- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ৯, ২০২৬
ভারতে পরমাণু বিপ্লব ! থোরিয়ামের শক্তিতে ৭০০ বছরের জ্বালানি-নিরাপত্তার ইঙ্গিত
বহু দশকের অধ্যবসায়, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার বিরল মেলবন্ধন। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান কিংবা ব্রিটেনের মতো বহু দেশকে উন্নত গবেষণাক্ষেত্র, বিপুল বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত থমকে যেতে হয়েছে সেখানে তামিলনাড়ুর কালপাক্কমে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’-এর ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জনের অর্জনের পাশাপাশি থোরিয়াম-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ কার্যত উন্মুক্ত করে দিল এই সাফল্য—যা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারতের জ্বালানি চাহিদা আগামী ৭০০ বছর পর্যন্ত মেটানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করল ভারত।
৬ এপ্রিল রাত ৮টা ২৫ মিনিট। কালপাক্কমের ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করে। প্রযুক্তিগত পরিভাষার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, রিঅ্যাক্টরের অভ্যন্তরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন’ সফল ভাবে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, পরমাণু শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত এমন এক ধাপে পৌঁছল, যেখানে জ্বালানি ব্যবহার যেমন সম্ভব, তেমনই এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন জ্বালানিও তৈরি করা যায়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমাজমাধ্যমে এ সাফল্যের কথা জানিয়ে একে ভারতের অসামরিক পরমাণু কর্মসূচির ‘নির্ণায়ক পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই সাফল্য শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দিগন্ত নয়, বরং দেশের বিপুল থোরিয়াম ভান্ডারকে কাজে লাগানোর বাস্তব রূপরেখা। ভারতের এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে বহু পুরনো স্বপ্ন—পরমাণু কর্মসূচির স্থপতি ড. হোমি জাহাঙ্গির ভাভার কল্পিত তিন-পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা। ১৯৫০-এর দশকে তিনি বুঝেছিলেন, ইউরেনিয়ামের সীমিত মজুত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরমাণু শক্তির উপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। অথচ ভারতের উপকূলজুড়ে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ থোরিয়াম ভান্ডার। সে বাস্তবতা থেকেই তিনি এমন এক পরিকল্পনা তৈরি করেন, যেখানে প্রথমে ইউরেনিয়াম, পরে প্লুটোনিয়াম এবং শেষ পর্যন্ত থোরিয়াম— এই তিন ধাপে গড়ে উঠবে দেশের পরমাণু শক্তির ভিত্তি।
প্রথম পর্যায়ে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি তৈরি হয় প্লুটোনিয়াম। দ্বিতীয় পর্যায়ে, সেই প্লুটোনিয়ামকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর আরও বেশি পরিমাণে জ্বালানি তৈরি করতে পারে। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব এখানেই—যতটা জ্বালানি ব্যবহার হয়, তার চেয়েও বেশি উৎপন্ন হয়। অনেকটা যেন ১০ লিটার পেট্রল দিয়ে ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর দেখা গেল, ট্যাঙ্কে জ্বালানি কমেনি, বরং বেড়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তৃতীয় পর্যায়ের ভিত্তি তৈরি হয়, যেখানে থোরিয়াম থেকে তৈরি হয় ইউরেনিয়াম-২৩৩—যা ভবিষ্যতের পরমাণু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। কালপাক্কমের এই রিঅ্যাক্টর সেই দ্বিতীয় পর্যায়ের বাস্তব প্রয়োগ, যা কার্যত তৃতীয় পর্যায়ের দিকে ভারতের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করছে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন প্রধান অনিল কাকোদরের জানিয়েছেন, ‘দেশের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নির্দিষ্ট পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে এখন আমরা ৮০ থেকে ১০০ গুণ বেশি শক্তি আহরণ করতে পারছি।’ যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে এখনও প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। এই সাফল্যের তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দেয় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬০-এর দশক থেকেই ফাস্ট ব্রিডার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করলেও প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নিরাপত্তা সংশয় এবং ব্যয়বৃদ্ধির কারণে সেই প্রচেষ্টা থেমে যায়। ফ্রান্সের ‘সুপারফেনিক্স রিঅ্যাক্টর’, জাপানের ‘মনজু’ প্রকল্প; সব ক্ষেত্রেই একই পরিণতি। ইউরোপের ব্রিটেন, জার্মানি ও ইতালিও এই প্রযুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় মূলত উচ্চ ব্যয়ের কারণে। একমাত্র রাশিয়াই এখনো বাণিজ্যিক স্তরে এ প্রযুক্তি কার্যকর রাখতে পেরেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাফল্য নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তুলনামূলকভাবে কম খরচে—প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগে—দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে কালপাক্কমের এই রিঅ্যাক্টর। এর নকশা প্রণয়ন করেছে ‘ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চ’ এবং নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় নাভিকিয়া বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি প্রেসারাইজ়ড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যেগুলিতে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে মোট ৭.৪৮ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এই রিঅ্যাক্টরগুলির উপজাত হিসেবে উৎপন্ন প্লুটোনিয়ামই ভবিষ্যতে ফাস্ট ব্রিডার প্রযুক্তির মূল জ্বালানি হয়ে উঠবে।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান মন্ত্রক সূত্রে খবর, কালপাক্কমে ইতিমধ্যেই ‘ফুয়েল সাইকেল ফেসিলিটি’ নির্মাণের কাজ চলছে। ২০২৭ সালের মধ্যে জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে ইউরেনিয়াম রিঅ্যাক্টর থেকে প্লুটোনিয়াম নিষ্কাশন এবং পরবর্তী ধাপে থোরিয়াম-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ আরও সুগম হবে। সব মিলিয়ে, কালপাক্কমের এই সাফল্য কেবল প্রযুক্তিগত নয়—এটি ভারতের জ্বালানি কৌশলের এক মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিশ্লেষকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়া সফল হলে আগামী কয়েক শতাব্দী, প্রায় ৭০০ বছর পর্যন্ত দেশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাইরের জ্বালানির উপর নির্ভর করতে হবে না।
❤ Support Us





