Advertisement
  • টে | ক | স | ই
  • আগস্ট ২১, ২০২৬

ডাকপিয়নের ডানা! দুর্গম অঞ্চলে চিঠিপত্র পৌঁচে দিতে অভিনব উদ্যোগ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ডাকপিয়নের ডানা! দুর্গম অঞ্চলে চিঠিপত্র পৌঁচে দিতে অভিনব উদ্যোগ

 

‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার !’

এক হাতে চিঠির ব্যাগ, অন্য হাতে পথের ক্লান্তি। দশকের পর দশক ধরে দুর্গম অঞ্চলে রাত পেরিয়ে, নদী-নালা, মাঠ-ঘাট, পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে যে মানুষটি ডাক পৌঁছে দেন, তিনি কেবলই একজন ডাকবাহক নন, তিনি অপেক্ষার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক প্রতীক। তাঁর দৌড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের খবর পাওয়ার আকুলতা, দূরত্ব পেরোনোর দায় আর সময়ের বিরুদ্ধে অসম এক ছুটে চলা। আজ ‘রানার’-এর সে পথেই জুড়ে গেছে প্রযুক্তি।

হিমাচল প্রদেশ ও অসমে ড্রোনের মাধ্যমে ডাক পৌঁছে দেওয়ার পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করেছে ইন্ডিয়া পোস্ট। পরিকল্পনা সফল হলে দুই রাজ্য মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি নির্দিষ্ট ড্রোন রুট চালু হতে পারে। হিমাচলে ১১০টি এবং অসমে ৪০টি রুটের পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়, দুর্গম রাস্তা, নদী কিংবা প্রধান সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদের কাছে দ্রুত ডাক পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। ঘটনাটি প্রযুক্তিগত ভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এর প্রতীকী তাৎপর্যও।

পাহাড়ি পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে যে ডাকের ব্যাগ পৌঁছতে সময় লাগে, এ বার সে পথ অনায়াসে পেরোবে ড্রোন। যেখানে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে কিংবা গাড়িতে পৌঁছনো কঠিন, সেখানে আকাশপথে ডাক পৌঁছে দেওয়ার পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করল ইন্ডিয়া পোস্ট। হিমাচল প্রদেশের পর এ বার অসমেও চালু হয়েছে পরিষেবার পরীক্ষামূলক ব্যবহার। মান্ডি থেকে রেহারধার— প্রায় ১২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ। সড়কপথে যেখানে সময় লাগে দুই ঘণ্টারও বেশি, ড্রোনে সেই ডাক পৌঁছচ্ছে প্রায় সাত মিনিটে। এক সময় যে পথ পেরোতে মানুষের পায়ের উপর নির্ভর করতে হতো, এখন সে পথকে কয়েক মিনিটে আকাশপথে অতিক্রম করা সম্ভব। ডাক পরিবহণের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

কেন এই উদ্যোগ? ডাক বিভাগের এক কর্তার কথায়, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সরল। এত দিন দুর্গম পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকের ব্যাগ পৌঁছতে ভ্যান, ট্রাক বা অন্য সড়ক পরিবহণের উপর নির্ভর করতে হত। প্রধান সড়ক থেকে দূরে থাকা শাখা ডাকঘরগুলির ক্ষেত্রে সে যাত্রা আরও সময়সাপেক্ষ। নির্দিষ্ট রুটে সরাসরি ড্রোন পাঠানো গেলে যাতায়াতের সময় যেমন কমবে, তেমনই ডাকের ব্যাগ পৌঁছনোর সময়ও আরও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।স্বাধীনতা দিবসের আবহে হিমাচলে পরীক্ষামূলক এ যাত্রার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচিকেও। ড্রোনে করে পাঠানো হয় ‘তিরঙ্গা’ পার্সেল। রেহারধার শাখা ডাকঘরে ডাক বিভাগের কর্মীরা তা গ্রহণ করার পর এক প্রাক্তন সেনাকর্মীর হাতে তুলে দেন। ফলে প্রযুক্তির নতুন ব্যবহারের সঙ্গে দেশের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীকও জুড়ে যায়।

