Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ৬, ২০২৬

তাপ ও দূষণ একত্রে মাপতে নতুন সূচকের উদ্ভাবন খড়গপুর আইআইটির, নগর পরিকল্পনায় নতুন দিশার সম্ভাবনা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
তাপ ও দূষণ একত্রে মাপতে নতুন সূচকের উদ্ভাবন খড়গপুর আইআইটির, নগর পরিকল্পনায় নতুন দিশার সম্ভাবনা

শহরের ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ  বায়ুদূষণের ভয়াবহ যুগলবন্দি আলাদা কোনো সমস্যা নয়বরং একে অপরকে শক্তিশালী করে তোলা যৌথ সংকট। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আইআইটি খড়গপুরের গবেষকরা এমন এক নতুন বৈজ্ঞানিক সূচক উদ্ভাবন করেছেনযা শহরের তাপমাত্রাজনিত চাপ এবং বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবকে একসঙ্গে মেপে স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করতে সক্ষম। নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু-সহনশীল শহর নির্মাণের ক্ষেত্রে এ উদ্যোগকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইআইটি খড়গপুরের সেন্টার ফর ওশান’, ‘রিভারঅ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড সায়েন্স’-এর গবেষকরা এই নতুন সূচক উদ্ভাবন করেছেন। গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন অধ্যাপক জয়নারায়ণন কুট্টিপ্পুরাথ এবং গবেষক ভি কে প্যাটেল। তাঁদের তৈরি বিশেষ সূচক মূলত আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবঅর্থাৎ ঘনবসতিপূর্ণ কংক্রিট-ঢাকা শহরে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে ওঠার প্রবণতা এবং একাধিক বায়ুদূষকের সম্মিলিত প্রভাবকে একত্রে বিচার করে সমন্বিত স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র তৈরি করে।

সাড়া ফেলে দেওয়া গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল কেস স্টাডিজ ইন কেমিক্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ। গবেষকদের বক্তব্য, এতদিন শহরের তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণকে আলাদাভাবে মাপা হতো। আবহাওয়া দফতর কিংবা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলি সাধারণত পৃথক পৃথক সূচকের মাধ্যমে দুটি সমস্যাকে বিশ্লেষণ করত। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্রুত নগরায়ণঅপরিকল্পিত শহর সম্প্রসারণযানবাহনের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাশিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত দূষণ আর তার সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব— সব মিলিয়ে দুই সংকট একসঙ্গে মানুষের শরীরে চাপ সৃষ্টি করছে। এই যৌথ প্রভাব অনেক সময় আলাদা করে দেখা হলে প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় কম করে ধরা পড়ে। সে ঘাটতি পূরণ করতেই তৈরি হয়েছে নতুন সূচক আরবান হিট অ্যান্ড পলিউশন ইনডেক্স’ বা ‘ইউএইচপিআই’। এই সূচকের একই সঙ্গে তাপমাত্রাজনিত চাপ  বায়ুদূষণের মাত্রা মিলিয়ে একক স্বাস্থ্যঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছেযা শহর পরিকল্পনায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

গবেষণা প্রথম ধাপে ভারতের রাজধানী দিল্লিকে পরীক্ষামূলক শহর হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণবায়ুদূষণের নিরিখে দিল্লি দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বাধিক সংকটপূর্ণ মহানগর। গবেষণার ফলাফলে দেখা গিয়েছেদিল্লির কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমের শিল্পঘন এলাকাগুলিতে ‘ইউএইচপিআই’-এর মান সবচেয়ে বেশি। অঞ্চলগুলি ঘনবসতিপূর্ণকংক্রিটে ঢাকা এবং শিল্প ও যানবাহনের দূষণে বিপর্যস্ত হওয়ায় সেখানে পরিবেশগত চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।  অন্যদিকেদক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির মতো তুলনামূলকভাবে সবুজকম জনবসতিপূর্ণ এবং পরিকল্পিত এলাকায় ‘ইউএইচপিআই’-এর মাত্রা অনেক কমযা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। গবেষকদের মতেএ পার্থক্য প্রমাণ করে যে, সবুজ অবকাঠামো ও পরিকল্পিত নগরায়ণ পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

নতুন গবেষণার ভিত্তিতে কলকাতার জন্যও একই ধরনের ঝুঁকি মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে। গবেষক কুট্টিপ্পুরাথ জানিয়েছেন, ‘প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী কলকাতার নিউ টাউন-এর মতো পরিকল্পিত ও তুলনামূলকভাবে সবুজ এলাকাগুলি কম ঝুঁকিপূর্ণ। তবে কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকার অনেক পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ উপশহরযেখানে সবুজ আচ্ছাদন কমসেখানে ঝুঁকি অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঝুঁকি মানচিত্র বছরের শেষ অথবা আগামী বছরের শুরুতে প্রকাশিত হতে পারে।’ এ গবেষণা শুধু দিল্লি বা কলকাতা নয়ভারতের অন্যান্য বড়ো শহরের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মুম্বাইচেন্নাইহায়দ্রাবাদবেঙ্গালুরুপুনে, আমেদাবাদের মতো মহানগরগুলিতেও একই ধরনের সূচকভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা হবেযাতে প্রতিটি শহরের জন্য পৃথক নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়।

গবেষকদের স্পষ্ট মতশুধুমাত্র তাপমাত্রা কমানোর উদ্যোগ বা শুধুমাত্র দূষণ নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। কারণ বাস্তবে এই দুই সংকট একসঙ্গে কাজ করে মানুষের উপর যৌথ চাপ তৈরি করছে। তাই পরিকল্পনা গ্রহণের সময় সম্মিলিত প্রভাবকে গুরুত্ব না দিলে প্রকৃত ঝুঁকি অনেকটাই আড়াল থেকে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ইউএইচপিআই’-কে স্কেলযোগ্য সিদ্ধান্ত-সহায়ক যুগন্তাকারী বৈজ্ঞানিক টুল হিসেবে দেখা হচ্ছেযা নগর পরিকল্পনাবিদপরিবেশবিদ আর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!