- প্রবন্ধ
- এপ্রিল ১৫, ২০২৫
প্রবন্ধ। এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির সম্ভবত শেষ বিবেক জাগানিয়া গাইয়ে প্রতুল মুখোপাধ্যায় কিছুদিন আগে অস্তমিত হলেন। ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই !’ অনবদ্য এই উচ্চারণের মূর্ছনা আসন্ন বৈশাখের তপ্ত দিনগুলিতে কি অণুরণিত হবে ? খুব একটা ভরসা করতে পারছি না। পারছি না এইজন্যে যে কোনো রাখ-ঢাক না রেখেই আমাদের মানচিত্রসর্বস্ব ‘দেবতা’ ইদানীং বেপরোয়াভাবে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান-এর ফ্যাসিবাদী একীকরণ নীতির বুলডোজারে বাঙালি-জাতিসত্তাকে থেঁতলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। ‘বিবিধের মাঝে দেখা মিলন মহান’ –এই কথাটি আজ আর কোথাও উচ্চারিত হয় না। যেহেতু শাসক-শক্তি তার নান্দীপাঠকদের মানচিত্রের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দিয়েছে মহা তিমিঙ্গিল পুঁজিপতিদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে-থাকা অজস্র টিভি চ্যানেল এবং সংখ্যাহীন পোর্টালের বিষক্রিয়ার মাধ্যমে। সংবাদ কোথাও এখন আর খবর নয়, প্রভুশক্তির চিরস্থায়ী ইজারায় পরিণত হয়ে যাওয়া মগজে মগজে অবস্থাম পাকাপোক্ত করার অব্যর্থ আয়ুধ।
যে আশ্চর্য বিদ্যাচর্চার ধারা প্রবহমান ছিল উনিশ-বিশ শতকের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি জুড়ে তা বিকশিত হয়েছিল ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, আচার্য মুহম্মদ শহীদুল্লা, বিজ্ঞান সাধক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য মেঘনাদ সাহাদের উজ্জ্বল পরম্পরা সত্ত্বেও, সেই জাতির বিপ্রতীপ পরিণতি স্বনির্মিত চক্রব্যূহে ইদানীং অতিশয় স্পষ্ট। কর্মযোগী বিবেকানন্দও আজ ভয়াবহ খণ্ডিত-বিখণ্ডিত। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল কিংবা বিভূতিভূষণ-জীবনানন্দ অথবা কাজী আবদুল ওদুদ-আহমদ শরীফ প্রমুখ বিদ্বজ্জন কি সত্যিই আমাদের স্মৃতির উপাত্ত ?
এসময় সত্য বলে নেই কিছু কোথাও, নেই মিথ্যাও। নেই পরম্পরা, নেই ইতিহাস। কিংবা আছে সুচতুর বিকার সংক্রমণে নষ্টভ্রষ্ট বানানো পরম্পরা এবং মেকি ইতিহাস। সমস্তই সর্বব্যাপী মগজ ধোলাই-এর প্রকল্প অনুযায়ী একতরফা চাপিয়ে দেওয়া। অলীক ভারতীয়তার নিশ্ছিদ্র অচলায়তন উপাস্য কেবল। একীকরণের-সন্ত্রাসের তাড়িতদের জন্যে হিন্দি ভাষাই একমাত্র বৈতরণী। হিন্দি-আধিপত্যের ঢোলবাদক হয়ে যে সব আঞ্চলিক ভাষা গোষ্ঠীর উচ্চাকাঙ্ক্ষী জনেরা নিজেদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আখের গোছাতে চায়, ভারতীয়তার রঙিন জোব্বার আড়ালে তাদের ফন্দিফিকির অব্যাহত থাকে। তাই উত্তর-পূর্বের রাজপাটে চিরব্রাত্য বাঙালি সমাজের আপন ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার কেড়ে নেওয়াতে হিন্দিওয়ালাদের আশীর্বাদ সর্বদা বহাল থাকে। ক্রমাগত বিপন্নতর হয়ে যাওয়া বাঙালিকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তার জাতিসত্তার মৌলিক অভিজ্ঞান।
উনিশ শতকের রেনেসাঁস যত নতুন আলোর দিগন্ত উন্মোচিত করেছিল, ক্রমাগত অন্তর্ঘাত করে সেইসব দিগন্ত বাঙালি জাতির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রতন্ত্র তথ্য-বিনোদন-প্রযুক্তির অজস্র ফাঁদ তৈরি করে বাঙালিকে চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। জাগরণের দীপশিখাদের নিয়ে এখন আর কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের সময় থেকে যে আশ্চর্য বিদ্যাচর্চার ধারা প্রবহমান ছিল উনিশ-বিশ শতকের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি জুড়ে তা বিকশিত হয়েছিল ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, আচার্য মুহম্মদ শহীদুল্লা, বিজ্ঞান সাধক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য মেঘনাদ সাহাদের উজ্জ্বল পরম্পরা সত্ত্বেও, সেই জাতির বিপ্রতীপ পরিণতি স্বনির্মিত চক্রব্যূহে ইদানীং অতিশয় স্পষ্ট। কর্মযোগী বিবেকানন্দও আজ ভয়াবহ খণ্ডিত-বিখণ্ডিত। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল কিংবা বিভূতিভূষণ-জীবনানন্দ অথবা কাজী আবদুল ওদুদ-আহমদ শরীফ প্রমুখ বিদ্বজ্জন কি সত্যিই আমাদের স্মৃতির উপাত্ত ?
