Advertisement
  • প্রবন্ধ
  • এপ্রিল ১৫, ২০২৫

প্রবন্ধ। কৃষ্টি

সুব্রত কুমার রায়
প্রবন্ধ।     কৃষ্টি

 
আমার প্রাককৈশোরে অর্থাৎ প্রায় বছর কুড়ি আগেও দুপুরের কাঠালরঙা রোদে আমার দিদিমা উঠোনে আমের চটি বা কলাইমুগের সাজ তোলা বড়ি শুকোতে দিতেন। সন্ধে হলে আমরা ভাইবোনেরা রাক্ষসখোক্কসের গল্প শুনব বলে পিদিমের আলোয় দিদিমার গা ঘেঁষে বসতাম
, তারপর সেই রূপকথা দেশের পরীর দল চোখে ভিড় করে এলে এক সময় ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমিয়ে পড়েও নিস্তার ছিল না। আমাদের কল্পনার লাগাম-ছেঁড়া সাদা ধবধবে পক্ষীরাজ ঘোড়াটা মেঘের উপর দিয়ে আমাদের নিয়ে ছুটে চলত কোথায় কোন অচিনপুরে। আমার যখন ছোট্ট টুকটুকে একটা বোন জন্ম নিল, তার অনেকদিন আগে থেকেই মা, মামী, দিদিমারা বসে বসে কাঁথা সেলাই করতে শুরু দিলেন। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠত কত রকমের নকশা, ফুল ফল লতাপাতা থেকে জ্যামিতিক নক্সা পর্যন্ত। সোনামুখী ছুঁচে কাঁথা সেলাই দেখতে দেখতে কত সময়ই না আমার কেটে যেত। বর্ণবোধ থেকে যোগেন্দ্রনাথ হয়ে যখন আমরা পাঠশালায় ভর্তি হলাম তখন আমাদের গল্পের বই বলতে ছিল ছবিতে রামায়ণ, গল্পে মহাভারত বা তারও পরে দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুমার ঝুলি জাতীয় বই, ভোম্বল সর্দার, পক্ষীরাজ, শুকতারা, স্বপনকুমার এল তারও পরে। বিকেলে পাড়া উজিয়ে আমরা লাল্লুভল্লুর দল যে খেলাগুলো খেলতাম তা হচ্ছে বন্দি, এক্কাদোক্কা, রাজারানি। এই প্রায় কুড়ি বছরেই ছবিটা একদম বদলে গেছে। অবসর বিনোদনের যে ছবিটা শুধু গ্রামে নয় আধা মফস্সল শহরের ঘরে ঘরেও পাঁচ দশ বছর আগেও দেখা যেত তা যেন রাতারাতি পাল্টে গেছে। 
 

সাহিত্য অকর্ষিত ভূমির মতো, স্বভাব চাষির অভিজ্ঞ দৃষ্টি ছাড়া মাটির রহস্য নিঙড়ে ফসল ফলাবার ক্ষমতা কারো হবে না। মাটির সাথে কৃষকের সম্পর্ক যেমন সাহিত্যের সাথে প্রকৃত সাহিত্যিকের সম্পর্ক তেমনি। এর বাইরেও ফসল হয়, শংকর বীজ আর সার দিয়ে, মাটিকে তার ইচ্ছার বিপরীতে গণিকার মতো ব্যবহার করে, কিন্তু সে চালের ভাত খেয়ে আমাদের রসনা তৃপ্ত হয় না, অম্লশূল হয়, সন্ধান করে আনি দেশি চাল। অভাবে বা আকালে ছিন্নমূল কৃষকের শহরে ক্লিষ্ট জীবন যাপন যেমন, তেমনই কৃষ্টিহীন সাহিত্যের বর্তমান ছবি।

