- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ২৯, ২০২৩
যে মহাগ্রন্থ মুক্তচিন্তার আকর
ভারতীয় সংবিধান সূচনার স্বাক্ষর অনুষ্ঠান
সংবিধান গ্রন্থটি আমাদের দেশের ক’জন পাঠ করেন, ক’জন দেখেছেন, বিশেষ করে দেশের নেতাস্থানীয়রা, আমরা জানি না, কিন্তু এ মহাগ্রন্থের ভূমিকাটি আমার মনে হয় দেশের নেতা, মন্ত্রী আর বিদ্বজ্জনের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। এ পর্বটি যেন এক অনবদ্য কবিতা যার প্রতিটি শব্দই একটি বিশেষ বার্তা বহন করে । ইংরেজিতে লেখা পঙক্তিগুলো আমাদের কানে যেন গানের মতো বেজে উঠে— উই দ্যা পিপল অব ইন্ডিয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি।
— আমরা ভারতবাসীরা এতদ্বারা কী ঘোষণা করছি ?
না, ‘ভারতকে একটি সার্বভৌম সাম্যবাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে এ দেশের নাগরিকদের জন্য ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য এবং সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতিশ্রুতি রাখছি।
এই হল গ্রন্থটির স্বস্তিবচন। ভেতরের আইনি কূট ক্যাচাল, ৪৭০ টি আর্টিকেল, দ্বাদশ সিড্যুল, ক্রমবর্ধমান সংশোধনী আর সে সঙ্গে আরও একটি বিশেষ অধ্যায়, ‘ডাইরেকটিভ প্রিন্সিপলস অব স্টেট পলিসি’ –এ নিয়ে সংবিধান গ্রন্থটি পৃথিবীর অন্যতম সংবিধান হিসেবেও স্বীকৃত। বলা আছে ডাইরেকটিভ প্রিন্সিপলসের নির্দেশাবলি নিয়ে আবার কোর্ট কাছারি করা যাবে না, কিন্তু কোনও আইন প্রণয়ন করতে হলে তাকে এড়িয়ে না চলার পরামর্শও রয়েছে। এ নিয়ে ভাবনার প্রচুর খোরাক রয়েছে যদি কেউ এভাবে দেখেন। গ্রন্থটি নীরস কিছু আইনি মারপ্যাঁচের সমাহার নয়। পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিকে সচল রাখে এর এক একটা পঙক্তি।
১০৫ টি সংশোধনী নিয়ে বলতে হয়, আমাদের সংবিধান একটি চলমান মুক্ত গ্রন্থ। রচয়িতারা কোত্থাও এরকম দাবি করেননি যে, আমরা যা লিখেছি ঢের লিখেছি, এরপর আর কারো কিছু সংযোজন করার নেই। একেবারে গোঁড়ামিমুক্ত এ সংবিধানটি একই সঙ্গে দৃঢ়, আর নমনীয়ও, ইংরেজিতে যাকে বলা হয়েছে ‘পার্টলি রিজিড অ্যান্ড পার্টলি ফ্ল্যাক্সিবল’।
কিছু কিছু বিষয় অর্থাৎ প্রাদেশিক সীমানা পুনর্নিধারণ, প্রদেশের নামকরণ (এই যেমন ইচ্ছে করলে আসামের, বা যে অন্য কোন প্রদেশেই বিবদমান জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কয়েকখানা প্রদেশ গড়ে তোলা, কিংবা তিনখানা প্রান্তিক জেলা নিয়ে সম্বলিত গোটা একটি উপত্যকাকেই স্বতন্ত্র রাজ্য করে দেওয়া) ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সংখ্যাগুরুর মতামতের উপরই নির্ভর করেই সংবিধান সংশোধনী সম্ভব (Articles 4, 169, 240) ।
আমরা তো দেখছিই এ ধারার সাহায্যে দেশের শহর, বন্দর, স্টেশনের পুরনো নাম পালটে নতুন নামকরণ আজকাল অতি সহজেই হয়ে গেছে। এ প্রবণতা ভালো কি মন্দ সে বিচারে আপাতত না’ই বা গেলাম।
দু•ই
ফিরে আসি ভূমিকা পর্বে, ইংরেজিতে লেখা পঙক্তিগুলো ছাত্রজীবনে অবশ্যকৃত্য হিসেবে আমরা অনেকেই পাঠ করেছি। অনেকেরই মর্মমূলে পঙক্তিগুলো গেঁথেও রয়েছে।বাক্যগুলো নিশ্চয়ই অনেকের প্রাণে আজও গভীর আলোড়ন তোলে। এখানেই যে স্বাধীন দেশের মর্মবাণী নিহিত।
স্বাধীনতার ‘প্রথম দিনের উষা যেদিন নেমে এল’ সেদিন দেশবাসীর সমবেত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে এ সংবিধানের অঙ্গীকারে।
স্মরণ করা যাক্ সেই মধ্যরজনীতে উচ্চারিত কিছু বাক্য। সেই মধ্যরাতে পৃথিবী ছিল ঘুমে অচেতন, ভারতবাসী জেগে রয়েছিল কথাগুলো শোনার জন্য। বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। বলা চলে ভারতবাসী সমবেত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছিল এ উচ্চারণে, ‘At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom .’