২
অতি গণতন্ত্রীকরণের ফলে সর্বব্যাপ্ত শিক্ষায়তনগুলিতেই বাঙালির বিদ্যাচর্চা অবসিত। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে দুটি তথাকথিত সেমিনারের অত্যাশ্চর্য ‘অর্জন’-এর কথা লিখছি। বিশিষ্ট এক পদাধিকারী ‘অধ্যাপক’ অকারণ উষ্মায় বলে বসলেন: ‘সুনীতি কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু একটা বললেই মেনে নিতে হবে কেন ?’ অবধারিত ভাবেই মেনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই উচ্চারণ যা তিনি মহাপ্রয়াণের কয়েক মাস আগে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন : ‘ধন্য ধন্য গৌড়’। পাঠকও আশা করি নিশ্চিত যে প্রাজ্ঞ ওই মহাজন সুনীতি কুমারের নামটিও যেমন জানেন না ঠিকমতো, তেমনি তাঁর কোনো বই তিনি ছুঁয়েও দেখেননি। এবং, হা হতোস্মি, বাঙালির ঘরে জন্ম-নেওয়া সেই মহাজন বাঙালি শ্রোতাদের কাছেও রাজার ভাষা হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন ! কাদের খুশি করার জন্যে তাঁকে প্রভুর ভাষায় ব্যুৎপত্তি দেখাতে হলো ? এই মনোভঙ্গির বিস্ফোরণ দেখি হাটে-বাজারে; বিভিন্ন বিদ্যায়তনের চত্বরে, অফিস – বিনোদন স্থলে যেখানে বাঙালি ঘরের ছেলে মেয়েরা ফিল্মি হিন্দিতে যত্রতত্র ইংরেজি বা অসমীয়া গুঁজে দিয়ে খিচুড়ি-ভাষা প্রয়োগ করে। এরা যে-সব পরিবার থেকে আসে, তাদের কর্তা গিন্নিরা শিশুকালেই মাতৃভাষা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে নিয়ে যান। সুতরাং বাংলা বইয়ের দোকান তা নিশ্চিহ্ন হবেই। দুয়োরানি যে হবে বাংলা গান এবং বাঙালির যাবতীয় পরম্পরা–তা তো অনিবার্যই।
খড়কুটোর মতো স্রোতে ভেসে যাওয়া জনেরা কি ভাবে: পোশাক-আশাক, আচার-ব্যবহার, খাদ্যপ্রণালী, ভাষা ব্যবহার, সংস্কৃতি-চেতনার নিরিখে কোথাও কি রয়েছে বাঙালিত্বের অবশেষ ? তাই বঙ্গাব্দ কবে কখন কোন রাজা বা নবাবের আমলে শুরু হয়েছে, এই নিয়ে বিতর্ক নিষ্ফল। বিদ্যায়তনিক কৌতূহলে প্রয়োজনীয় বইপত্র ঘেঁটে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারি নিশ্চয়। কিন্তু তাতে কি সাম্প্রতিক কালের আত্ম-সমর্পণ অস্বীকৃত হবে ?