 
কৃষ্টি শব্দটির সাথে মা মাসীদের অবসর বিনোদের যোগাযোগ খুব বেশি, সংস্কৃতির মিলের কাপড় নয় এটা বরং কোরা ধুতি। আবার কৃষ্টি শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথেই মনে পড়ে আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের কথা, যখন ধান নিড়িয়ে, ঢেঁকি পাড় দিয়ে খেতের চাল আর পুকুরের মাছে তাদের দিব্যি চলে যেত, হাতে থাকত অঢেল সময়, সেই অবসর সময়েই মুখে মুখে তৈরি হতো পই, ছড়া, হাতে হাতে তৈরি হতো পাটি, বেতের মোড়া, পাঁচালী আলপনা, বড়ির সাজ, আমের চটি, বিচইন (বা হাতপাখা), পায়ে পায়ে ধামাইল ও আরো কত কি। কৃষ্টির ভাঁড়ার ঘর ছিল তখন ফসলে ভর্তি।
 
 বলাই বাহুল্য, এখন মা মাসীদের হাতে সময় বাড়ন্ত, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এমন অবস্থা। প্রশ্ন হলো, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আমাদের ঘরে ঘরে লোকশিল্পের এই হতদরিদ্র অবস্থা কেন ? লোকশিল্পের অনেক জিনিসের সাথেই সরাসরি সংযোগ প্রয়োজনের, অর্থাৎ ব্যবহারিক প্রয়োজনের স্বার্থেই ঘরে ঘরে অনেক শিল্পের জন্ম হয়েছে, যেমন কাঁথা বা হাতপাখার। কাঁথার প্রয়োজন ফুরিয়েছে অনেকদিন, তার বদলে পাওয়া যাচ্ছে ডায়াপার আর হাতপাখার ডাক পড়ে শুধুমাত্র ক্কচিৎ কদাচিৎ, বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ হলে। লোকশিল্পের জন্ম হয়েছে যেহেতু জীবনচর্যার স্বাভাবিক ধর্মে, বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ হিসেবে, সুতরাং সাদাসিধে, সরল জীবনযাপনের গোপন চাবিকাঠি হারিয়ে ফেলার সাথে সাথে কৃষ্টির ঘরে বাসা হয়েছে ভূতের। সে হচ্ছে সভ্যতার ভূত। আগে যখন মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বোধ থেকেই শিল্পিত করতে চেয়েছে সে নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীকে, পোড়া মাটির তৈজসে রং করে ফুটিয়ে তুলেছে বিচিত্র বর্ণে, হাতপাখার গায়ে কাপড় লাগিয়ে দিয়েছে ঝালর, মাটির মেঝেতে লক্ষ্মীকে আহ্বান করতে ধন ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় এঁকেছে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা, নিজের ছেলেকে ভুলিয়ে ঘরে বেঁধে রাখতে বেঁধেছে গফ্ আর কিচ্ছা, তখন সেই শিল্পের প্রাণের স্রোতধারা এতই গতিময় আর জীবনমুখী ছিল, যে তা ভাসিয়ে নিতে পেরেছিল সমস্ত ঠুনকো, নকল নির্মাণ শৈলীকে। কিন্তু এখন আধুনিক পণ্যবাজারের সস্তা রংচঙে জিনিসের কদর গ্রাম্য জিনিস থেকে অনেক বেশি। শহরের সংস্কৃতি গ্রামের কৃষ্টিকে গ্রাস করতে বসেছে। সংস্কৃতির যে পরিশীলিত ধোপা সে হচ্ছে ওয়াশিং মেশিন, কৃষ্টির কাঁচারঙের হাতে বোনা কাপড়ের সে দফারফা করে ছাড়ে। শহরের (বা সভ্যতার) অসংবৃত কাপড়ের হচ্ছে মেশিন ডাই করা রং, সিন্থেটিক সুতোর অদৃশ্য কাপড়, যার কাজ লজ্জা নিবারণ নয়, লজ্জা প্রদর্শন। শরীরের কাপড় যত ছোট হবে, সূক্ষ্ম হবে, তত ফুটে বেরোবে নারীর রূপ, এই হচ্ছে শহুরে সংস্কৃতির রুচিবোধ। সংস্কৃতির কাজই হচ্ছে পরিশীলন করা, সুতরাং সে কৃষ্টির লোকয়ত মোটা-ভ্রূ স্বাভাবিক রং-এর, ধুলোমাটি লাগা, পিঠছাপানো চুলের মেয়েটিকে অসংবৃত না করে স্বস্তি পায় না। লোকশিল্পের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট হবে মিউজিয়ম পিস্ হওয়ার পেছনে এটাই মস্ত কারণ। সংস্কৃতির শাসনের চোটে ধামাইল নাচ পা থেকে পালিয়ে বেঁচেছে, তার জায়গায় এসেছে পার্টিনৃত্য। কৃষ্টির এখন অনাসৃষ্টি অবস্থা।
 