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে এল স্বাধীনতা। কিন্তু এর মধ্যে ছিল একটা দুঃখের অধ্যায়—ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব, পরিণামে দেশভাগ। কিন্তু এই দুঃসময়েও দেশবাসীর যে বুদ্ধিবিভ্রাট ঘটেনি এর প্রতিফলন দেখা গেল দুই বৎসর পর গৃহীত জাতীয় সংবিধানে। এর চরিত্র লক্ষণ কী হবে, কী হওয়া উচিত— এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী চিন্তাস্রোত প্রবাহিত ছিল দেশে। চোখের সামনে উদাহরণ তো মোটেই আশাব্যঞ্জক ছিল না। সীমান্তের ওপারে প্রতিষ্ঠা পেল অখণ্ড ভারতের কেটে নেওয়া অংশ নিয়ে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র, মানে থিয়োক্রেটিক স্টেট। তাসত্বেও, এপারে নিরপেক্ষতার আদর্শে দেশবাসী আস্থাহারা হয়নি, যদিও ওপারের অনুকরণে এরকম পথে চলার কথাও কেউ কেউ ভেবেছিলেন। উগ্র-জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদী এবং বিভেদের নিরন্তর অনুশীলনেও এ উপমহাদেশে উদার মানসিকতার মৃত্যু ঘটেনি। নইলে এপারে এর প্রভাব পড়তই। হিংসার বদলে হিংসার শ্লোগান ভারতবাসীকে বিচলিত করেছে, কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে সারা বিশ্বের কাছে ভারতবর্ষ গৌরব জনক স্থানেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। “মঙ্গল প্রভাতে /মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে/ উদার আলোক-মাঝে উন্মুক্ত বাসাসে’—
এ প্রার্থনাই করেছিল সদ্য স্বাধীন দেশটি, আর তার এমনই উত্তরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ —
Where the mind is without fear and
the head is held high;
where knowledge is free;
where the world has not been broken
up into fragments by narrow domestic walls;…
… Into that heaven of freedom, my Father,
Let my country awake.
