- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১৪, ২০২৫
মেঘভাঙা বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় তছনছ হিমাচল, উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনী। লাগাতার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত
হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি জনপদে ফের ভয়াবহ রূপ নিল প্রকৃতির খেয়ালিপনা। বুধবার সন্ধ্যায় আকস্মিক মেঘভাঙা বৃষ্টিতে কিন্নৌরের হোজিস লুংপা নালায় সৃষ্টি হয়েছে প্রবল বন্যা। সুতলজ নদীর উপর নির্মিত সেতু একেবারে জলের তোড়ে তলিয়ে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার অভিযানে নামে ভারতীয় সেনা। দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর মানবিক সাহায্য ও দুর্যোগ ত্রাণ বাহিনী রাতের অন্ধকারে প্রবল স্রোত পেরিয়ে পৌঁছে যায় দুর্গম এলাকায়। ঋষি ডোগরি উপত্যকার গ্যাংথাং ব্রালাম অভিমুখে সিপিডব্লিউডি-এর অধীন একটি সক্রিয় সড়ক নির্মাণ এলাকায় বাঁধ ভেঙে জল ঢুকে পড়ে। আহত হন এক ব্যক্তি। স্থানীয় পুলিশ সুপারের তরফে পাওয়া জরুরি বার্তার ভিত্তিতে সেনা পাঠানো হয় দুর্গত এলাকায়। জানা গিয়েছে, নদীর অপর পারে আটকে পড়েছিলেন ৪ জন স্থানীয় বাসিন্দা মানুষ। অনিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ পরিকল্পনায় আলো জ্বালিয়ে উদ্ধার কাজ চালান সেনারা। সফলভাবেই ৪ জনকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়।
সেনা সূত্রে খবর, খাদ্য ও পানীয় সরবরাহে ব্যবহৃত হয় আধুনিক লজিস্টিক্স ড্রোন হাই অল্টিটিউড সিস্টেম। আটকে পড়া ব্যক্তিদের জন্য ড্রোনের মাধ্যমে পাঠানো হয় খাবার ও ডাবের জল। বর্তমানে তারা পুহ সেনা শিবিরে রয়েছেন, পর্যবেক্ষণের পর তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ভাষায়, ‘এ উদ্ধার অভিযান আমাদের প্রস্তুতি, প্রযুক্তি ও প্রতিকূল পরিবেশে জনসেবার অঙ্গীকারের প্রমাণ।’ তবে এটি একক ঘটনা নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় হিমাচল প্রদেশের কুল্লু, লাহৌল-স্পিতি, ও সিমলার মতো একাধিক জেলায় দফায় দফায় মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছে সেতু, ধসে পড়েছে রাস্তাঘাট। নান্তি গ্রামে মেঘভাঙার ফলে ২ টি সেতু, একাধিক দোকান এবং পুলিশ আউটপোস্ট ধ্বংস হয়ে পড়ে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এলাকায়। কুল্লুর ভীমদ্বারি এবং বাতাহার গ্রামে পৃথকভাবে ধসে পড়ে গাড়ি, কটেজ ও কৃষিজমি। প্রাণহানির খবর না থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে। লাহৌল-স্পিতির ঢোধান, চাংগুট ও উদগোস গ্রামে বন্যা ও ধস নেমে আসে। চাংগুট ও উদগোস সেতু ভেসে গিয়েছে। প্রশাসনের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে রওনা দিয়েছে। মান্ডি জেলায় পুরণ চাঁদ নামে এক ব্যক্তি অস্থায়ী সেতু থেকে পড়ে মারা যান। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে স্থায়ী সেতু নির্মাণ করতে হবে। রাজ্যজুড়ে বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থার ছবি ফুটে উঠেছে সরকারি পরিসংখ্যানে। স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের তথ্য অনুসারে, ৩২৩টি রাস্তা বন্ধ, মান্ডিতেই ১৭৯টি। ১৩০টি পানীয় জল প্রকল্প ও ৭৯টি বিদ্যুৎ ট্রান্সফর্মার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত।