অথচ, জীবনের একটি মৌলিক ধর্ম হচ্ছে যে ধীরে ধীরে সংস্থিত হতে চায়, কোন এক অধিষ্ঠান ভূমিতে ক্রমে শেকড়-কাণ্ড ছড়িয়ে ঋজু ও দৃঢ় হয়ে বিকশিত হতে চায়। ফলে তার নীচে চাই মাটি, উপরে চাই অম্লজান-শুদ্ধ প্রকৃতি। সভ্যতার গোড়ায় মানুষ যখন যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তখন শুধুমাত্র জৈব-প্রয়োজনে শিকারের জন্য বানিয়েছিল অস্ত্র, শক্তি, উষ্ণতা ও আহারের নিমিত্ত আবিষ্কার করেছিল আগুনের, ভ্রমণ বা বহনের জন্য নির্মাণ করেছিল চাকার, কিন্তু তখন, সেই ঊষালগ্নে, কৃষ্টির বীজটি শুধু সে বহন করলেও সেই আদিমানব বীজবপনের বা চাষের রহস্য, অঙ্কুরের রহস্য জানেনি ফলে প্রয়োজন থাকলেও কোনো কিছু উদ্ভাবনের তাগিদ সে অনুভব করেনি। কিন্তু কৃষির জন্মের সাথে সাথে প্রথমে জন্ম নিল অবসরের, অবসর থেকে কল্পনার, কল্পনা থেকে উদ্ভাবনের। কৃষ্টির বিকাশের সাথে তাই অবসরের বড়ো নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু কৃষ্টির সাথে গভীরতম যোগাযোগটি হচ্ছে জীবনের, যার মৌলিক ধর্ম সেই সংস্থিতি বা সংহতির। এভাবে হয়তো আমরা অনুভব করতে পারি যে জীবন আর কৃষ্টি পরস্পরের পরিপূরক। কখনো জীবন আধার কৃষ্টি আধেয়, কখনো কৃষ্টি আধার জীবন আধেয়, এ যেন মন আর শরীরের সম্পর্কের মতো। মন ছাড়া শরীর, শরীর ছাড়া মন, দুইই অবাস্তব, অসম্ভব। কিন্তু জীবন বা কৃষ্টির এই আপনাতে সুশৃঙ্খলিত হবার আকুতির বিপরীতে বিজ্ঞানের এনট্রপি বসে আরেকটি নিয়ম বলছে যে পদার্থ সর্বদা এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের এই কথাটি যে সর্বৈব সত্যি তা ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম বা নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নিলেই আমরা বুঝতে পারব। জন্মের পর কৈশোর, যৌবন, জরা, বৃদ্ধ, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সেই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলাকেই তো আমরা অনুভব করি। কিন্তু প্রাণের ধর্ম এর বিপরীতে কাজ করে, এ যেন এক অদৃশ্য ‘দড়ি’ টানাটানির খেলা। প্রাণ, জীবন, কৃষ্টি এরা একদিকে তো আরেক দিকে নিষ্প্রাণ, নির্জীব, অপকৃষ্টি। সংস্থিতির উল্টোদিকে অস্থিতি, সুকৃতির বিরুদ্ধে বিকৃতি, অগভীরের বিপরীতে গভীর, সরল, স্বাভাবিক ও অকৃত্রিমের অন্যদিকে অসরল, অস্বাভাবিক, কৃত্রিম। 
 

