- খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২৮, ২০২৩
ভোট এলেই ইস্যু সংরক্ষণ ! এটাই কি প্রান্তিক মানুষের ভবিতব্য ?
সময়টা ২০১৫। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগের বছর। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময় রাজ্যের আরও ছ’টি জনগোষ্ঠীকে অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি বা ওবিসি বলে মান্যতা দিলেন। ২০১৫ সালের ২৬ মে মঙ্গলবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে কালোয়ার, আতা, সরওয়ালা, বাগানি, ভান্ডারি এবং খানসামা— ছ’টি জনগোষ্ঠীকে রাজ্যের ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই ছ’টিই মুসলিম জনগোষ্ঠী৷ সেই সময় রাজ্যের ওবিসি তালিকায় ১৬০ জনগোষ্ঠী ছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল এই ৬টি জনগোষ্ঠী যুক্ত হলে এই সংখ্যা বেড়ে ১৬৬ হবে৷ রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দফতর সময় মতো এই মর্মে বিজ্ঞপ্তিও জারি করবে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়এছিল।
২০১৯-এর জুলাই মাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা করলেন। এই ঘোষণায় দেশের চতুর্থ রাজ্য হিসেবে, শীর্ষ আদালতের নির্দেশিত সংরক্ষণের উর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে গেল পশ্চিমবঙ্গ। এই তালিকা ভূক্ত অন্যান রাজ্যগুলি হলো, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা। এর ঠিক ৬ মাস আগে, একই ধরণের সংরক্ষণ চালু করে নয়াদিল্লি। ২০১৯ এর আগে রাজ্যে সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ সংরক্ষিত ছিল। এরমধ্যে তপশিলি জাতির জন্য ২২, উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য ৬ এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য ১৭ শতাংশ আসন সংরক্ষিত ছিল। শেষ ১৭ শতাংশের মধ্যে মুসলিমদের একাংশও এই তালিকার অংশ। তবে তা ধর্মের ভিত্তিতে নয়, আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিরিখে। তাই ধর্ম এখানে বিচার্য নয়, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা অংশের যে কেউই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। সরকারি চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্যই ১৭ শতাংশ আসন সংরক্ষিত ।
এরাজ্যে, বার্ষিক আয় এবং সামগ্রিক ভাবে পিছিয়ে থাকার নিরিখে ওবিসি-দের ‘এ’ এবং ‘বি’ এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ ক্যাটাগরিতে, অন্তর্ভুক্ত ৯২ সম্প্রদায়ের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণ বরাদ্দ। বাকি সাত শতাংশ বরাদ্দ বি ক্যাটাগরিতে থাকা ২৪টি সম্প্রদায়ের জন্য। আর্থিক অবস্থার বিচারে, দুই ক্যাটিগরি মিলিয়ে মুসলিমরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়েরও বেশ কিছু মানুষের নাম বাংলার ওবিসি তালিকায় আছে।
এবার সেই তালিকা বাতিলের দাবিতেই সোচ্চার হয়েছে বাংলার গেরুয়া শিবির।রাজ্য বিজেপির মোর্চার অভিযোগ, রাজ্যের এই তালিকা মুসলিমদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। এই তালিকা বাতিল করতে হবে। বিজেপির ওবিসি মোর্চার দাবি, জাতীয় ওবিসি কমিশনের তালিকায় ১৬টি এমন পেশার উল্লেখ আছে সেগুলি বাংলার তালিকাতেও আছে। ওই পেশাগুলিতেই মুসলিমরা বেশি নিযুক্ত।এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিশনের নির্দেশিকা রাজ্যে অনুসরণ করেনি বলে বঙ্গীয় গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ।তাই তালিকায় বঞ্চিত হিন্দুরা । শুধুমাত্র মুসলিমরা বেশি সংখ্যায় যুক্ত এমন কিছু পেশাকেই বাড়তি সুবিধা দিয়েছে রাজ্য এবং নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ককে মজবুত করতেই শাসক শ্রেণীর পক্ষপাতিত্ব বলে অভিযোগ বিজেপির।
এবার প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে যদি এই তালিকা বাতিল হয় তাহলে বাকিদের কী হবে? এই নিয়ে বিজেপি ওবিসি মোর্চার বক্তব্য, গোটা দেশের মতো বাংলাতেও সাধারণ ক্যাটিগরিতে ১০ শতাংশ আসন ও পদ আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকুক। মুসলিমরা সেই সংরক্ষণের সুবিধা তো পেতেই পারেন। এপ্রসঙ্গে তারা কর্নাটকের সংরক্ষণ নীতিরনিয়ম বদলের উল্লেখ করেছেন। সেখানে দরিদ্র মুসলিমরা সাধারণ ক্যাটিগরির জন্য বরাদ্দ ১০ শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা পান।
প্রসঙ্গত কর্নাটকে বিধানসভা ভোটের নির্ঘন্ট ঘোষণার প্রাক মুহূর্তে, সেই রাজ্যে সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় মুসলিমদের জন্য বরাদ্দ চার শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে রাজ্যের বিজেপি শাসিত সরকার।সে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে কংগ্রেস-সহ সবকটি বিরোধী দল সংরক্ষণকেই অন্যতম ইস্যু ধরে বিজেপি সরকারের বিরোধিতায় নেমেছে।সপ্রিম কোর্টে এপ্রসঙ্গে একটি মামলায় হয়েছে। রাজ্য সরকারের সংরক্ষণ বাতিলের সেই নির্দেশিকায় স্থগিতাদেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত।মামলায় পরবর্তী শুনানি কর্নাটক নির্বাচনের পরেই হবে বলে জানিয়েছেন বিচারালয়।
এদিকে, সম্প্রতি তেলেঙ্গানায় গিয়ে অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন,তেলেঙ্গানায় বিজেপি সরকার গঠন করা মাত্রই মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। তাই বলা যায় মুসলিমদের সংরক্ষণ বাতিলের সিদ্ধান্ত যে শুধু ভোটমুখী কর্নাটকেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা নয়। অমিত শাহ তেলেঙ্গানায় জোর গলায় ঘোষণা করেছেন, বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতে কোনও সংরক্ষণ মানে না মানবে না। আর অমিত শাহের পথেই বাংলার মুসলিমদের সংরক্ষণ বাতিলের পথে যে বঙ্গ বিজেপির ওবিসি মোর্চা হাঁটবে সেটা নিশ্চিত করে বলা চলে। ভারতে ভোট এলেই সংরক্ষণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়, এটাই কী পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভবিতব্য?
নির্বাচনের মুখে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী সব দলই যে মুসলিমদের কাজে লাগিয়ে নেয়, সেটাই বাংলায়, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যে ভোটার মুখে শাসক দল বুঝিয়ে দিচ্ছে। আসলে কেউ সংরক্ষণের নাম কেউ সংরক্ষণ তুলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করছে। তাই পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের কান্নাকে কুম্ভীরাশ্রু ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। এর চাইতে রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের উচিত উন্নয়নমুখী রাজনীতি করা, যাতে সমাজের সব শ্রেণির উন্নয়ন হবে। কোনও সম্প্রদায় ভোটার ঘুটি হিসেবে বাব্যহৃত হবে না।
❤ Support Us








