- বি। দে । শ
- জুন ১, ২০২৬
গুগলের গুগলি ! ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে আমেরিকায় কয়েক কোটি ‘সৈনিক’ মশা ছাড়ার পরিকল্পনা
‘মশা মারতে কামান দাগা’— বাংলায় প্রচলিত বাগধারার কথা অজানা নয়, কিন্তু মশা মারতে মশা ‘সৈনিক’-এর ব্যবহারের কথা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। নাহ্ ! কোনো কল্পবিজ্ঞান বা হলিউডি থ্রিলার ছবি নয়, অবিশ্বাস্য লাগলেও ঠিক এমনই এক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে গুগলের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা, চিকুনগুনিয়া থেকে শুরু করে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো মশাবাহিত রোগের মোকাবিলায় আমেরিকায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়েছে সংস্থাটি। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিগুলির অন্যতম হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ২ বছরে ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মোট ৩ কোটি ২০ লক্ষ বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশা ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে এ মশাগুলি সাধারণ মশা নয়। তাদের শরীরে রয়েছে ‘ওলবাখিয়া’ নামে এক ধরনের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা বিজ্ঞানীদের মতে মশার বংশবিস্তার রুখতে সক্ষম। বর্তমানে মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা-র কাছে জমা পড়া এই প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামী ৫ জুন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংস্থাটি। যদিও কোন কোন এলাকায় এই মশা ছাড়া হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়নি।
প্রথম শুনলে বিষয়টি কিছুটা অবাক করার মতো। মশার উপদ্রব কমাতে আবার কোটি কোটি মশা ছাড়া হবে কেন? কিন্তু বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য মশার সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের জনসংখ্যাকে ধীরে ধীরে সংকুচিত করে ফেলা। ওলবাখিয়া আসলে এমন একটি ব্যাকটেরিয়া, যা প্রকৃতিতে বহু কীটপতঙ্গের শরীরেই স্বাভাবিক ভাবে উপস্থিত থাকে। প্রজাপতি, মথ, গুবরে পোকার মতো অসংখ্য পতঙ্গের মধ্যে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মানুষের শরীরে এটি সংক্রমণ ঘটায় না, প্রাণীদের জন্যও ক্ষতিকর নয়। গবেষকদের দাবি, এই ব্যাকটেরিয়া মশা নিয়ন্ত্রণের অভিনব অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
পদ্ধতিটিও বেশ চমকপ্রদ। গবেষণাগারে তৈরি ওলবাখিয়া-সংক্রমিত পুরুষ মশাগুলিকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারা গিয়ে স্বাভাবিক স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হবে। কিন্তু স্ত্রী মশার শরীরে একই ব্যাকটেরিয়া না থাকলে সে মিলনের ফলে যে ডিম তৈরি হবে, তা আর ফুটবে না। অর্থাৎ নতুন মশার জন্মই হবে না। ফলে ধীরে ধীরে ওই এলাকার মশার সংখ্যা কমতে থাকবে। এই পরিকল্পনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শুধুমাত্র পুরুষ মশাই ছাড়া হবে। কারণ, মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা। পুরুষ মশা রক্ত খায় না। ফলে কোটি কোটি মশা ছাড়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অতিরিক্ত মশার কামড়ের শিকার হতে হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন গবেষকেরা।
অভিনব এই প্রযুক্তির নেপথ্যে রয়েছে অ্যালফাবেটের ‘ডিবাগ’ প্রকল্প। ২০১৬ সালে সংস্থাটির জীবনবিজ্ঞানভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ভেরিলি’ এই উদ্যোগ শুরু করে। রোগবাহিত পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে গড়ে ওঠে প্রকল্পটি। তবে, এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালিতে এর আগেও সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক ভাবে ওলবাখিয়া-সংক্রমিত মশা ছাড়া হয়েছিল। গবেষকদের দাবি, কিছু এলাকায় তার ফলে মশার সংখ্যা ৯৫ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। কয়েকটি স্থানে মশার জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্তির মুখে পৌঁছেছিল।
সবচেয়ে নজরকাড়া সাফল্যের উদাহরণ মিলেছে সিঙ্গাপুরে। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে সেখানে বহু বছর ধরেই ওলবাখিয়া-ভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যে সব এলাকায় এই কর্মসূচি কার্যকর করা হয়েছিল, সেখানে এক বছরের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান বিস্তারের প্রেক্ষাপটে এ সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ন এবং মশার বাসস্থানের সম্প্রসারণের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যে কারণে কীটনাশকের বিকল্প পথ খুঁজছেন গবেষকেরা। প্রকল্পের
তথ্য অনুযায়ী, গুগল এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই চারটি মহাদেশে একশো কোটিরও বেশি ওলবাখিয়া-সংক্রমিত মশা ছেড়েছে। ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার এই নতুন অভিযান অনুমোদন পেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের সবচেয়ে বড়ো উদ্যোগ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। এই পর্যায়ে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে ‘কিউলেক্স’ প্রজাতির মশাকে। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস এবং সেন্ট লুইস এনসেফ্যালাইটিসের প্রধান বাহক এই মশা। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, ওয়েস্ট নাইল এখনও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে সাধারণ মশাবাহিত রোগ। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কাউন্টিতেও ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
তবে কোটি কোটি মশা উৎপাদন, তাদের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী মশাকে আলাদা করা এবং নির্দিষ্ট এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া সহজ কাজ নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘ডিবাগ প্রকল্প’ ভরসা করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক প্রযুক্তির উপর। এআই-চালিত লিঙ্গ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় প্রজনন ইউনিট এবং বিশেষ যানবাহন-ভিত্তিক মুক্তি প্রযুক্তির সাহায্যে বিশাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললে প্রথম বছরে ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ করে মশা ছাড়া হবে। দ্বিতীয় বছরেও একই সংখ্যক মশা মুক্ত করা হবে। সব মিলিয়ে ২ বছরে সংখ্যাটি পৌঁছবে ৩ কোটি ২০ লক্ষে।
এরই মধ্যে মশা নিয়ে আরও এক আকর্ষণীয় গবেষণা সামনে এসেছে। সম্প্রতি, ‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি’-তে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, মশারও শেখার ক্ষমতা থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একটি বহুল ব্যবহৃত মশা-প্রতিরোধক রাসায়নিকের গন্ধের সঙ্গে বারবার পরিচিত হলে মশাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। গবেষকদের মতে, কোনো রাসায়নিকের বিষাক্ততা নয়, বরং সেই রাসায়নিক সংকেতকে মশা কী ভাবে ব্যাখ্যা করছে, তার উপরই অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের প্রতিক্রিয়া। সে কারণেই মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই বিজ্ঞানীরা এখন ক্রমশ জৈবিক ও পরিবেশবান্ধব সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন। ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগল-সমর্থিত এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সবুজ সংকেত পায় কি না, সেদিকেই নজর এখন জনস্বাস্থ্য মহল থেকে পরিবেশবিদ— সকলের। কারণ, সফল হলে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ মোকাবিলার কৌশলই বদলে যেতে পারে।
❤ Support Us