আধুনিক কালে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিস্ফোরক সম্প্রসারণের যুগে আমরা একটি সাংঘাতিক মিথ্যে কথা শিখেছি যে ‘যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের ইন্দ্রিয়েরই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ’, অতএব তোমার কল্পনার স্থান নিল বেতার, দূরভাষ, দূরদর্শন ইত্যাদি। যেটুকু অবসর ছিল আমাদের হাতে তা হাত বদলে চলে গেল বহুজাগতিক ভূতের কারখানার হাতে। অবসর, কৃষ্টি, কল্পনা ও সাহিত্যের বদলে পেলাম অবসর, যন্ত্র, ব্যস্ততা ও অন্তঃসারশূন্য শ্রাব্য ও দৃশ্যের মিথ্যাচার

 
বছর কুড়ি আগে এই দড়ি টানাটানির খেলার এমন জায়গায় ছিলাম আমরা যখন এই দুই দলের মধ্যে জোর লড়াই চললেও কোনো দল জেতেনি। সভ্যতা, যার দোসর হয়ে এসেছিল সংস্কৃতি, তখনো কৃষ্টি আর লোকায়ত জীবনকে হারিয়ে দুয়ো দুয়ো বলে গ্রামছাড়া করেনি। ফলে যে সাম্য বা ভরকেন্দ্র আমাদের জীবনে, সৃষ্টিতে, কর্মে, প্রাণে ছিল তার সুকৃতিতে আমরা আমাদের শেষতম গভীর জীবনবোধের, গভীরতার, অকৃত্রিমতার, সরলতার, অকপট প্রমাণ হয়তো পেয়ে গেছি সাহিত্য, চলচ্চিত্র বা শিল্পে। উদাহরণের বাহুল্য না করেও একথা হয়তো আমরা আজ সামান্য হলেও অনুভব করছি। যেভাবে আজ আমরা ভান ও সারল্যের মধ্যে ফারাক ভুলে যেতে বসেছি সেভাবে আজ আমরা সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেলছি, এক করে ফেলছি কৃষ্টির সাথে। সংস্কৃতি যদি পথ হয় তবে কৃষ্টি সেই পথের শুরুর গৃহকোণ, যেখান থেকে একদা এক সলাজ গাঁয়ের বধূ পথিকের হাতে গামছার বাঁধা দুটো নারকেলের নাড়ু আর চিঁড়ে ধরিয়ে দিয়েছিল।
 
 চলচ্চিত্র বা অন্যান্য শিল্পের চেয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে বছর কুড়ি আগের জীবন আর আজকের জীবনের মধ্যে বৈপরীত্যের যে চোখের মাথা খাওয়া প্রকাশ তা-ই গভীরভাবে ধরা পড়েছে। এ যে রোগীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যামোর জোরাজুরি। বলতে দ্বিধা নেই সাহিত্যেরও নিদানকাল এখন ঘনিয়ে এসেছে। আর তার কারণটিও খুব সরল।
 
 সাহিত্য অকর্ষিত ভূমির মতো, স্বভাব চাষির অভিজ্ঞ দৃষ্টি ছাড়া মাটির রহস্য নিঙড়ে ফসল ফলাবার ক্ষমতা কারো হবে না। মাটির সাথে কৃষকের সম্পর্ক যেমন সাহিত্যের সাথে প্রকৃত সাহিত্যিকের সম্পর্ক তেমনি। এর বাইরেও ফসল হয়, শংকর বীজ আর সার দিয়ে, মাটিকে তার ইচ্ছার বিপরীতে গণিকার মতো ব্যবহার করে, কিন্তু সে চালের ভাত খেয়ে আমাদের রসনা তৃপ্ত হয় না, অম্লশূল হয়, সন্ধান করে আনি দেশি চাল। অভাবে বা আকালে ছিন্নমূল কৃষকের শহরে ক্লিষ্ট জীবন যাপন যেমন, তেমনই কৃষ্টিহীন সাহিত্যের বর্তমান ছবি। 
 
জীবনের সার সত্য এই যে, সে একটি মূল ভাবনাকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠে। অবলম্বনহীন বৃক্ষলতার মতো আরো একটি গাছের বা আশ্রয়ের সাহায্য ছাড়া সে নুয়ে পড়ে।
 