এবার দ্বিতীয় আরেকটি সেমিনারের কথা উল্লেখ করি। বিষয়বস্তু কী ছিল তা আর উল্লেখ করছি না; শুধু এইটুকুই লিখছি, বিদ্যায়তনিক নিরিখে সর্বোচ্চ পদের অধিকারী-জনেরাও সেখানে সভা আলোকিত করেছিলেন। তবে তাঁদের বক্তব্যে প্রস্তাবিত মূল বিষয়ের প্রতি কোনো আনুগত্য ছিল না। অবশ্য দেখা গেল, এক জায়গায় আছে তাঁদের মিল। এলোপাথারি কথা বলায় এবং তথাকথিত ‘ভারতীয়’ ঐতিহ্যের পল্লবগ্রাহী-অনুষঙ্গ চয়নে একং প্রভুশক্তির স্বার্থানুকূল বন্দনা গান রচনায় প্রত্যেকেই সিদ্ধহস্ত। এসব শুনতে শুনতে যদি কেউ ভাবতে থাকেন, কোথায় হারিয়ে গেছে বাঙালির বিদ্যাচর্চা–তাহলে তা হবে অরণ্যে রোদন মাত্রা! যে কথাটি লিখতে চাইছি, তা একটি ভয়াবহ সংকেত: পূর্বে পশ্চিমে-উত্তরে-দক্ষিণে বাঙালি এখন রেনেসাঁস-উত্তর প্রতিসত্যের আবর্তে নিমজ্জিত। ‘বিদ্যাচর্চা’ শব্দটিও যেন অবান্তর কেননা কোথাও কোনো জিজ্ঞাসা নেই, নেই কোনো পরিশীলনও। এককথায় বাঙালির জীবন ও মনন থেকে সত্য নির্বাসিত বলেই প্রতিসত্য বা কাউন্টার নিজ ট্রুথ-এর কবলে পড়েছে সব কিছু।
৩
অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের সহজ শিকার আজকের বাঙালি। তাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বাঘাযতীন-ক্ষুদিরাম বসু এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাঙালির জিহ্বা এখন আর বহন করতে পারে না। আমরাই আমাদের ইতিহাস-পরম্পরা-সংস্কৃতি-জাতিসত্তাকে প্রতি মুহূর্তে সংহার করে চলেছি। কারা কোথায় কী প্রসঙ্গে নিজেদের সীমাহীম অন্তঃসারশূন্যতা ব্যক্ত করে চলেছেন, সেসব নিয়ে কোনো উপাদেয় রম্যকথা পরিবেশন এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়। এতদিন পূজার ছলে ভুলে থাকাই ছিল আমাদের রেওয়াজ। কিন্তু আসন্ন নববর্ষ এবং পয়লা বৈশাখে পালনীয় কৃত্যের কথা ভাবতে ভাবতে স্পষ্টই বুঝিতে পারছি, আমরা নামে- মাত্র বাঙালি হয়ে নিজেদের জাতিসত্তা এবং অস্তিত্বের সমস্ত তাৎপর্য পথের পাশেই ফেলে এসেছি। আমাদের রক্তের মধ্যেই মিশে গেছে ঔপনিবেশিক কায়দা ও কানুনের অনুসৃতি। তাই আমরা জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করি না, হইহুল্লোড়-সহ দু’শ মজা ‘সেলিব্রেট’ করি। ইংরেজি কেতায় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় হ্যাপি নিউ ইয়ার করি ডিজে বাজিয়ে, বাজি ফোটানোর তাণ্ডব করে।
পয়লা বৈশাখ কখন আসে বৈশাখ কখন যায়, মাথাই ঘামাই না ! জন্মদিন আর সূর্যোদয়ের পরে শুরু হয় না, রাত ১২টায় কেক কেটে চিল-চিৎকারে পালন করি। গায়ে হলুদ আর হয় না বাঙালির; ‘হলদি’ ও ‘মেহেন্দি’ অনুষ্ঠানে প্রগলভতার উদ্দাম প্রদর্শনী করাটাই বিধি এখন। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের শেকড়ে কুড়ুলের ঘা দিয়ে প্রাক্-বিবাহ বেলেল্লাপনার প্রদর্শনী করে আধুনিকতার পরাকাষ্ঠা দেখাই। বাঙালিয়ানা সবাই মিলে সমাধিস্থ করি বলে কিশোর-কিশোরী প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া এখন তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে পাল্লা দেয়। একবারের জন্যেও খড়কুটোর মতো স্রোতে ভেসে যাওয়া জনেরা কি ভাবে: পোশাক-আশাক, আচার-ব্যবহার, খাদ্যপ্রণালী, ভাষা ব্যবহার, সংস্কৃতি-চেতনার নিরিখে কোথাও কি রয়েছে বাঙালিত্বের অবশেষ ? তাই বঙ্গাব্দ কবে কখন কোন রাজা বা নবাবের আমলে শুরু হয়েছে, এই নিয়ে বিতর্ক নিষ্ফল। বিদ্যায়তনিক কৌতূহলে প্রয়োজনীয় বইপত্র ঘেঁটে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারি নিশ্চয়। কিন্তু তাতে কি সাম্প্রতিক কালের আত্ম-সমর্পণ অস্বীকৃত হবে?
