- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫
বামশাসিত কেরালায় সাংবাদিকতার ওপর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আয়োজকদের বিরুদ্ধেই এফআইআর পুলিশের
‘অবৈধ জমায়েত’, ‘পুলিশের কাজে বাধা’, ‘পুলিশকে হুমকি’— এমন সব অভিযোগে কেরল পুলিশের এফআইআর। তাতে নাম উঠেছে একাধিক সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও আইনজীবীর। তাঁদের ‘অপরাধ’— এক তরুণ সাংবাদিকের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা।
কেরল-বাংলা সংযোগ রয়েছে তাঁর। বয়স মাত্র ২৬। নাম—রেজাজ এম। পেশায় সাংবাদিক। গত ৭ মে মহারাষ্ট্রের অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড তাঁকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ, মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে রেজাজের। এমনকি কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদকে নাকি সমর্থন করেন তিনি। তার পর থেকেই তরুণ সাংবাদিকটির মুক্তির দাবি উঠছে দেশের নানা প্রান্তে। সে সূত্রেই গত ১৩ সেপ্টেম্বর কোচির ভাঞ্চি স্কোয়ারে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজকদের দাবি, শহরের পুরসভা থেকে নিয়ম মেনেই অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। জানানো হয়েছিল, প্রায় ৩০-৪০ জনের এক শান্তিপূর্ণ জমায়েত হবে। কিন্তু ঘটল উল্টো। সভা শুরুর আগেই গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে ৬০-৭০ জন সসস্ত্র পুলিশ। অভিযোগ উঠছে, বক্তা এবং উপস্থিত মানুষদের ঘিরে ফেলে সভা চালাতে বাধা দেয় পুলিশ। বন্ধ হয়ে যায় সভা। এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই আয়োজক এবং বক্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে কোচি পুলিশ।
অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান, অম্বিকা, বাবুরাজ ভাগবতী ও মৃদুলা ভবানী। রয়েছেন সমাজকর্মী নিহারিকা প্রদৌষ, ড. হরি, শানীর, সিপি রশীদ, সাজিদ খালিদ, ভিএম ফয়সল এবং আইনজীবী প্রমোদ পুঝানগারাও। সিদ্দিক কাপ্পান, যিনি নিজেও এক সময় ২ বছর জেল খেটেছেন উত্তরপ্রদেশ পুলিশের দৌলতে, ছিলেন ওই সভার অন্যতম প্রধান বক্তা। ২০২০ সালে উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে এক দলিত কিশোরীর যৌন নির্যাতন করে হত্যার খবর করতে যাচ্ছিলেন কাপ্পান। মাঝপথেই তাঁকে আটক করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পান। এদিনের সভা প্রসঙ্গে কাপ্পান জানিয়েছেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার কারণে যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু এক বিজেপি কর্মী আমার বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ দায়ের করেন শুনে ঠিক করলাম, যেতেই হবে।’
সভায় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক মৃদুলা ভবানী। তিনি বলেন, ‘এক জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র মতো কড়া আইন প্রয়োগ হলে, তাঁর মুক্তির দাবি তোলা কি অন্যায়? রেজাজের পাশে দাঁড়ানো মানে সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষ নেওয়া।’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘এটি স্পষ্ট বার্তা, আপনি যদি অত্যাচারিতের পক্ষে মুখ খোলেন, তবে আপনাকেও নিশানা করা হবে। রেজাজ সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন, নির্যাতন নিয়ে নিয়মিত লেখালিখি করতেন।’ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী অম্বিকা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আগেই ১২টি মামলা চলছে। অধিকাংশই ডানপন্থী শক্তির প্ররোচনায়। এবারও তাই।’ তিনি জানিয়েছেন, ‘রেজাজের গ্রেফতারের এত দিন পরেও কেরল থেকে বড়োসড়ো কোনো প্রতিবাদ হয়নি। আমরা তাই প্রতিবাদ করতে জড়ো হয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা করল। কেরল ক্রমেই এমন জায়গায় পৌঁছচ্ছে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আর প্রতিবাদ করা যাবে না।’ এদিন বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা কখনোই একা লড়াই বিষয় নয়। তা হলে এমন দিনে একে অপরের পাশে না দাঁড়ালে কবে দাঁড়াবেন? সাংবাদিক বাবুরাজ ভাগবতী অবিচল কণ্ঠে বলেন, ‘সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময়ও দেখেছি, কেরালা পুলিশ সাংবাদিক, সমাজকর্মী, ছাত্রদের চিহ্নিত করে মামলা করছে। পুলিশের আচরণ ক্রমেই জনবিরোধী হয়ে উঠছে।’
প্রসঙ্গত, রেজাজ ও তাঁর সহকর্মীরা কিছু দিন আগে কোচিতে প্রো-ফিলিস্তিন সমাবেশ করেছিলেন। তাঁদের হাতে নানারকম পোস্টার ছিল, যদিও সে সভায় তেমন জনসমাগমও হয়নি। তবুও তাঁদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা করে পুলিশ। রেজাজের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা আদৌ আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ অনেকের। কিন্তু তত দিন কি তাঁকে জেলেই থাকতে হবে? প্রশ্ন তুলছেন সকলে। এমন এক দিনে সাংবাদিকতা নিয়ে, মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে, এবং বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের হয়ে কথা বলার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেরল থেকেই, যে রাজ্য বরাবরই গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষার উদাহরণ হিসেবে ধরা হতো ।
❤ Support Us