ডাক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবহৃত ড্রোনগুলি সর্বোচ্চ ১০ কিলোগ্রাম ওজনের ডাকের ব্যাগ বহন করতে পারবে। পাঁচ কিলোমিটার থেকে ৮০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বের নির্দিষ্ট রুটেও চলতে সক্ষম এই উড়ানযান।পাশাপাশি ড্রোনের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে নজরদারি করা যাবে। ফলে শুধু দ্রুত ডাক পৌঁছনোই নয়, ডাকের ব্যাগ কোন অবস্থায়, কোন পথে, কোথায় রয়েছে, সে সম্পর্কেও নজর রাখা সম্ভব হবে।  অসমেও শুরু হয়েছে একই ধরনের পরীক্ষামূলক পরিষেবা। গুয়াহাটি ডাক বিভাগের অধীন হাজো সাব-পোস্ট অফিস থেকে ড্রোনের মাধ্যমে খেত্রী হারদিয়া ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসে চিঠি ও পার্সেল পাঠানো হয়েছে। হাজো থেকে প্রায় আট কিলোমিটার এবং দামপুর ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে ওই শাখা ডাকঘর। শুধু হাজোকে কেন্দ্র করেই প্রায় ৮২ কিলোমিটার জুড়ে ৯ টি ড্রোন রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। ধাপে ধাপে অসমে মোট ৪০টি রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে ডাক বিভাগের সূত্রের খবর।

মনে রাখা দরকার, প্রত্যন্ত ভারতের একটি শাখা ডাকঘর শুধু চিঠি বা পার্সেল আদান-প্রদানের কাজই করে না। ডিজিটাল যুগে চিঠির গুরুত্ব কমেছে ঠিকই, কিন্তু যোগাযোগের প্রয়োজন কমেনি। বরং সরকারি পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং, বিমা, পরিচয়পত্র, পেনশন, অনলাইন পরিষেবার নথিপত্র— সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য ডাকব্যবস্থা এখনও অপরিহার্য। দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন ডিজিটাল পরিকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভৌত নথি ও পরিষেবাও শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছয়। ফলে কোনো পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকের ব্যাগ পৌঁছতে এক দিন দেরি হওয়া মানে সরকারি পরিষেবা, একটি আর্থিক লেনদেন কিংবা প্রয়োজনীয় নথির কাজও পিছিয়ে যাওয়া। ঝাঁ চকচকে শহরের ক্ষেত্রে দ্রুত ডেলিভারি নতুন কোনো বিস্ময় নয়। কিন্তু যে গ্রামে পৌঁছতে বর্ষায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, যে পাহাড়ি জনপদে কয়েক কিলোমিটারের পথ অতিক্রম করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে, কিংবা যে শাখা ডাকঘরটি মূল সড়ক থেকে বহু দূরে— সেখানে প্রযুক্তির এই ব্যবহার সত্যিই জনপরিষেবার চরিত্র বদলাতে পারে।

তবে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি কয়েকটি প্রশ্নও জরুরি। ড্রোন উড়লেই ডাক পরিষেবা আধুনিক হয়ে যাবে— এমন সরল সমীকরণ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। ড্রোনের ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি, প্রশিক্ষিত কর্মী, সফ্‌টওয়্যার, বিমা, নিরাপত্তা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় পরিষেবা সচল রাখার খরচ রয়েছে। হিমাচলের পাহাড়ি বাতাস বা অসমের বর্ষার আবহাওয়া প্রযুক্তির সামনে যথেষ্ট পরীক্ষা তৈরি করতে পারে। ফলে একটি ড্রোন সাত মিনিটে পৌঁছতে পারে কি না, তার পাশাপাশি প্রশ্ন— কত খরচে, কতটা নিরাপদে এবং বছরের কত দিন সে কাজ করতে পারবে? আরও বড়ো প্রশ্ন, প্রযুক্তি কি মানুষের বিকল্প হবে, না মানুষের সহায়ক?

ভারতীয় ডাকবিভাগের মতে, এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ডাকপিয়নকে সরিয়ে দেওয়ায় নয়। বরং তাঁদের কাজকে আরও কার্যকর করে তুলতেই ড্রোনের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত। ড্রোন ডাকের ব্যাগ নিয়ে শাখা ডাকঘরে পৌঁছতে পারে, কিন্তু মানুষের দরজায় কড়া নাড়তে পারে না। কোনো বৃদ্ধ পেনশনভোগীর সঙ্গে কথা বলা, কারও হাতে গুরুত্বপূর্ণ নথি তুলে দেওয়া, কারও খোঁজ নেওয়া— এসব কাজ এখনো মানুষেরই। প্রযুক্তি পথ পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘতা ছোটো করতে পারে; মানুষের প্রয়োজনকে ছোটো করতে পারে না। তবে, বিশ্লেষকদের মতে,  এ পরীক্ষার মূল্যায়নও হতে হবে স্বচ্ছ ভাবে। কত সময় বাঁচল, কত খরচ হল, কতগুলি উড়ান সফল হল, আবহাওয়ার কারণে কত বার পরিষেবা ব্যাহত হল, কোনো ডাকের ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত বা হারাল কি না— সব কিছুর হিসাব প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। সফলতা কেবল সাত মিনিটে ডাক পৌঁছনোয় মাপা যাবে না। দেখতে হবে, সেই সাত মিনিটের পরিষেবা প্রত্যন্ত মানুষের জীবনে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনল।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!