‘আগস্ট আবছায়া’ নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ কথাকার মাসরুর আরেফিন যতই আখ্যান লিখুন, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট বা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কি সমবেত আত্মহননঘনিত আত্মগ্লানির নির্মম সত্য এড়িয়ে যেতে পারবে ? আর, সবশেষে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বাঙালিত্বকে পুনঃ-পাকিস্তানীকরণের গিলোটিনে সঁপে দিয়ে যা প্রমাণিত হলো, আরব ও বঙ্গোপসাগরের সমস্ত জল দিয়েও কি বাচণীয় ইতিহাস-হননের দায় মুছে ফেলা যাবে ? আসলে সমস্ত বাঙালি-বসতিতেই বারবার প্রমাণিত হয়েছে বাংলাভাষীরা আর যাই হোক; বাঙালি হতে শেখেনি। বিপুল উম্মাদনায় তারা হিন্দু হয়েছে, মুসুলমান হয়েছে, কেউ কেউ খ্রিস্টানও হয়েছে কিংবা বৌদ্ধ; কিন্তু বাঙালি হয়নি। ২০২৪-এর আগস্ট এবং আবছায়ায় আচ্ছন্ন পরবর্তী দিনগুলি প্রমাণ করেছে, ধর্মান্ধতার কাছে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার কোনো তাৎপর্য নেই। বর্তমান থেকে তাদের পাড়ি ভবিষ্যৎ-এ নয়; নিরন্ধ অন্ধকারে আচ্ছন্ন অতীতের অচলায়তনে। বর্তমান খণ্ডিত ভারতরাষ্ট্রের পশ্চিমবঙ্গে, উত্তরপূর্বের প্রতিটি বাঙালির বসতির হনুমান ভক্তির রমরমা বুঝিয়ে দিচ্ছে, হিন্দি – গুজরাটিভাষী আধিপত্যবাসীদের মগজ ধোলাই কার্যক্রম কতটা সফল। এই পরিস্থিতিতে কেউ বাঙালি হতে চায় না আর; বরং জীবনানন্দকে স্মরণ করে লিখতে পারি, কে হায় হৃদম খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।
৪
১৪৩২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ যখন আসন্ন, জাতির দিশানির্দেশক রবীন্দ্রনাথের একটি বহু-আলোচিত অভিভাষণের কথা স্মরণ করছি। ১১৮ বছর আগে অর্থাৎ ১৩১৪ বঙ্গাব্দে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে তিনি সভাপতি হিসেবে যে-বক্তব্য উপস্থাপিত করেছিলেন, তার প্রেক্ষিত অনেকটা ভিন্ন হলেও আজকের সম্পূর্ণ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও আত্মবিস্মৃত বাঙালির প্রতি উদ্দিপনী বার্তা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এই ভাষ্য ‘আত্মশক্তি ও সমূহ’ নামক প্রবন্ধে সংকলিত হয়েছে। আর্যাবর্ত-কেন্দ্রিক ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তির উদ্ধত সন্ত্রাস খণ্ডিত ভারতের বাঙালিরা অবশ্য হিন্দুরাষ্ট্রের অলীক দিবাস্বপ্নে বুঁদ হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে যদিও পাকিস্তানীকরণের দুর্লক্ষণগুলি সর্বত্র প্রকট হয়ে উঠেছে, সংশয়-পীড়িত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ চাই বলেই বুঝে নিতে চাইছি। বাঙালির আত্মপরিচয় সন্ধান কেন এত জরুরি।

মহাজাতি সদন প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে রবীন্দ্রনাথ এই দিক্ দর্শক উচ্চারণ করে ছিলেন; ‘আমরা বাংলা জাতির যে শক্তি প্রতিষ্ঠা করবার সংকল্প করেছি তা সেই রাষ্ট্রশক্তি নয়, যে শক্তি শক্রমিত্র সকলের প্রতি সংশয় কণ্টকিত। জাগ্রত চিত্তকে আহ্বান করি, যার সংস্কারমুক্ত উদার আতিথ্যে মনুষত্বের সর্বাঙ্গীণ মুক্ত অকৃত্রিম সত্যতা লাভ করে।’
