- টে | ক | স | ই
- জুলাই ২৫, ২০২৬
ইন্টারনেট বন্ধেও নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা ! ‘নিট’ আন্দোলনের মাঝেই ব্লুটুথ-ভিত্তিক যোগাযোগ অ্যাপ নিষিদ্ধ করল কেন্দ্র
বিশেষ পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকলেও যাতে যোগাযোগ অটুট রাখা যায়, সে সুবিধা দেয় ব্লুটুথ ভিত্তিক যোগাযোগ অ্যাপ ‘বিটচ্যাট’। দিল্লির যন্ত্রর মন্তরের বিক্ষোভের জেরে এ মুহূর্তে সেখানে স্তব্ধ ইন্টারনেট ব্যবস্থা। ফলে বিক্ষোভাকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখার উপায় এ ধরনের অফলাইন মাধ্যম। এবার সে প্রযুক্তিকেই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করল কেন্দ্র। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার’ –এর সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার মাইক্রোসফ্টের মালিকানাধীন সফ্টওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘গিটহাব’-কে ওই অ্যাপটি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের আশঙ্কা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে দেশবিরোধী শক্তি, জঙ্গি সংগঠন, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এবং সাইবার অপরাধীরা এ প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে পারে।
জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, এ ধরনের মতো বিকেন্দ্রীভূত যোগাযোগ ব্যবস্থা আইনসম্মত নজরদারি, ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে। কারণ, এ অ্যাপের ক্ষেত্রে কোনও কেন্দ্রীয় ‘সার্ভার’ বা পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা নেই, যার কাছে ব্যবহারকারীদের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে প্রয়োজনে গ্রাহকের পরিচয় বা যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘বিটচ্যাট’ এমনই একটি ব্লুটুথ–ভিত্তিক ‘পিয়ার-টু-পিয়ার মেসেজিং অ্যাপ’, যা মোবাইল নেটওয়ার্ক, মোবাইল ডেটা, ওয়াই-ফাই বা কেন্দ্রীয় সার্ভারের উপর নির্ভর না করেই বার্তা আদানপ্রদানের সুযোগ দেয়। অর্থাৎ প্রচলিত ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ অচল থাকলেও এ অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার জানিয়েছে, ‘বিটচ্যাট’-ই একমাত্র নয়, এ ধরনের আরও কয়েকটি বিকেন্দ্রীভূত মেসেজিং অ্যাপ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে উপলব্ধ। কিন্তু ‘বিটচ্যাট’-এর কাঠামো এমন ভাবে তৈরি, যাতে প্রচলিত টেলিকম পরিকাঠামোর বাইরে থেকেও একটি স্বাধীন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। আর সেখানেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলির উদ্বেগ। সরকারি সূত্রের দাবি, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা নাশকতার পরিকল্পনা যদি এ ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চালানো হয়, তা শনাক্ত করা বা পরবর্তী তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র-যুবদের চলমান আন্দোলন ঘিরে প্রশাসন ইতিমধ্যেই একাধিক কড়া পদক্ষেপ করেছে। আন্দোলনস্থলের আশপাশের মেট্রো স্টেশন বন্ধ, মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও স্থগিত। টেলিকম সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ডেটা পরিষেবা বন্ধ রাখতে। তবে, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকলেও আন্দোলনকারী কিছু ‘জেন-জি’ ব্লুটুথ-ভিত্তিক অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। এই অ্যাপগুলির সাহায্যে আশপাশে থাকা ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্থানীয়ভাবে একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। ফলে ৪জি, ৫জি বা ওয়াই-ফাই ছাড়াই বার্তা আদানপ্রদান সম্ভব হয়।যদিও এ প্রযুক্তি ইন্টারনেটের বিকল্প নয়, তবুও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্তরে যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তা কার্যকর বলেই মনে করা হয়।
শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও রাজনৈতিক আন্দোলন বা ইন্টারনেট বিধিনিষেধের সময়ে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে। হংকংয়ের ‘গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন’ এবং নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ভারতের ‘টেলিকমিউনিকেশন আইন, ২০২৩’-এর ধারা ২০(২)(বি) অনুযায়ী, জননিরাপত্তা বা জনস্বার্থে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার সাময়িকভাবে টেলিযোগাযোগ পরিষেবা স্থগিত করতে পারে। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড-সহ অন্যান্য টেলিকম পরিষেবাও রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা বা অপরাধে প্ররোচনা রোধের স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিটি স্থগিতাদেশে তার কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই সে নির্দেশ কার্যকর থাকবে।
উল্লেখ্য, ‘বিটচ্যাট’ মূলত একটি ‘ওপেন-সোর্স’ বা বিকেন্দ্রীভূত অফলাইন ‘পিয়ার-টু-পিয়ার’ মেসেজিং অ্যাপ। টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসির সমর্থিত এই অ্যাপটি ‘ব্লুটুথ লো অন্যার্জি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ছাড়াই কাজ করে। পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া গেলেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এ অ্যাপ ব্যবহার করতে মোবাইল ডেটা, ওয়াই-ফাই, কেন্দ্রীয় সার্ভার বা এমনকি কোনো ফোন নম্বরেরও প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিটি স্মার্টফোন একই সঙ্গে ব্যবহারকারী এবং ‘রিলে’ হিসেবে কাজ করে। কোনো ব্যবহারকারী ‘বিটচ্যাট’-এর মাধ্যমে বার্তা পাঠালে সেটি মোবাইল টাওয়ার বা ইন্টারনেট সার্ভারের মাধ্যমে যায় না। প্রথমে বার্তাটি এনক্রিপ্ট করা হয়। তারপর ব্লুটুথের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা একই অ্যাপ ব্যবহারকারী অন্য ফোনগুলিতে পাঠানো হয়। এরপর সেই ফোনগুলি আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্তাটি আরও কাছাকাছি থাকা অন্য ডিভাইসে পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই এক ফোন থেকে অন্য ফোনে বার্তা পৌঁছতে পৌঁছতে তৈরি হয় একটি ‘মেশ নেটওয়ার্ক’। ফলে, একটি এলাকায় যত বেশি মানুষ একই অ্যাপ ব্যবহার করবেন, নেটওয়ার্কের পরিসর ততই বাড়বে। ফলে বার্তাও তুলনামূলক বেশি দূরত্ব পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে। যেহেতু পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাই সরাসরি ডিভাইস থেকে ডিভাইসে চলে, তাই মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট পরিষেবা না থাকলেও এ প্রযুক্তি সচল থাকে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রযুক্তি এখনো প্রচলিত মেসেজিং পরিষেবার পূর্ণ বিকল্প নয়। ব্লুটুথের সীমিত পরিসরের কারণে এটি স্বল্প দূরত্বের মধ্যেই কার্যকর। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যবহারকারীর একই অ্যাপ ইনস্টল থাকা জরুরি। গতি, স্থায়িত্ব আর বিস্তৃত যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি কোনোভাবেই ইন্টারনেটের সমকক্ষ নয়। ফলে স্থানীয় স্তরে জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও, বৃহত্তর যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা আছে।
❤ Support Us








