Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৭, ২০২৬

জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভে বুধেও উত্তাল দিল্লি! যন্তরমন্তরে ফের আটক রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী সাংসদরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভে বুধেও উত্তাল দিল্লি! যন্তরমন্তরে ফের আটক রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী সাংসদরা

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলে বুধবারও উত্তাল রাজধানী। মঙ্গলবারের পর এ দিনও দিল্লির রাজপথে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। এদিন ৩০০ জন বিরোধী সাংসদকে নিয়ে যন্তরমন্তরের দিকে রওনা হন রাহুল গান্ধী। কিন্তু আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল পুলিশ। একাধিক রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। বিরোধী সাংসদদের নিয়ে যাওয়া বাসও মাঝপথে থামিয়ে দেয় পুলিশ। তাঁদের ঘিরে তখন জড়ো হয়েছেন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই-এর কর্মী-সমর্থকেরাও। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শুরু হয় ধস্তাধস্তি।এর পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

রাস্তা আটকে দেওয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন বিরোধী সাংসদেরা। ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলে এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন কর্মী-সমর্থকেরা। বিরোধীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ ‘দমনপীড়ন’ চালাচ্ছে। পুলিশের হাতে হেনস্থার অভিযোগ তুলে রাস্তায় শুয়েই প্রতিবাদ জানান প্রিয়ঙ্কা-সহ বিরোধী শিবিরের মহিলা সাংসদেরা। সাংসদদের অভিযোগ, তাঁদের বাধা দেওয়া তো হয়েছেই, এমনকি পুলিশ তাঁদের মারধর এবং লাঠিচার্জও করেছে। শেষ পর্যন্ত রাহুল গান্ধী, ডেরেক ও’ব্রায়েন-সহ জোটের একাধিক সাংসদকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকেও জোর করে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

প্রিয়ঙ্কা বলেন, নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চাওয়া সাংসদদের সঙ্গে এ ভাবে আচরণ করা হচ্ছে। পুলিশ সাংসদদের মারধর করছে এবং তাঁদের মাটিতে ফেলে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমরা এখান থেকে নড়ব না। ওরা চাইলে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যাক। আমি এখান থেকে নড়ব না।’ পরে মহিলা পুলিশকর্মীরা প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে জোর করে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। অন্য দিকে, রাহুল গান্ধীকেও প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে একটি বাসে তুলে দেয় পুলিশ। লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে ঘিরে তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী সাংসদেরা অভিযোগ করেন, তাঁদের নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলে যেতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি তাঁদের সঙ্গে বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিরোধী সাংসদদের নিয়ে যাওয়া বাস থেকেই তিনি বলেন, ‘দিল্লি পুলিশ কী ভাবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আচরণ করছে, তা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে। আমাদের অপরাধটা কী? কেন কর্মী, সাধারণ মানুষকে নির্মম ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে? কেন তাঁদের লাঠিচার্জ করা হচ্ছে? কেন সাংসদদের যন্তর মন্তরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না?’

এদিকে, বিরোধী সাংসদেরা পৌঁছনোর আগেই যন্তর মন্তর চত্বরে ১৬৩ ধারা জারি করেছিল দিল্লি পুলিশ। পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার পরিবর্তিত রূপ এই ১৬৩ ধারা। এর ফলে প্রশাসনের আগাম অনুমতি ছাড়া সেখানে জমায়েত করা যাবে না। দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার সচিন শর্মা জানিয়েছেন, ১৬৩ ধারা জারি থাকায় যন্তর মন্তরে অনুমতি ছাড়া কোনো জমায়েত করা যাবে না। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাংসদদের সাংবিধানিক ও সাংসদ হিসাবে পদমর্যাদার কথা মাথায় রেখে পুলিশ বিধি মেনেই তাঁদের সঙ্গে আচরণ করবে বলেও জানান তিনি। তবে পুলিশের এ যুক্তি মানতে নারাজ বিরোধীরা। তাঁদের বক্তব্য, জনসাধারণের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলেই তাঁরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান করতে চাইছেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের সেখানে পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পুলিশের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোটচুরি’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি কার্যকলাপ’-এর অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দলগুলি। একই দাবিতে সরব হয়েছে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠন এবং নাগরিক মঞ্চও। এ দাবিকে সামনে রেখেই মঙ্গলবার সংসদ চত্বর থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর নির্বাচন সদনের দিকে মিছিল করেছিলেন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সাংসদেরা। কিন্তু কমিশনের দফতরের কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকে দেয়। এর পর সেখানেই অবস্থানে বসে পড়েন বিরোধী সাংসদেরা। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়ঙ্কা গান্ধী। পরে তাঁরা আকাশবাণী ভবনের চত্বরে ঢুকে পড়েন। নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করার দাবিতে সেখানেই ধর্নায় বসেন তাঁরা। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলে অবস্থান। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পরে পুলিশ জোর করে রাহুল এবং প্রিয়ঙ্কাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। তাঁদের আটক করে নিউ পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবশ্য তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার ফের রাস্তায় নেমেছিল বিরোধী জোট। ফলে দু-দিন ধরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলনকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত।