জাগ্রত বাঙালি তাদেরই বলব যারা সমাজের মধ্যে উপস্থিত মত-বৈচিত্র্যকে মেনে নেয় এবং সমস্ত অভিমতকেই তাদের যোগ্য-স্থান অধিকার করার সুযোগ দেয়। ধর্মীয় বিভাজনকে প্ররোচিত করে যারা আত্মবিনাশ ত্বরান্বিত করছে, সেইসব অন্তর্ঘাতক শত্রুর বিরুদ্ধে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করলেই প্রকৃত বাঙালি হওয়া সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিভাষণে বলেছেন: ‘আমাদের নিজের ভিতরে যে ভেদবুদ্ধির পাপ আছে তাহাকে নিরস্ত্র করিতে পারিলেই আমরা পরের কৃত উত্তেজনাকে অতিক্রম করিতে নিশ্চয় পারিব।’ হিন্দু-মুসলমানের বিরোধকে স্থায়ী বিরোধে পরিণত করার অপচেষ্টায় যারা স্বৈরতন্ত্রের তল্পিবাহক হচ্ছে, তাদের বাঙালি বলা যায় না কখনো। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে ‘একরাষ্ট্র সম্মিলনের মধ্যে বাঁধিবার জন্য যে ত্যাগ যে সহিষ্ণুতা, যে সতর্কতা ও আত্মদমন আবশ্যক তাহা আমাদিগকে অবলম্বন করিতে হইবে।’ কিন্তু আর্যাবর্ত নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাদখলের রাজনীতিতে ষত্বণত্ব জ্ঞান হারিয়ে দেশভাগের সময় ধর্মতন্ত্র দ্বারা প্ররোচিত ক্ষীণদৃষ্টি বাঙালি হিন্দু-মুসলমান যুক্তবঙ্গ প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়ায়নি। ফলে রাষ্ট্র সম্মিলনের স্বপ্ন আলেয়ায় পরিণত হলো। পরিণামে জাতিসত্তার জন্যে অতলান্ত চোরাবালি তেরি হলো। বাঙালি-সত্ত থেকে চূড়ান্ত বিচ্যুতির মাধ্যমে কেউ কেউ গেলেন হিন্দুয়ানি আঁকড়ে ধরার পথে এবং কেউ কেউ গেলেন উগ্র-পথে। ৭৮ বছর পরে তাই বিষবৃক্ষ মহামহীরুহে পরিণত হয়েছে।
তবুও এবারকার নববর্ষকে আবাহন জামাতে গিয়ে রবীন্দ্রনামের বক্তব্য থেকেই সংকেত নিয়ে লিখব: আবহমান বাংলার অখণ্ড ও অবিভাজ্য সত্তার গভীরে বিরাজমান সামূহিক শক্তির উপলব্ধি যাদের কাছে সত্য হয়ে ওঠে, তারাই প্রকৃত বাঙালি। এই মুহূর্তে বাঙালি-বসতিগুলিতে ও অবসাদের লক্ষণগুলি গুটি বসন্তের মতো প্রকট এবং কুসংস্কার ও অপবিশ্বাশের অচলায়তনে ধর্মান্ধতা দুর্ভেদ্য হলেও নৈরাশ্যের ঔদাসীন্য যেন দুরারোগ্য না হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে এসে বিশেষভাবে প্রকট একটি দুর্লক্ষণের কথা মনে আসছে। বাঙালি-বসতিগুলিতে আর্যাবর্তের হনুমান কখনো পূজ্য দেবতা ছিলেন না। ধর্মভীরু হিন্দুরা অবশ্য সর্বত্র শনি মন্দির প্রতিষ্ঠায় কিংবা শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবে সম্পৃক্ত থেকেই সন্তুষ্ট ছিলেন। অথচ গত কয়েক বছরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন সংলগ্ন অঞ্চলেও দেখতে পাচ্ছি হনুমান মন্দিরের রমরমা। বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরার বিভিন্ন শহরতলি জুড়ে শনি বা শিব বা কালী মন্দিরের পাশে হনুমান মূর্তির সগর্ব অবির্ভাব এমনি এমনি হয়নি। ধর্মান্ধতার মারীবীজ নব্য ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে পরিকল্পিত ভাবে বাঙালি-বসতিগুলিতে সংক্রামিত করে দেওয়া হয়েছে।