তৎসত্বেও দুইটি দেশের মধ্যে সংকীর্ণ অভ্যন্তরীন প্রাচীর গড়ে উঠল। প্রচুর হত্যা রক্তপাতও ঘটল, কিন্তু এপারে মানুষ তবুও অমানবিক হয়ে উঠেনি। ওপারেও কি সবাই তাই হয়ে উঠেছিল? ওদের কান্নাও তো সীমান্তের আকাশ পেরিয়ে এদিকে পৌঁছেছিল, যেমন এপারের হাহাকার ওদিকেও নীরব অশ্রুপাত ঘটিয়েছিল।
এ প্রসঙ্গের অবতারণা এ জন্য যে, স্বাধীন সার্বভৌম ভারতীয় রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতার সামনে সেদিন ছিল এক বিরাট প্রত্যাহ্বান। এদের কলমের প্রতিটি অক্ষরের উপর সমগ্র ভারতী উপমহাদেশের শান্তি নির্ভর করেছিল। ওঁরা এ পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেছেন। ভিমরাও আম্বেদকর এবং সহচিন্তকেরা মিলে এ নিরপেক্ষ দলিল উপহার দিয়ে দুনিয়ার সামনে বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
তি•ন
ভারতের সংবিধানের প্রথম খসড়ায় অবশ্য ‘সাম্যবাদী ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা অনুল্লিখিত ছিল। এ শব্দদুটি পরবর্তী সংযোজন। ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২ তম সংশোধণী মতেই এ শব্দদুটোর সংস্থান। পঞ্চাশে যা ছিল অনুক্ত, পরবর্তী দিনে তা সুস্পষ্ট ভাবে উচ্চারিত হওয়ার প্রয়োজন বুঝি সময়েরই দাবি ছিল। সীমান্তের ওপারে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সীমান্তের এপারে ক্রমবর্দ্ধিষ্ণু সাম্প্রদায়িকতা থেকে উদ্ভুত নতুন সংকটের পদধ্বনি তখনই শোনা যাচ্ছিল। সংখ্যাগুরু-সাম্প্রদায়িকতা অর্থাৎ মেজরিটারিয়ানিজম মাথা তুলে খাড়া হবার প্রাক্মুহূর্তে এ ছিল সময়োচিত পদক্ষেপ।
ইতিমধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশও ঘটে গেছে। কিন্তু একটি দশক অতিক্রম হতে না হতে ওপারেও মৌলবাদী শক্তির আস্ফালন শোনা গেল, সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থীর স্রোত অব্যাহত রইল, এ নিয়ে ভারত সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারতেন কিন্তু তা হল না। তবে ওপারের ওই অধ্যায় শেষ হয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিন্ত করার পদক্ষেপ নতুন আশার সঞ্চার করল। তবে এ নিয়ে আলোচনার পরিসর অবশ্য এখানে নেই। যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তা হল ধীর পদক্ষেপে ভারতের বুকে উগ্র-জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান, হিংসার অনুশীলন এবং হিংসার দর্শন যেন ক্রমে বিস্তার লাভ করতে শুরু হল।৪২ তম সংশোধনীর গুরুত্ব এ জন্যই প্রাসঙ্গিক। সেদিন যা ছিল অঙ্কুর তা’ই ক্রমে দেশের কিছু অংশে মাথা চাড়া দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্বাধীনতার অব্যাবহিত পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এ প্রবণতা উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি হিংসার অনুশীলন, তথা পাকিস্তানের বিপরীতে এপারে আপামর জনগণের উপর হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠা- প্রয়াসের আঁচ পেয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন ‘No government can tolerate this. There are almost as many Muslims in this country as in the part that has been partitioned away. We are not going to drive them away.’
১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধী ইংল্যান্ডের পথে জাহাজে রয়টারের সঙ্গে ইন্টারভিউয়ে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন ভারতের একটা চিত্র তুলে ধরেছিলেন। ওই স্বপ্নের স্বাধীন দেশে উঁচুনিচু ভেদ থাকবে না, সব সম্প্রদায় শান্তি ও সম্প্রীতিতে বাস করবে, দেশে অস্পৃশ্যতার অভিশাপ থাকবে না, স্ত্রীপুরুষের সমান অধিকার থাকবে ইত্যাদি।এর ১৬ বছর পর গান্ধিজি অমোঘ বাক্যটি বলেছিলেন। রাষ্ট্র হবে সম্পূর্ণ সেক্যুলার। আইনের চোখে সবাই সমান হবে। সকলেরই যে-কোন ধর্ম অনুসরণের অবাধ স্বাধীনতা থাকবে, যতক্ষণ না তা দেশের আইন ভঙ্গ করে।
