Advertisement
  • প্রবন্ধ
  • এপ্রিল ১৫, ২০২৫

প্রবন্ধ। রূপসী বাংলার মাননীয় রাষ্ট্রপতি সমীপেষু !

সঞ্জীব দেবলস্কর
প্রবন্ধ।     রূপসী বাংলার মাননীয় রাষ্ট্রপতি সমীপেষু !

চিত্রকর্ম : প্রকাশ কর্মকার

 
আপনি বলেছিলেন, বাংলার মাঠের কয়েকটা শালিখের জন্য আশ্চর্য বিস্ময়ে আপনি অন্ধকার বিছানার কোলে শুয়ে চেয়ে রইবেন আরো কিছুকাল; আপনি বলেছিলেন, পৃথিবীর এই মাঠখানি ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছুদিন। আদি অনাদি বাংলার কুয়াশায় ভেসে আসা সোনালি চিলের ডানা, ধানের নরম শীষে মেঠো ইঁদুরের চোখ, জামের নিবিড় ঘন ডালে মৌমাছির চাক – এইসব অমূল্য সম্পদের সর্বকালীন অধিশ্বর হ্যাঁ আপনিই।
 
আপনি বলেছিলেন, পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে। কে বলেছে, আপনি বেঁচে নেই, দিব্যি তো বেঁচেই আছেন। বেঁচে থাকবেন। আপনি জেনে রাখুন, আপনার অনুপস্থিতিতে চালতা ফুল আজও ভিজিতেছে শিশিরের জলে, লক্ষ্মীপেঁচা আজও গান গাইছে তার লক্ষ্মীটির তরে। এশিরিয়া ধুলি আর ব্যবিলন ছাই হয়ে গেলেও আপনার রূপসী বাংলার গল্প চিরকাল বেঁচে রইবে। আপনি একবার আসুন আপনার কবিতার পুঁথি নিয়ে। হতভাগা বাঙালির কানেকানে ঢেলে দিন বাংলার মাঠ আর ধান আর শঙ্খচিলের কাব্য, বাসমতী চালের গন্ধে ভরে উঠুক বাংলার ঘর গেরস্তালি। আপনি যে আবহমান বাংলার রূপ এঁকেছেন এর অধিপতি তো হিংসুটে দৈত্যরা হতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে করুণ ভৌগলিক এলাকা এই বাংলা, যেখানে সবুজ ডাঙা ভরে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল, যেখানে গাছের নাম কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল– এ দেশটি তো আপনার। আপনিই তার রাষ্ট্রনেতা।
 

বাংলার রাষ্ট্রপতি জীবনানন্দ দাশ ! আপনি লালন সাঁইকে বিদেশমন্ত্রী করে পাঠান পৃথিবীর দেশে দেশে, উদাস বাউল হাসন রাজাকে নতুন দায়িত্ব দিন, সঙ্গে দিন রাধারমণ গোঁসাইকে–এরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন ভালোবাসার মন্ত্র, ডেকে পাঠান বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে। গ্রামের নওজোয়ানদের নিয়ে বাউলা গান আর ঘাটু গানের আসর বসাবেন বাংলার নদী মাঠ ঘাট আর প্রান্তরে কান্তারে। বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুলকে পাঠিয়ে দিন রাষ্ট্রসংঘে– ছিন্ন খঞ্জনার মতো এরাও আবার দেবসভায় নৃত্যের তালে তালে বাংলার করুণ কাহিনি তুলে ধরবে যেমন অনেক অনেক শতাব্দী আগে করেছিল অনন্ত ভাসানের যাত্রী, চম্পক নগরের বেহুলা সুন্দরী

 
দোহাই মাননীয় রাষ্ট্রনেতা, বাংলার রাজারাম, সীতারাম, রায় বল্লভ আর ঘোড়া চড়ে চলে যাওয়া রায় রায়ানকে ডেকে আনুন এই সবুজ কান্তারে। আপনার আদেশে হিংসার আওয়াজ ছাপিয়ে বাংলার কাচপোকা শ্যামাপোকা আর গঙ্গাফড়িঙের ঐকতানে ভেসে উঠুক ভালোবাসার গান। বাংলার কবি আক্ষেপ করেছিলেন, যে দেশের পাখির কণ্ঠে এত বৈতালিক সে দেশে কেন এত গুপ্ত হত্যা? এই তো সেদিনই ধ্বনিত হয়েছিল আপনার দেশে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, সকলেই বলে বিচার চাই, মুজিব হত্যার বিচার চাই।’ এটা কি বাংলা ভুলে গেল?
 
