- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৫
নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে সুশীলা কার্কিকে চায় তরুণ প্রজন্ম, সমর্থন কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্রর। দ্রুত নাম ঘোষণার পথে সেনা
সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ‘জেন জি’ আন্দোলনের ছুতোয় গত কয়েকদিনে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। আন্দোলনের ঢেউয়ে গদি হারিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। আক্রান্ত হয়েছেন নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির নেতৃত্ব ও তাঁদের পরিজনেরা। সহিংসতা ছড়িয়েছে সর্বত্র। দেশের পার্লামেন্ট, সুপ্রিমকোর্ট বহু প্রতিষ্ঠান মামলায় ক্ষতিগ্রস্থ, এমনি আগুনে দগ্ধ হয়েছে নেপালের রাজপ্রাসাদ। এই মুহূর্তে দেশজুড়ে সামরিক শাসন চলছে, কারফিউ জারি রয়েছে সর্বত্র। বৃহস্পতিবার পরিস্তিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে বলে দাবি সে দেশের সেনাপ্রধানের। তাই এবার নতুন শাসন পরিচালনার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হচ্ছে কাঠমান্ডুতে। কেপি শর্মা ওলির জায়গায় দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষপদে কে থাকবেন সে নিয়ে চলছে প্রবল জল্পনা। প্রাথমিকভাবে মেয়র বলেন্দ্র সাহ-এর নাম উঠে এলেও, এবার প্রাক্তন বিচারপতিকে বেছে নিচ্ছে নেপালের নতুন প্রজন্ম। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি এখন তরুণ আন্দোলনের অন্যতম মুখ।
গত কয়েক দিনের বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও রাস্তায় রক্ত, আগুন, ধোঁয়া। সরকার বিরোধী স্লোগানে মুখর। এবং, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডে ‘জেন জি অভ্যুত্থান’। একদিকে রাজধানী কাঠমান্ডুর রাজপথে যেমন আগুন জ্বলেছে, তেমনই ভার্চুয়াল মঞ্চেও জমেছে ইতিহাস গড়ার আলোচনাসভা। তাতেই উঠে এসেছে নতুন নেতৃত্বের নাম। এবার সেই নামকে সামনে রেখেই এগোতে চায় আন্দোলনকারীরা। সোমবার সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের জেরে দেশজুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তা পরিণত হয় গণ-আন্দোলনে। নিহত অন্তত ৩১ জন, আহত ১,০০০-র বেশি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ, নেতাদের বাড়িতে ভাঙচুর—সব মিলিয়ে নেপাল যেন ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি। এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার রাতে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আহ্বান জানালেও, জানা গিয়েছে, অলি তাঁর সরকারি বাসভবন ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।
এই রাজনৈতিক শূন্যতার মাঝে হাল ধরেতে চাইছে জেন জি রা। বুধবার দেশের প্রতিটি শহর, প্রত্যন্ত গ্রাম, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। সব জায়গা থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী একত্রিত হন একটি ভার্চুয়াল টাউন হল বৈঠকে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৫,০০০-এর বেশি। আলোচনার বিষয়— কে হবেন দেশের অন্তর্বর্তী প্রধান? প্রথমে আলোচনায় এগিয়ে ছিলেন কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ। জনপ্রিয় নাম ‘বলেন’ তরুণ প্রজন্মের কাছে দ্রুতই ভরসার মুখ হয়ে উঠেছিলেন। বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশের কোঠায়। অতীতে সুরকার ও র্যাপার হিসেবে খ্যাতি ছিল। ২০২২ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র পদে জয়লাভ করেন। ছাত্র-যুব আন্দোলনে সরাসরি অংশ না নিলেও, প্রথম দিন থেকেই সমর্থন জানিয়ে গিয়েছেন দূর থেকে। তাঁকে ঘিরে নেতৃত্বের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর একের পর এক ফোন, বার্তা উপেক্ষা করা দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন তরুণেরা। এক তরুণ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ‘ওঁকে বহুবার ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। তখনই আমরা বিকল্প খুঁজতে শুরু করি।’ তখনই উঠে আসে সুশীলা কার্কি-র নাম।
নেপালের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি। নেপথ্যে থাকতেই পছন্দ করেন। কিন্তু অন্যায়ের সামনে কখনও মাথা নত করেননি, এমন সুনাম তাঁর বিচারবিভাগীয় জীবনের পরিচায়ক। জানা গিয়েছে, কার্কিকে এই প্রস্তাব জানানো হলে তিনি প্রথমে কিছুটা সংযত ছিলেন। পরে শর্ত দেন, কমপক্ষে ১,০০০ জন লিখিতভাবে সমর্থন জানালে তিনি ভাববেন। তরুণেরা সে লক্ষ্য পেরিয়ে ছাপিয়ে দেন মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। ২,৫০০-র বেশি লিখিত সই জমা পড়ে তাঁর পক্ষে। এখন তাঁর সম্মতির অপেক্ষা। প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও সুশীলা কার্কির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। যাঁরা এই প্রস্তাব এনেছেন, তাঁদের প্রজ্ঞা, ঐক্য আর দৃষ্টিভঙ্গিকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। এটাই ভবিষ্যতের নেপাল।’ একইসঙ্গে তরুণদের কাছে তাঁর আবেদন—‘তোমাদের আবেগ, তোমাদের চিন্তাভাবনা দেশের স্থায়ী সম্পদ। নেতৃত্বে আসতে চেও, কিন্তু উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করো। নির্বাচন আসবে, তখনই দেশের আসল পরিবর্তন হবে।’
নেপাল সেনা সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে, খুব শীঘ্রই অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে সুশীলা কার্কির নাম আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করতে পারে সেনা প্রশাসন। সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনায় আছেন সুশীলা কার্কি, বলেন শাহ, হরকা সাম্পাং প্রমুখ-এর নাম। তবে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এদিকে রাজধানী কাঠমান্ডু, ললিতপুর এবং ভক্তপুরে কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে ১০টা এবং সন্ধ্যা ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হওয়া নিষিদ্ধ ছিল না। সেনা ঘোষণার পরেই দোকানপাটে ভিড় বাড়তে দেখা যায়। অন্য দিকে, রাজনৈতিক শিবিরে সতর্ক বার্তা শোনা গিয়েছে। নেপালের দুই বড়ো রাজনৈতিক শক্তি—কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল এবং নেপালি কংগ্রেস বুধবার একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা চায় সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই বর্তমান সমস্যার সমাধান হোক। সেনার হস্তক্ষেপ নয়, সংবিধানের পথেই যেতে হবে দেশকে, এমনই মত তাঁদের।
নেপালের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির বিচার বিভাগীয় জীবন কেটেছে ন্যায়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাধিক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালের সংবিধান খসড়া কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। পরে ২০১৬ সালে বিচারপতির দায়িত্বে আসেন। তাঁর সম্পর্কে নেপালের তরুণ প্রজন্মের মূল্যায়ন—তিনি সৎ, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ। এ মুহূর্তে তাঁর বয়স ৭২। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা এবং অজেয় ভাবমূর্তিই তাঁকে আন্দোলনের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এবার যদি সেনা এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন মেলে, তা হলে নতুন ইতিহাস লেখার পথে পা বাড়াবে নেপাল। সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার হতে পারে সেই সূচনা।
❤ Support Us