মন থেকে সমস্ত বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে হিন্দু-মুসলিম-শিখ এবং যাঁরা ‘ইয়ে আজাদি ঝুট হ্যায়’ শ্লোগান তুলেছিল, এদের সবাইকে জাতীয় সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে মুক্তকণ্ঠে আহ্বানও জানান:
Change your plans, give up secrecy, eschew communal conflict, respect the Constitution of India, and show your loyalty to the Flag…
(১৯৪৯ সালে মাদ্রাজে প্যাটেল প্রদত্ত ভাষণ)
জাতীয় জীবনে তাঁর দৃপ্ত অবস্থানের স্মারক হিসেবে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখ গুজরাটে (নর্মদা উপত্যকা, ক্যাভাদিয়া) স্থাপিত এ মহান নেতা, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৮২ মিটার উঁচু মূর্তি, এ জন্যই আজ দেশের সম্প্রীতি এবং নিরপেক্ষতার অন্যতম প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশের নেতৃত্বের সামনে উগ্র-জাতীয়তাবাদ ছিল এক বড় প্রত্যাহ্বান, যার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল পণ্ডিত নেহেরু, সর্দার প্যাটেল, আবুল কালাম আজাদ সহ তৎকালীন মহান নেতাদের। সাতচল্লিশের দেশবিভাগ দ্বিজাতি-তত্ত্বের টানাপোড়েনের সমাপ্তি তো ঘটাতে পারেনি, সেটা সম্ভবও ছিল না বরং তা এক নতুন মাত্র লাভ করেছিল। তবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণীয় করা এবং সে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশকে আধুনিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসও সেদিন জারি ছিল। আর এতে তাঁদের প্রধান আয়ুধ ছিল জাতীয় সংবিধান। স্বাধীন দেশে এ সংবিধান নিয়ে শুরু থেকে যে ভাবাবেগ ছিল, এর বিরোধী ভাবের প্রকাশও তৎকালীন নেতৃত্বকে চিন্তিত করেছিল। জিন্না এবং তাঁদের অনুগামীদের অনুকরণে ভারতবর্ষে মধ্যযুগীয় ধর্মীয়রাষ্ট্রের চিন্তা প্রশ্রয় লাভ করেনি। ভারতের হাজার বছরের সমন্বয়ী চিন্তা এবং উদারনৈতিক ঐতিহ্যেরই জয় হয়েছে। সংবিধান রচনার দায়িত্ব যাঁদের উপর পড়েছে, সেই সব কৃতবিদ ব্যক্তিরা প্রতিটি বাক্য খুব সুচিন্তিত ভাবেই লিখেছেন কোনও ধরনের উগ্রতার কাছে নতি স্বীকার না করে।
একটু যদি পেছনে যাই, দেখব স্বাধীন দেশের নীতি নির্ধারণ নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধী ইংল্যান্ডের পথে জাহাজে রয়টারের সঙ্গে ইন্টারভিউয়ে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন ভারতের একটা চিত্র তুলে ধরেছিলেন। ওই স্বপ্নের স্বাধীন দেশে উঁচুনিচু ভেদ থাকবে না, সব সম্প্রদায় শান্তি ও সম্প্রীতিতে বাস করবে, দেশে অস্পৃশ্যতার অভিশাপ থাকবে না, স্ত্রীপুরুষের সমান অধিকার থাকবে ইত্যাদি।এর ১৬ বছর পর গান্ধিজি অমোঘ বাক্যটি বলেছিলেন। রাষ্ট্র হবে সম্পূর্ণ সেক্যুলার। আইনের চোখে সবাই সমান হবে। সকলেরই যে-কোন ধর্ম অনুসরণের অবাধ স্বাধীনতা থাকবে, যতক্ষণ না তা দেশের আইন ভঙ্গ করে।
আজকের দিনে এ চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। ধর্মীয় স্বাধীনতা যদি সংঘাতের কারণ হয়, ধর্মীয় ভাবাবেগকে যদি নির্বাচনী ইস্যু করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় তবে তা আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধেই যাবে। এখানেই সেক্যুলারিজমের প্রয়োজন।

সংবিধানের প্রথম মুদ্রণের কপি দেখছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ
এ সঙ্গে এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন, অনেকে যে ভাবে বিষয়টি দেখানোর প্রয়াস পান, ভারতীয় সেক্যুলারিজমকে সে অর্থে ধর্মহীনতা বলা যাবে না। কারণ মৌলিক অধিকারের তালিকায় ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। ( আর্টিকেল ২৫ থেকে ২৮ –এ দ্রষ্টব্য)। এরই মধ্যে ভারতীয় রাজনীতির নিরপেক্ষতার শর্ত পরিস্ফুট– প্রত্যেক ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাবোধের (equal respect given to all religions) স্বীকৃতি রয়েছে। ধর্মাচার এবং ধর্ম প্রচারে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনও অর্থাৎ সরকারি ধর্মও নেই, এটাও লক্ষ্যণীয়।
এই বিষয় নিয়ে আরও বিস্তর চিন্তাচর্চার প্রয়োজন। আফগানিস্তান-পাকিস্তান কথা ছেড়ে দিলেও বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা সহ ভারতবর্ষেও ধর্মীয় উগ্রতা ক্রমাগতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, এবং মুক্তচিন্তা, উদার মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা ক্রমশই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ভারত, বাংলাদেশে একের পর এক চিন্তাশীল ব্যক্তিদের উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ ঘটেছে। অনেকে প্রকাশ্যেই কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের পক্ষে হিংসাশ্রয়ী মতামত ব্যক্ত করছেন । এঁদের কেউই তথাকথিত অশিক্ষিত নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, দেশবিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন এরকম ব্যক্তিরাও এ দলে ভিড়ছেন। মাঝে মাঝে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও এমন সব বক্তব্য পেশ করছেন যে যেন এদেশটি একটি এক-ধর্মীয়, সময় সময়ে এক-ভাষী রাষ্ট্র।
অবশ্য এসব চিন্তা এঁদের কাছেই প্রশ্রয় পায়, যাঁদের ভারতীয় সংবিধানের প্রতি ন্যনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই, এমনকী যারা সংবিধান যে কী, এ সম্বন্ধে কোনও ধারণাও রাখেন না।
ভারতের সংবিধানের প্রতিটি বাক্যের মধ্যে সঠিক ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা, যদি আমরা তা খুঁজে বের করতে পারি। এ গ্রন্থ অনুধ্যানই জানাবে যে প্রকৃত ভারতবাসী হিসেবে কাকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এ বিবেচনায় এটা স্পষ্ট, প্রকৃত ভারতবাসী তিনিই— যিনি সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না, জাতিভেদ প্রথায়, লিঙ্গভেদ প্রথায় আস্থাশীল নন; প্রকৃত ভারতবাসী তিনি যাঁর মনে কেবল নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নয়, অপর ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাবোধ থাকে; প্রকৃত ভারতবাসী হবার যোগ্যতার মাপকাঠিতে যাঁরা অবিশ্বাসী, নাস্তিক কিংবা এদের প্রতিও যাঁরা সহিষ্ণু, (কুপিয়ে মারাকে সমর্থন করেন না) তাঁরাও ভারতবাসী হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্য; ভারতবাসী এরাই যাঁরা যুক্তি এবং যুক্তিবাদে আস্থাশীল। সবশেষে বলা যায় প্রকৃত ভারতবাসী তাঁরাই যাঁরা শুধু নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন, অন্য ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। এ চিন্তা মাথায় রেখে যদি আমরা সংবিধান পাঠ করি দেখব এ গ্রন্থটি একখানা উচ্চচিন্তার আকর । দেশের উপর দিয়ে গত পঁচাত্তর বছর কত বিপর্যয় গেছে, তবু দেশবাসী এ সংবিধানের প্রতি আস্থাহীন হয়নি, এবং এ সংবিধানই সঠিক পথের দিশা । এ যে একটি মুক্ত গ্রন্থ, যে গ্রন্থ শেষ কথা বলে না, সততই নুতনের বাণী হয়, যুক্তিগ্রাহ্য, সর্বজনগ্রাহ্য, হিংসাশ্রয়ী দর্শন থেকে শতহস্ত দূরে এবং মানবিক।
♠♦♦♦♦♦♦ ♦♦♦♦♦♦♠
❤ Support Us








