- বি। দে । শ
- অক্টোবর ১৪, ২০২৬
সৌদিতে লাগাতার হুথি হামলা, আরামকোর দফতরে আগুন, বিপর্যস্ত বিমান পরিষেবা ! যুদ্ধে জড়াবে আমেরিকা?
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে তেল শোধনাগার, গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে সামরিক ঘাঁটি — সৌদি আরবের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে নিশানা করে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলায় প্রাণহানির পাশাপাশি কয়েকশো মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার জেরে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত। নিরাপত্তার কারণে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবের একাধিক শহরগামী উড়ান বাতিল করেছে ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলি।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা আরামকোর প্রশাসনিক ভবনকে নিশানা করে হামলার অভিযোগ উঠেছে হুথিদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার রাতে ওই ভবনে হামলার পর আগুন লাগে বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রক। তবে ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর মেলেনি। এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি-নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি পরিকাঠামোয় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার খবর সামনে এসেছিল। তার পরেই ধাহরানে আরামকোর ভবনে হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। একই সময়ে সৌদি রাজধানী রিয়াধের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কয়েক জন আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক বাড়ি। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের খবর সামনে এসেছে।
এরকম অবস্থায় সৌদির পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি যুদ্ধে আমেরিকা যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রশ্নে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর অধীনে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, সৌদির সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইসলামাবাদের ‘অটল প্রতিশ্রুতি’ রয়েছে। জোটের মহাসচিব নওমান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তান পাশে থাকবে। আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের বৈধ অধিকারকেও সমর্থন করে ইসলামাবাদ। চলতি মাসের গোড়ায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার বিষয়ে একমত হয়েছিল। হুথিদের হামলা মোকাবিলায় দ্রুত সৌদি আরবে বাহিনী মোতায়েন করার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে তুরস্ক স্পষ্ট করে দিয়েছে, আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতার মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রফতানিকারক সংস্থা আরামকোর পরিকাঠামোয় হামলার ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি আরবের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে এই সংস্থার উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানি ব্যবস্থা গভীর ভাবে যুক্ত। ফলে প্রশাসনিক ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় সরাসরি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে কি না, তা জানা জরুরি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আরামকোর তেল উৎপাদন বা রফতানি ব্যবস্থায় বড়ো ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। জানা যাচ্ছে, হামলার আগে তেল পরিকাঠামোর আশপাশে থাকা কর্মী ও সাধারণ মানুষকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল হুথিরা। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি তেলকেন্দ্রগুলিকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলে উল্লেখ করেন। এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি জ্বালানি কেন্দ্রে হামলার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সে ঘটনার পরই ধাহরানে আরামকোর ভবনে হামলা হওয়ায় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি আক্রমণের যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মঙ্গলবার ইয়েমেনের রাজধানী সানার আল-সাবাহ এলাকায় একটি জ্বালানি পরিকাঠামো খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই শহরে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হুথি-সমর্থিত সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ওই এলাকায় একটি জ্বালানি কেন্দ্রে বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন অয়েল কোম্পানির দাবি, তাদের জ্বালানি মজুত কেন্দ্রগুলি আগে থেকেই খালি ছিল। তাই হামলার ফলে তেলের মজুত বা স্থানীয় বাসিন্দাদের সরবরাহে প্রভাব পড়বে না। তবে হামলার আশঙ্কায় সানার কয়েকটি পেট্রল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে, এ আশঙ্কাতেই অনেকে আগেভাগে তেল সংগ্রহ করতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেছেন, হুথিরা ওই জ্বালানি পরিকাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ভাণ্ডার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করে। জোটের দাবি, সামরিক কাজে ব্যবহৃত পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে, অসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। অন্যদিকে, হুথি-সমর্থিত সূত্রগুলির দাবি, হামলায় সাধারণ নাগরিক হতাহত হয়েছেন। সানায় হামলার খবর ছড়ানোর পর হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবকে পাল্টা আক্রমণের হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর বক্তব্য, সৌদি বাহিনী সানায় হামলা চালালে রিয়াধকে ‘কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক’ প্রত্যাঘাতের মুখে পড়তে হবে। এর পরই ধাহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার খবর সামনে আসে। ফলে জ্বালানি পরিকাঠামোকে ঘিরে দুই পক্ষের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সৌদি আরবের দাবি, রিয়াধের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে। সৌদির সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দু-টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়। তার ধ্বংসাবশেষ পড়ে ৪ জন আহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিয়াধ প্রদেশের আল-খারজ গভর্নরেটের আকাশে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার রাতে রিয়াধ এবং দক্ষিণ সৌদি আরবের দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছিল বলে জোটের তরফে দাবি করা হয়েছে। তবে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে রাজধানী রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরপর হামলার ঘটনায়। গত কয়েক দিনে বিমানবন্দরটিকে একাধিক বার নিশানা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। শনিবারের হামলায় প্রথমে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। পরে আরও এক জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। রবিবারের পৃথক হামলায় আরও এক জনের মৃত্যু এবং ১১ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৌদি আরবের অসামরিক বিমান পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিষেবা বন্ধ রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহণ, সংযোগকারী উড়ান এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলিও ব্যাহত হয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। ফলে আকাশপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ সংস্থাগুলি। আমেরিকার ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ মার্কিন বিমান সংস্থাগুলিকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকতে বলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা ইএএসএ-ও সৌদি আরবের আকাশপথ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের জেরে ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলিও একাধিক গন্তব্যে উড়ান বাতিল করেছে। ইন্ডিগো জানিয়েছে, রিয়াধ, জেড্ডা, দাম্মাম ও মদিনাগামী ও সেখান থেকে ছাড়ার উড়ান ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল থাকবে। এয়ার ইন্ডিয়া ও এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসও রিয়াধ, জেড্ডা ও দাম্মামের সঙ্গে সংযোগকারী পরিষেবা বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে। আকাসা এয়ার জানিয়েছে, রিয়াধ ও জেড্ডাগামী উড়ানও ওই তারিখ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
ভারতীয় যাত্রীদের পাশাপাশি সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। উড়ান বাতিলের কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরতে পারছেন না। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে থাকা ভারতীয়দের জন্য সতর্কতা জারি করেছে রিয়াধের ভারতীয় দূতাবাস। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না-বেরোনো এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রিয়াধের বিমানবন্দরে হামলায় এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর হয়েছিল, দূতাবাসের তরফে তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ও শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করার কথা জানানো হয়েছিল। আহত ভারতীয়দের কয়েক জনের হাসপাতালে চিকিৎসা চলার খবরও সামনে এসেছে। উড়ান বাতিলের প্রভাব শুধু যাত্রীদের যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ, কর্মসূত্রে যাতায়াত এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলির সংযোগকারী পরিষেবাও এর ফলে চাপে পড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে জ্বালানির দাম এবং বিমান সংস্থাগুলির পরিচালন ব্যয় ইতিমধ্যেই উদ্বেগের কারণ। তার সঙ্গে নতুন করে বিমান চলাচলে বিঘ্ন যুক্ত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
হুথিদের লাগাতার হামলার আবহে সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে যুবরাজকে একাধিক সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাবাহিনী তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচির পর থেকে যুবরাজকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তবে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তরফে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের শাসনব্যবস্থা এবং জ্বালানি নীতির ক্ষেত্রে মহম্মদ বিন সলমনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবর সামনে আসায় পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্যও বেড়েছে। তবে এ খবরের ভিত্তিতে সৌদি নেতৃত্বের কার্যকলাপ ব্যাহত হয়েছে বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
তবে এ কথা স্পষ্ট, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়িয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিশরের মতো দেশের কাছে সামরিক সহযোগিতা চেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আমেরিকার কাছ থেকেও আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোয়েন্দা সহায়তা চাইতে পারে রিয়াধ। আমেরিকা ইতিমধ্যেই সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা এবং আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের মতো ক্ষেত্রে সাহায্য করছে। কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনও সতর্ক ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তিনি বিবেচনা করবেন। তবে নতুন করে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরব ও আমেরিকার বিমান হামলার পরেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায়নি। ফলে ফের সরাসরি আক্রমণ শুরু করলে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবকে সাহায্য করার প্রয়োজন থাকলেও আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আমেরিকায় এমনিতেই উদ্বেগ রয়েছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় নতুন একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার রাজনৈতিক ঝুঁকিও কম নয়।
হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইজ়রায়েলের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ়’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকার মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের কাছে সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন সে প্রস্তাবে আপত্তি জানান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নেতৃত্বের আশঙ্কা, ইয়েমেনের যুদ্ধে ইজ়রায়েল সরাসরি যোগ দিলে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। সৌদি আরব ও ইজরায়েলের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে রিয়াধ দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান জানিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বরাবরই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। তবে, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একাধিক বার উদ্যোগী হয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের আবহে ইজরায়েলের সামরিক অংশগ্রহণ সৌদি আরবের জন্য কূটনৈতিক ভাবে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাতের প্রভাব কেন আন্তর্জাতিক স্তরে এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি। ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়া উপকূলের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ় খালের দক্ষিণ প্রবেশপথ হিসেবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রণালিটির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ২৯ কিলোমিটার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে। তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহণের জন্যও এই পথ গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে পাঠিয়ে সেখান থেকে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ইয়ানবু থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে দক্ষিণমুখী তেল রফতানি দৈনিক ৩৫ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। এক বছর আগে সেই পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ লক্ষ ৪০ হাজার ব্যারেল। শুধু জ্বালানি নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও লোহিত সাগরের গুরুত্ব রয়েছে। গবেষণা সংস্থা টেলিজিওগ্রাফির অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বের ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তথ্য পরিবহণের বিপুল ক্ষমতা লোহিত সাগরের নীচে থাকা যোগাযোগ পরিকাঠামোর উপর নির্ভরশীল। ফলে হুথিদের হামলা যদি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত করে, তবে তার প্রভাব সৌদি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় পড়তে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সৌদি আরবের উপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। গত মাসে দ্রুত স্থল অভিযান চালিয়ে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর শহর দখল করেছিল হুথিরা। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীকে সেখান থেকে পিছিয়ে যেতে হয়। পশ্চিম উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকাতেও হুথিদের অগ্রগতির খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রণালির মধ্যে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সংঘাতের খবর সামনে এসেছে। এর জবাবে সৌদি আরবের সমর্থনে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। মঙ্গলবার সরকারি বাহিনীর দাবি, দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের তাইজ গভর্নরেটে হুথিদের অবস্থান ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে ন-টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাইজের দক্ষিণে আল-শাকাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই চলছে বলেও জানা যাচ্ছে।
ইয়েমেন সরকারের অভিযোগগ, গত ২৪ ঘণ্টায় তাইজ়ে হুথিদের হামলায় অন্তত ৫ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে এক শিশুকন্যাও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গোলাবর্ষণের ফলে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, দু-শোর বেশি বেশি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বহু শিশুও রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ২ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি’-র সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিচ সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড়ো মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ইয়েমেনে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও অসামরিক পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এডেন ও সানার মতো এলাকাতেও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংঘাতে জড়িত সমস্ত পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি। সৌদি আরবে হুথিদের লাগাতার হামলার নিন্দা করেছে ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ’ও। সংগঠনের মহাসচিব শেখ মহম্মদ বিন আবদুলকরিম আল-ইসা বলেছেন, সাধারণ মানুষ এবং বেসামরিক পরিকাঠামোকে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিশানা করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এই হামলা আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে।
হুথিদের ধারাবাহিক হামলার জেরে সৌদি আরবের সামনে এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। দেশের বিমানবন্দর ও জ্বালানি পরিকাঠামো রক্ষা করা, ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি ঠেকানো, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মিত্র দেশগুলির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহযোগিতা আদায় করা — সব দিকই সামলাতে হচ্ছে রিয়াধকে। অন্যদিকে, আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেবে কি না, তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাইরে এগোবে কি না এবং ইজরায়েল কোনো ভাবে সংঘাতে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অতীতের দীর্ঘ সামরিক অভিযান হুথিদের সম্পূর্ণ ভাবে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাই নতুন করে বিমান হামলা চালিয়ে কতটা স্থায়ী সাফল্য পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সামরিক প্রত্যাঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। কারণ, সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে তার সবচেয়ে বড়ো মূল্য দিতে হবে সৌদি ও ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। একই সঙ্গে জ্বালানি শিল্প, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বিশ্ব বাণিজ্যের উপরও চাপ বাড়বে।
❤ Support Us