বাংলার রাষ্ট্রপতি জীবনানন্দ দাশ ! আপনি লালন সাঁইকে বিদেশমন্ত্রী করে পাঠান পৃথিবীর দেশে দেশে, উদাস বাউল হাসন রাজাকে নতুন দায়িত্ব দিন, সঙ্গে দিন রাধারমণ গোঁসাইকে–এরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন ভালোবাসার মন্ত্র, ডেকে পাঠান বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে। গ্রামের নওজোয়ানদের নিয়ে বাউলা গান আর ঘাটু গানের আসর বসাবেন বাংলার নদী মাঠ ঘাট আর প্রান্তরে কান্তারে। বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুলকে পাঠিয়ে দিন রাষ্ট্রসংঘে– ছিন্ন খঞ্জনার মতো এরাও আবার দেবসভায় নৃত্যের তালে তালে বাংলার করুণ কাহিনি তুলে ধরবে যেমন অনেক অনেক শতাব্দী আগে করেছিল অনন্ত ভাসানের যাত্রী, চম্পক নগরের বেহুলা সুন্দরী।
 
আপনি শুনেছিলেন চারিদিকে গ্রাম পতনের শব্দ। আজও তো নগরায়নের প্রবল চাপে, উন্নয়নের জোয়ারে এই শঙ্খচিল শালিখের দেশে শুনি কেবলই গ্রাম পতনের ধবনি, প্রতিধ্বনি। কার্তিকের নবান্নের দেশে আমাদের গ্রামগুলি বুলডোজারে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। মাঠ থেকে ছিটকে পড়ছে আমাদের সন্তানেরা উত্তর আর দক্ষিণ ভারতের শিল্প তালুকে।
 
বাংলার প্রিয় কবি, আপনি আবহমান কালের যে রূপসী বাংলার চিত্র এঁকেছেন সে বাংলায় আমরাও আছি। আমরা বলি দুঃখিনী বর্ণমালার ভূমি। আমরাও আপনার মতো নির্জন খড়ের মাঠে পউস সন্ধ্যায় হেঁটেছি, আমরাও দেখেছি, অন্ধকারে জোনাকিতে ভরে যাওয়া আকন্দ ধুন্দুল, আমরাও অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিকে ভালোবেসেছি, ভালোবেসে ধানের গুচ্ছের উপর রেখেছি হাত। জীবনের সব আশ্চর্য কুহক আমাদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারেও জমা হয়ে আছে।
 

চিত্রকর্ম : জহর দাশগুপ্ত

আপনার সঙ্গে আমরাও সেই বাংলাকে বার বার হারিয়েছি, আবার খুঁজে পেয়েছি, আবার হারিয়েছি। আপনি শুধু হারানোটাই দেখেছেন, আমরা বাংলাকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ দেখেছি। এ দেখার সৌভাগ্য আপনার হয়নি। সেটা আপনার দেখা হয়নি, যে-বাংলাকে পেছনে ফেলে আপনি মহানগরীর রাজপথে আছড়ে পড়েছিলেন একদিন, অদ্ভুত আঁধারে নিমজ্জিত সে বাংলা একদিন সত্যিই জেগে উঠেছিল, আপনার মগ্নভগ্ন কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত রূপসী বাংলার কথকতা বাঙালির ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েদের জাগিয়ে তুলেছিল। আপনার আমজাম কাঁঠালের ছায়ায় শালিখ খঞ্জনা লক্ষ্মীপেঁচার আদর গায়ে মেখে বাঙালি জেগে উঠেছিল সে এক মহাসংগ্রামে। তাদের পরনে ছিন্নবাস, হাতে অকিঞ্চিৎকর যুদ্ধাস্ত্র আর ঝুলির ভেতরে কী ছিল, আপনি শুনতে চান তা ? বিশ্বাস করতে পারবেন কি না জানি না, ঝুলিতে ছিল একখণ্ড ‘রূপসী বাংলা’। শহিদ শয্যায় শায়িত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আঁকড়ে ধরা ছিল এ কবিতার পাতা। ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে, ধলেশ্বরীর চড়ায়, শঙ্খমালা, মাণিকমালা, রাজবল্লভ, চণ্ডিমঙ্গলের মুকুন্দরাম, বল্লাল সেন আর রামপ্রসাদের দেশের উপর দিয়ে বইল কত ঢেউ, যুদ্ধ, হত্যা রক্তপাত। রক্তের অক্ষরে লেখা হলো বাঙালির আত্মজাগরণ মন্ত্র– ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’
 
