- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৩, ২০২৫
নবাব সিরাজদ্দৌলার স্মৃতিবিজড়িত হীরাঝিল রক্ষার আবেদন খারিজ হাইকোর্টে
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার স্মৃতিবিজড়িত হীরাঝিল প্রাসাদ রক্ষার দাবিতে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলা কলকাতা হাইকোর্ট খারিজ করে দিল। বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি স্মিতা দাসের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছেন, ‘এ মামলা জনস্বার্থের আওতায় পড়ে না। ঐতিহাসিক আবেগ স্বীকার করা হলেও, বাস্তবতার নিরিখে এমন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। এরপর মামলাটি খারিজ করে দেন বিচারপতিরা।
মামলাটি দায়ের করেছিল ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্ট’। তাদের অভিযোগ, মুর্শিদাবাদের গঙ্গার তীরে অবস্থিত হীরাঝিল প্রাসাদের যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে, তা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে এবং প্রশাসনের তরফে কোনো রকম সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা দাবি করেছে, যেখানে হাজারদুয়ারিকে হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে হীরাঝিলকে ওই তালিকা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদিও আদালতের পর্যবেক্ষণ, এ মামলার পেছনে আবেগ থাকলেও, সাধারণ মানুষের স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করছে না। তাই এটিকে জনস্বার্থ মামলা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, হীরাঝিল প্রাসাদ নির্মাণের কিছু বছরের মধ্যেই আংশিকভাবে ভেঙে পড়ে। সিরাজের উত্তরসূরিরা নিজেরাই প্রাসাদের ভিত্তি ভেঙে দেন। পরবর্তীতে গঙ্গার ভাঙনে প্রাসাদের একটি বড়ো অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এদিন, রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, বর্তমানে যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, তা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। কয়েক দশক আগে ওই স্থান কিছুটা পরিষ্কার করে উদ্ধার করার চেষ্টা হয়েছিল, তবে পরিস্থিতির আর ভৌগলিক কারণে এরপর আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইতিহাস বলছে, সিরাজ তখনও নবাব হননি। দাদু আলিবর্দি খানের ছায়াতেই হচ্ছেন। মাসি ঘসেটি বেগমের তৈরি মোতিঝিল প্রাসাদ দেখে মুগ্ধ সিরাজের ইচ্ছা, তার থেকেও জাঁকজমকপূর্ণ একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন তিনি। এরপর ১৭৫০ সালের আশপাশে সিরাজদ্দৌলা নিজের জন্য এক সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ করেন ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে। মোতিঝিলের জবাব দিতে চেয়েই তিনি ঝিল খনন করে নাম দেন ‘হীরাঝিল’। মোতির চেয়ে দামি হীরার প্রতি ইঙ্গিত করেই এমন নামকরণ। প্রাসাদটি ৩টি পৃথক দিক থেকে দেখলে তিনটি ভিন্ন প্রাসাদের মতো মনে হত। সন্ধ্যাবেলায় এখানে নাচগান হতো, দরবার বসত, এবং তৎকালীন সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল হীরাঝিল। তবে ইতিহাসের করালগ্রাস থেকে বাঁচতে পারেনি সিরাজের স্বপ্নমাখা প্রাসাদ। পলাশির যুদ্ধের ঠিক আগের সন্ধ্যায় তিনি শেষবারের মতো এখানে এসেছিলেন, কিন্তু এরপর আর ফেরা হয়নি। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সিরাজ প্রাণ হারান, আর তাঁর হীরাঝিল প্রাসাদ পড়ে থাকে বিস্মৃতির অন্ধকারে।
আদালতে, মামলাকারীর দাবি ছিল, প্রাসাদের যেটুকু অংশ এখনো রয়ে গেছে, তা সংরক্ষণে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিক আদালত। কিন্তু সরকারি পক্ষ জানায়, ১৭৫৮ সাল নাগাদ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হীরাঝিল ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে তার কোনো কার্যকর চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। এ প্রেক্ষিতে আদালতের মন্তব্য, ‘ঐতিহাসিক আবেগ যতই প্রগাঢ় হোক না কেন, জনস্বার্থ মামলার যে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও মাপকাঠি রয়েছে, এ মামলা সেই মাপকাঠিতে পড়ে না। অতীতের গৌরবময় অধ্যায় থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতা তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।’
❤ Support Us







