- দে । শ
- মে ৫, ২০২৬
টালিগঞ্জে পালাবদলের আঁচ, বহু অভিযোগে উত্তাল স্টুডিয়োপাড়া। ইমপা সভাপতির পদত্যাগের দাবি
দেড় দশকের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর, টালিগঞ্জের ফেডারেশন, প্রোডাকশন হাউস থেকে শুরু করে টেকনেশিয়ান সংগঠনের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে জল্পনা ছিলই। ভোটের ফলপ্রকাশের একদিনের মধ্যে সে অভিঘাতে স্টুডিয়োপাড়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামোও কেঁপে উঠেছে বলে মনে করছেন ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের একাংশ। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই টলিপাড়ার সংগঠন রাজনীতি, বিশেষ করে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইমপা)-কে ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা ক্রমশ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক প্রশ্ন এবং ফেডারেশন-প্রযোজক সংঘাতের বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে।
ফল ঘোষণার পরের দিন থেকেই ইমপা অফিসকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন উত্তেজনার ছবি ধরা পড়ে। অভিযোগ, একদল প্রযোজক সংগঠনের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে গেরুয়া আবির ছড়ান এবং গঙ্গাজল ছিটিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ কর্মসূচি পালন করেন। ইমপা-র বর্তমান নেতৃত্বকে ঘিরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রযোজক-পরিবেশকের তরফে সরাসরি পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয় এবং নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর প্রভাবেই পুরো ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও পিয়া সেনগুপ্ত সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ইমপা একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, এবং সেখানে রাজনৈতিক রং চাপানো সম্পূর্ণ অনুচিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, সংগঠনের এক সদস্যের উপর না কি শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠনের ভিতর অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
ইন্ডাস্ট্রির একাংশ প্রযোজকের অভিযোগ আরও গভীর। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশন এবং প্রযোজক সংগঠনগুলির মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা কার্যত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। শুটিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট টেকনিশিয়ান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, অতিরিক্ত কর্মী চাপিয়ে দেওয়া এবং ফলস্বরূপ বেড়ে যাওয়া প্রযোজনার খরচ— এ সমস্ত বিষয় নিয়ে ক্ষোভ বহুদিনের। অনেক প্রযোজকের অভিযোগ, নিজেদের পছন্দমতো টেকনিশিয়ান নিয়োগের স্বাধীনতা পর্যন্ত সীমিত হয়ে গিয়েছিল, যা কাজের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছিল। দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ বার ইমপা-র সঙ্গে ফেডারেশনের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন একাংশ প্রযোজক। তাঁদের দাবি, ইমপা যেন কোনোভাবেই ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে না থাকে এবং সংগঠনটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। একাধিক দাবিকে কেন্দ্র করে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি বৈঠকের আবেদনও জানানো হয়েছে।
প্রযোজক শতদীপ সাহা এ প্রসঙ্গে সংগঠনের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইমপা-র ভোটপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কমিটির ভূমিকা পর্যন্ত স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এমনকি স্ক্রিনিং কমিটি আদৌ কার্যকর আছে কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, মে মাসের ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হলেও সব ছবি আদৌ মুক্তি পাচ্ছে কি না, সেসব তথ্য সদস্যদের কাছে স্পষ্ট নয়, যা সংগঠনের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিতর্কের মধ্যেই ইমপা-র চেয়ারম্যান ঋতব্রত ভট্টাচার্য ভিন্ন সুরে বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর দাবি, বহুদিন ধরেই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত টেকনিশিয়ান ব্যবহারের প্রবণতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা প্রযোজনার অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। তাঁর মতে, এখন সময় এসেছে নিয়মকানুনকে আরও বাস্তবভিত্তিক করে তোলার এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার।
টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক অরূপ বিশ্বাসকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী। ৬০১৩ ভোটের ব্যবধানে এ জয় টালিগঞ্জের রাজনৈতিক মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। জয়ের পর পাপিয়া অধিকারী জানিয়েছেন, টালিগঞ্জকে তিনি নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান, যেখানে কাজের সুযোগ, শিল্পের স্বাধীনতা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে। তাঁর মন্তব্যে টলিপাড়ার বহুদিনের অসন্তোষ, বিশেষ করে ‘দাদাগিরি’ ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর অভিযোগের প্রতিফলনও দেখা যায়।
একইসঙ্গে টলিউডের ভেতর থেকেও প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। একাধিক শিল্পী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় টলিউডের ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ আশাবাদী, আবার কেউ সতর্ক। কেউ মনে করছেন পরিবর্তন শিল্পের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে পারে, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন নতুন ক্ষমতার ভারসাম্যেও পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। পদ্ম ঘেঁষা বলে পরিচিত, অভিনেতা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্টে ইন্ডাস্ট্রির ‘লবি সংস্কৃতি’ ও পক্ষপাতমূলক কাজের পরিবেশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বহু বছর ধরে ক্ষমতার নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে থাকা শিল্পীদের কাজ পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। অভিনেতা জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন মানেই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষয় নয়। তাঁর বক্তব্য, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলে শুধুমাত্র অবাঙালি প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন, এমন তো নয়, বহু বাঙালি মুখও উঠে এসেছে। তাই তাঁর বিশ্বাস, বাংলার সাংস্কৃতিক ভিত্তি অক্ষুণ্ণ থাকবে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনকে এক ধরনের ‘লক্ষ্মীলাভ’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে এবং বঞ্চনার অভিযোগের জায়গা কমবে। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্রের ঐতিহ্য টিকে থাকবে বলেও আশাবাদী জয়জিৎ। তাঁর কথায়, বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রঙের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
অন্যদিকে, অভিনেতা, প্রযোজক সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক ও প্রশ্নমুখর। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক বিশ্লেষণে না গিয়ে বাঙালি অস্মিতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর বক্তব্যের মধ্যেই ইন্ডাস্ট্রির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসন্তোষের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তাঁর মতে, ন্যায্যতা এখন এক ধরনের মৌলিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা প্রায় স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো সর্বত্র বিরাজ করছে। সুজয়প্রসাদের মতে, টালিগঞ্জে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিল্পীরা যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে সমান সুযোগ পাবেন। তিনি মনে করেন, অন্যায্যতা এতটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যে, সেটিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও তীব্র করে তোলে। অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কাজের অনিশ্চয়তা, পারিশ্রমিক বিলম্ব এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, শিল্পীদের এখনও দীর্ঘ সময় পারিশ্রমিকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, কাজের পরিবেশে স্থায়িত্বের অভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশাবাদী তিনি।
❤ Support Us






