জেনে ফর্ম ফিলাপ করবেন না। আপনার তথ্য নিয়ে ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হতে পারে। তারপর এনআরসির নোটিস ধরিয়ে দেবে।’ এরপর দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করেন, ‘আপনার নাম বাদ দিলে আমাকে পেরিয়ে যেতে হবে।’
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিজেপির আইটি সেল প্রধানের উপহাসমূলক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মমতা প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলা ভাষা যদি ভাষা না হয়, তাহলে জাতীয় সঙ্গীত কোন ভাষায় লেখা হয়েছে? রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুভাষচন্দ্র, এঁরা কোন ভাষায় কথা বলতেন?’ তিনি বলেন, ভাষা শুধুই শব্দ নয়; ভাষা মানুষের সম্মান, গর্ব ও আত্মপরিচয়। বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে ছোটো করা মানেই আত্মপরিচয়ের প্রতি অবজ্ঞা করা। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ভাষা আছে, যার সঙ্গে তার আত্মার যোগ, নারীর টান। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে রাজ্যের সরকারি কর্মকর্তাদের সাসপেন্ড করা নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আপনার অফিসার নির্বাচন ঘোষণার আগে কি কোনো আইনি ভিত্তিতে নোটিস পাঠাতে পারেন? আমি সরকারি কর্মচারীদের শাস্তি হতে দেব না।’ কর্মচারীদের ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নাম না করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্দেশে মমতা কটাক্ষ করে বলেন, ‘যারা আইন করছে, তাদের কি জন্মের শংসাপত্র আছে? ওরা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে, খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট কী বুঝবে!’ বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, ‘আমি না চাইলে কেউ আমাকে হারাতে পারবে না। বিজেপির লোকেরাও আমাকে ভোট দেবে, কারণ তাদেরও আশ্রয় দরকার।’ উদ্বেলিত জনতাকে নিজের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে জানান, ‘আমি সিপিএমের গুলি খেয়েও বেঁচে গেছি। ভয় পাই না, এঁদের পিঁপড়ের মতো মারব!’ এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিজেপি পাল্টা কটাক্ষ করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ‘আত্মবিশ্বাসহীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
গতকাল, ঝাড়গ্রামের রাস্তায় মিছিল করে বাংলাভাষীদের উপর ভিন্ রাজ্যে হওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছেন, ইতিমধ্যে ২ হাজারের বেশি বাঙালিকে ফিরিয়ে এনেছি। গুরগাঁও, অসম, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বাংলাভাষিরা নির্যাতিত হচ্ছেন, শুনলে মন ফেটে যায়। বাংলায় কথা বললেই এখন রোহিঙ্গা বলা হচ্ছে! ভোটের সময় টাকা দেবে, অথচ পরিচয় কেড়ে নেবে, এটা চলবে না! ভাষাবিদ্বেষ সংঘটিত যাতে হয় না, সে লড়াই চালিয়ে যাব।’ মমতার দুদিনের ভাষণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, তিনি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী আবেগময় রাজনীতির ‘জাল’ বোনার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ভাষা ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে আবেগঘন রাজনীতি, এনআরসি-র আশঙ্কা এবং ‘বহিরাগত’ বনাম ‘স্থানীয়’ বিতর্কে আবারও বিজেপির বিরুদ্ধে জনমত গড়তে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী বলে অভিমত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
❤ Support Us