বুধবারের কর্মসূচির আগে অবশ্য মধ্য দিল্লির জনপথের সাগর রত্ন রেস্তরাঁয় বৈঠকে বসেন বিরোধী সাংসদেরা। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের আমন্ত্রণেই এই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। ‘ভোটচুরি’ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে চাইছে বিরোধী শিবির। সূত্রের খবর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে সময় চেয়ে চিঠি দিতে চলেছে ‘ইন্ডিয়া’। সেই চিঠির খসড়া এবং পরবর্তী আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতেই বুধবারের বৈঠক বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যায়। বৈঠকের পরে খাড়্গে জানান, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদ চলছে, তার পরবর্তী রণকৌশল ঠিক করতেই বিরোধী নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলন আরও জোরদার করার কথাও বলেন তিনি। সাগর রত্ন থেকেই বাসে চেপে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা দেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, ডেরেক ও’ব্রায়েন-সহ বিরোধী সাংসদেরা। বাসে ওঠার আগে রাহুল জানান, মঙ্গলবার প্রায় ৩০০ জন সাংসদ নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও তাঁদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাই বুধবার নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে গিয়ে একসঙ্গে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাহুলের দাবি, ‘আমরা দেশকে জানাতে চাই, জ্ঞানেশ কুমার বৈধ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নন। তাঁকে পদত্যাগ করতেই হবে।’

মঙ্গলবারের বিক্ষোভের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়া নিয়েও বুধবার রাহুলকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী দেখিয়েছে। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ৪৫টি এফআইআর রয়েছে। ‘আমার লক্ষ্য ১০০’ বলেন তিনি। এমনকি প্রতিটি এফআইআরকে ‘পদক’-এর সঙ্গে তুলনা করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। রাহুল-প্রিয়ঙ্কার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া আকাশবাণী ভবনে ঢুকে অবস্থান-বিক্ষোভ করার অভিযোগে বুধবার মামলা দায়ের হয়েছে। কিন্তু সেই মামলা বা পুলিশি পদক্ষেপে আন্দোলনের ঝাঁঝ কমবে না বলেই বার্তা দিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের সংগঠন সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালের বক্তব্য, এফআইআর নিয়ে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন না। কংগ্রেস সাংসদ জোথিমণিরও দাবি, লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে ‘অপরাধীর মতো’ টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিন্দনীয়।

বুধবারের কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল থেকেই দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল। যন্তর মন্তর, নির্বাচন কমিশনের দফতর এবং আকাশবাণী ভবন ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স এবং কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীদেরও মোতায়েন করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ব্যারিকেড বসিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তার মধ্যেই বিরোধী সাংসদদের বাস আটকে দেওয়া এবং পরে সাংসদেরা বাস থেকে নেমে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এক দিকে পুলিশ বলছে, ১৬৩ ধারা জারি থাকায় অনুমতি ছাড়া জমায়েত করা যাবে না। অন্য দিকে বিরোধীদের বক্তব্য, তাঁদের সাংসদ হিসাবে অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। মঙ্গলবারের পর বুধবারও তাই একই ছবি—রাস্তা জুড়ে ব্যারিকেড, পুলিশি ঘেরাটোপ, স্লোগান এবং ধস্তাধস্তি। ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন ক্রমেই সংসদ চত্বর ছাড়িয়ে দিল্লির রাজপথে আরও তীব্র হচ্ছে। আর জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাহুলের সুরও ক্রমশ আরও চড়া হচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!