আবহাওয়াবিদদের দাবি, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিছক দৈব নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে বৃষ্টিপাতের ধরন ও তীব্রতা গত কয়েক বছরে আমূল বদলে গিয়েছে। রাজ্য সরকারের হিসেব অনুযায়ী, ২০ জুন থেকে এখনো পর্যন্ত হিমাচল প্রদেশে ২,০০০ কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১২০ জন, নিখোঁজ ৩০। প্রতিবেশি রাজ্য উত্তরাখণ্ডের পরিস্থিতি মর্মান্তিক। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার ‘লাল সতর্কতা’ জারি করেছে উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, বিহার, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ সহ একাধিক রাজ্যের জন্য। সতর্কতায় বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় প্রবল বর্ষণ, ফ্ল্যাশ ফ্লাড এবং ভূমিধসের সম্ভাবনা প্রবল। বন্যা প্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর সিকিমেও দেখা গিয়েছে দুর্যোগের ছায়া। টানা বৃষ্টিতে ধসে বন্ধ হয়ে গিয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক ১০, যা শিলিগুড়ি থেকে সিকিম এবং কালিম্পং-এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সেনাবাহিনীর জন্য এই রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প রাস্তাগুলোর অবস্থা খারাপ হওয়ায় যাত্রীদের ঘুরপথে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে এবং তাতে সময় ও খরচ, উভয়ই বাড়ছে। জানা যাচ্ছে, তিস্তার ভাঙনে রাস্তার বিস্তীর্ণ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এনএইচ-৭১৭১-এ নির্মীয়মাণ একটি সেতুও বিপদের মুখে, মাঝের অংশ বসে গিয়েছে। ফলে বিকল্প রাস্তাও কার্যত অকেজো। যানবাহন আটকে পড়েছে শ্বেতীঝোরা অঞ্চলে, পর্যটন ও সামরিক রসদ পরিবহন বিপর্যস্ত। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পথ বন্ধ রাখা হবে, তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সময়সীমা আরো বাড়ানো হতে পারে। তবে দীর্ঘ ২ মাস পর বিআরও-এর প্রকল্প স্বস্তিক উত্তর সিকিমের সাংকলাং মডুলার ব্রিজ চালু হয়েছে। এতে লাচেন, লাচুং, ও দজংগু অঞ্চলের যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টেস্টা নদীর তীব্র স্রোত ও অনিরাপদ পাড়ে কাজ করে বিআরও এই ব্রিজ দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণ করেছে, যা মানুষের জীবনযাত্রা ও পর্যটনের গতি ফেরাতে সাহায্য করবে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে বর্ষার পরিসংখ্যানে। যেখানে ‘মেঘের দেশ’ মেঘালয়ে ৪৫% বৃষ্টির ঘাটতি, সেখানে ‘ঠান্ডা মরুভূমি’ লাদাখে বর্ষায় ১১৫% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্য যেমন অসম, অরুণাচল, সিকিমেও ঘাটতির ছবিই স্পষ্ট। অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার এহেন এলোমেলো আচরণের পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব। যেখানে বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে খরা, আবার যেসব জায়গায় অতিবৃষ্টি, সেখানে অবকাঠামো তৈরি নেই এমন চাপে দুর্যোগ বাড়ছে বই কমছে না। সবমিলিয়ে, দেশের একাধিক পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের জীবন, পরিকাঠামো এবং পরিবেশ আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। সময় থাকতে সতর্ক না হলে এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও ভয়ানক রূপ নিতে পারে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ‘পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া জীবন ও সম্পদ প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। সরকার ও নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব, সচেতনতা এবং টেকসই পদক্ষেপই একমাত্র রক্ষা করতে পারে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে।’
❤ Support Us