 কৃষ্টি, লোকাচার, লোকধর্ম এসব কিছুই অতি গোপনে অথচ অনিবার্যভাবে জীবনের প্রতি আমাদের মৌলিক অবস্থানকে দাঁড় করিয়ে রাখে, এ সবের অপ্রত্যক্ষ অবলম্বন হাড়া সে নুয়ে পড়ে, এবং একসময় ভেঙেও পড়ে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততাটুকু আমাদেরই তৈরি করা, কারণ কৃষ্টির স্থান নেওয়া আধুনিক সংস্কৃতির প্রধান দান হচ্ছে অবসরের অপনোদন। আমরা ছোটোবেলা একসময় অবসরকালে ইকিরি মিকিরি চামচিকি খেলতাম, খেলার সাথে সাথে ছড়াটাও যেন নিজের থেকেই উচ্চারিত হতো। মুষ্টিবদ্ধ পাতানো হাতের উপর আরেকটি হাতের আলতো কিলের সাথে তাল মিলিয়ে ওই ছড়া কাটার সময় আমরা ভেবেও দেখিনি কৃষ্টির এই স্বচ্ছ নির্মল রূপটিকে। প্রয়োজনে এবং অবসরে মায়ের পাঁচালী পড়া বা সুর করে শ্রীকৃষ্ণের শতনাম পড়ার মধ্যে অবসরের সাথে কল্পনার যোগাযোগ হতো, বৃষ্টির দিনে কল্পনায় আর বিধুরভাবে ভরে ওঠেনি এমন মানুষ বিরল। কিন্তু আধুনিক কালে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিস্ফোরক সম্প্রসারণের যুগে আমরা একটি সাংঘাতিক মিথ্যে কথা শিখেছি যে ‘যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের ইন্দ্রিয়েরই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ’, অতএব তোমার কল্পনার স্থান নিল বেতার, দূরভাষ, দূরদর্শন ইত্যাদি। যেটুকু অবসর ছিল আমাদের হাতে তা হাত বদলে চলে গেল বহুজাগতিক ভূতের কারখানার হাতে। অবসর, কৃষ্টি, কল্পনা ও সাহিত্যের বদলে পেলাম অবসর, যন্ত্র, ব্যস্ততা ও অন্তঃসারশূন্য শ্রাব্য ও দৃশ্যের মিথ্যাচার।
 
চলচ্চিত্র মূলত ওই আধুনিক মিথ্যাচারের উপর দাঁড়িয়ে আছে, আধুনিক অন্যান্য শিল্পমাধ্যম মূলত ওই শ্রাব্য ও দৃশ্যের বিভ্রমেরই প্রকাশ, সুতরাং কৃষ্টির অপসারণে এখনই তার অট্টালিকা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে না, কিন্তু সাহিত্য এত বেশি রকম কৃষ্টি থেকে আহরিত মৌখিক ঐতিহ্য বা Oral tradition এবং জীবনচর্যার শেকড় ছড়ানো দৃঢ় সংস্থিতির ভিতে দাঁড়িয়ে আছে যে কৃষ্টির মাটি সরে গেলে তার দাঁড়াবার জায়গাও থাকবে না।
 
আমাদের আদিম মানব যাযাবর জীবন ত্যাগ করে থিতু হয়ে কোথাও শেকড় ছড়াবার পরই জন্ম হয়েছিল প্রাচীনতম সাহিত্যের। আধুনিক মানুষ আর আদিম মানবে মিল এক জায়গায় যে যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুতি ও সহজলভ্যতার কারণে পৃথিবী একটি মাত্র গ্রামে পরিণত হওয়ায় আধুনিক মানুষ জন্মের পর থিতু হয়ে শেকড় ছড়াবার আগেই ঘুরে ফিরে বিশ্বমানব বা আদিম যাযাবরে পরিণত হয়েছে, তার কোনো কৃষ্টি নেই কারণ তার কোনো স্বতন্ত্র জীবনচর্যা নেই, সুতরাং তার কোনো সাহিত্যও নেই, শিকারপটু আদি-মানবের মতো এক সময় সে শুধু হাড় বা পাথর দিয়ে ধারালো অস্ত্রই বানাতে পারবে।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!