হে প্রিয় কবি ! ধানসিঁড়ি, বিশালাক্ষী জলসিঁড়ি ধলেশ্বরী কালীদহ জলাঙ্গী রূপসা কীর্তিনাশা পদ্মা কর্ণফুলি মেঘনা ইছামতী আজও অপ্রতিহত। খরস্রোতা। আপনার তাল-তমাল-ডমুর-তেঁতুল-চালতা-নারকেল-সুন্দরী-মাদার জারুল-নোনা-করমচা-চিনিচাঁপা-সুপারী-জামরুল আজও আপনার পথের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনার বাংলাকে আজও সাজিয়ে রেখেছে ভাঁটফুল, আকন্দ, বসকলতা, আলোকলতা, অপরাজিতা, শেফালি, করবী, কাঁঠালচাঁপা, সজনের ফুল, বেলকুঁড়ি ছাওয়া পথ, দ্রোণফুলের ঝাড়, আমের বউল আর আনারসের কলি। আপনার নাটাফল, বেতের নরম ফল ডাঁসা আম, জাম, কু্ল, পেয়ারা, বইচি, নোনাফল, করমচা, খিরুই মাকাল, লেবু আতা, তালশাঁস নিত্যকালের আমন্ত্রণ বিলিয়ে দিতে ব্যস্ত। বাংলার শালিখ খঞ্জনা, ভোরের দোয়েল, বক, মাছরাঙা, রাজহাঁস, টিয়া, চড়াই, বউ কথা কও, গঙ্গাশালিখ, নিমপেঁচা, সুদর্শন, মরাল মরালী, চকোর চকোরী আর কার্তিকের ভোরে প্রতীক্ষায় থাকা কাকের দল। আপনি এসে দেখে যান আপনার বাংলাকে ওরা কোন দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে।
 
বাংলায় আজ দুবৃত্তের দল ভুলে গেছে এখনও বাংলার বেতবনে বাঘিনীর ডোরা দেখা যায়, গোখুরা, পাটকিলে ঘোড়া আর কুকুর বেজিরা নিঃশেষ হয়ে যায়নি আজও। বাংলার বোলতা, ভিমরুল, পিঁপড়ে, মৌমাছি কাঁচপোকা, শ্যামাপোকা, গুবরে পোকা, নীল ভ্রমরের দল এক হয়ে বেঁচে আছে।
 
আপনিই তো এসব স্থলজ-জলজ সম্পদের অধিপতি। আপনার কবিতাই আপনার রাজদণ্ড। যারা আপনার কবিতার আবেদনে সাড়া দেয়নি এরা বাঙালি নয়, এদের দেশ বাংলা নয়। যে সময় বাঙালি খয়েরি ডানা শালিখকে চেনে না, কাচপোকাটিপ, গাঙশালিখ আর শঙ্খচিল শালিখের সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, তারা ইতর জাতীয় দ্বিপদ প্রাণী। বাংলার মাটি তাদের বসবাসের জায়গা হতে পারে না। এরা ধানসিঁড়িটির তীরে কেঁদে কেঁদে উড়ে যাওয়া সোনালি ডানার চিলের দিকে তাকিয়ে উদাস হয় না, আকন্দ ধুন্ধুল এলাচি ফুল অশোকলতার সঙ্গে ভাব জমাতে মুথা ঘাসের উপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতে পারে না। এসব হতচ্ছাড়া কি বাংলার শালিধান, বাসমতী, রূপশালি খেতকে কি জড়িয়ে ধরে থাকে? থাকতে পারে? পরণ কথা, কীর্তন ভাসান, মাথুরের পালা গ্রামীন পাঁচালির নরম নিবিড় ছন্দ কি এদের মনে দোলা দিতে পারে !
 
এরকম কিছু সংখক শয়তান আজ বাংলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু কি বাংলায়? এশীয় উপমহাদেশ নয়? সারা পৃথিবীতেই এরা আজ উদগ্র, উদ্দাম।
 
‘জ্ঞান নেই আজ এ পৃথিবীতে
জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই’— এ ছিল আপনার উপলব্ধি।
আপনি এক ‘অদ্ভুত আঁধারের’ কথা বলেছিলেন। আপনিও শুনিয়েছিলেন –
‘অন্ধ যারা সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা
যাদের হৃদয়ে প্রেম নেই—প্রীতি নেই
করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’
 
এই বিপন্নতার মুহূর্তে বাংলার করুণ ডাঙার এপার ওপার সর্বত্র, অস্বস্তি আর অস্বস্তি। যারা বুকের ভিতর অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তাকে আঁকড়ে ধরে আছেন, এরা এপারে ওপারে সর্বত্র বিভাজক শিবিরের কাছে ধিকৃত, সর্বত্র এরা নিরতিশয় বিপন্নতায় আক্রান্ত। আপনি যে আবহমান বাংলার ছবি নির্মাণ করে গেছেন, হিংসুটে দৈত্যদের হাতে সে বাংলাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। দেওয়া উচিত ? বাঙালি কি মূক বধির হয়েই দেখে যাবে এদের উন্মত্ততা ?
 
রূপসী বাংলার নির্মাতা, কবি জীবনানানন্দ দাশ। আপনি আবার এই বাংলায় আসুন—হয়তো মানুষ নয় শঙ্খচিল শালিখের বেশেই আসুন আমাদের প্রিয়, বিশ্বের বিস্ময় এই বাংলায়। আপনার শান্ত স্নিগ্ধ মৃদু কবিতার অক্ষরের ভিতর যে সুপ্ত আগুন, যে আগুনের  স্ফুলিঙ্গ ধিকিধিকি জ্বলছে, সে আগুন ছড়িয়ে দিন দিক দিগন্তে, বাংলার ভেতরে ও বাইরে।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!