বাঙালির আরাধ্য দেবতারা যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, তার সর্বশেষ নমুনা দেখা যাচ্ছে গণেশ চতুর্থী ও রামনবমীর হঠাৎ জনপ্রিয়তায়। এমনকী, পঞ্জিকার মান্য তিথিগুলির তোয়াক্কা না করেও যখন তখন বারোয়ারি পূজার সূচনা করা হচ্ছে। স্বভাবত অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় অন্য ধর্মাবলম্বী জনেরাও সাড়ম্বরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে চলেছেন। ফলে রেনেসাঁসের আলোক দীপ্তি পুরোপুরি নির্বাসিত এখন। আধুনিক সংবিদ, আত্ম প্রতারণায় নিমজ্জিত; যুক্তিবাদ-বিজ্ঞানচেতনা-নারী পরিসরের মর্যাদা, সব কিছুই ভূলুণ্ঠিত যেন। তার মানে, বহু প্রজন্ম ধরে আমাদের আলোকপ্রাপ্ত পূর্বজেরা যা কিছু অর্জন করেছিলেন, বাঙালি জাতি তা নিতান্ত অবহেলায় পথপ্রান্তে ফেলে দিচ্ছে। ফলে তিমির বিনাশের পরিবর্তে বাঙালি হয়ে পড়ছে তিমির বিলাসী।
রেনেসাঁস আমাদের জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসু করেছিল। কিন্তু একুশ শতকের প্রারম্ভিক এক-চতুর্থাংশ পেরিয়ে যেতে যেতে অনুভব করছি আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি এবং বিনা প্রশ্নে সমস্ত আরোপিত ধারণাকে মান্যতা দিয়ে চলেছি। অথচ আধুনিকতার গোত্র লক্ষণই ছিল এই বিনা প্রশ্নে যে কিছুই গ্রহণ করে না সেই প্রকৃত আধুনিক ! উপরন্তু আরেকটি ভয়ানক দুর্লক্ষণ হলো এই যে চৈতন্যদেব–লালন ফকির–পীরদরবেশ-রাম মোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নেতাজি সুভাষচন্দ্র–জীবনানন্দ–বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আক্রান্ত এখন। তাঁদের চরিত্র হনন করার উৎকট আগ্রহ প্রমাণ দিচ্ছে, বাঙালি আর দীপ–পরম্পরায় বিশ্বাসী নয়। ইতিহাস বিকৃতক হচ্ছে বিপুল ঔদ্ধত্যে। জাতিসত্তা-বিনাশক এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি সক্রিয়, তা অনুধাবন না করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। সর্বনাশের এই প্রহর সম্পর্কে ঔদাসীন থেকে নববর্ষকে আবাহন করব কীভাবে।
এতসব সত্ত্বেও খাঁটি বাঙালি বলব তাঁদেরই, চিত্ত যাঁদের জাগ্রত, যাঁরা উদার ও কুসংস্কার মুক্ত এবং যাঁরা পরম্পরার মহৎ স্মৃতি ও ভবিষ্যতের বিপুল সম্ভাবনার মধ্যে সেতু নির্মাণে সক্ষম। সবচেয়ে বড়ো কথা, মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির প্রতি অস্খলিত প্রত্যয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে যাঁরা হিন্দু-মুসলমানে-বর্ণ হিন্দুতে তফশিলিতে বিভাজন প্রত্যাখ্যান করেন তারাই প্রকৃত বাঙালি। তেমন বাঙালিই নির্মাণের চিরস্থায়ী ঋতুতে আস্থা হারান না।
আলোকাভিসারী বাঙালিকে সর্বনেশে অন্ধকারের শিকার করার জন্যে ইদানীং যত চক্রান্তের ফাঁদ তৈরি হয়েছে, এ বিষয়ে যাঁরা সচেতন তাঁদেরই বলছি খাঁটি বাঙালি। বাঙালি জাতি যখন প্রতিকূল রাষ্ট্রশক্তির অভূতপূর্ব চক্রান্তে চরম বিপন্নতার মুখোমুখি, রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ থেকেই সংগ্রহ করব উত্তরণের দিশা। মহাজাতি সদন (আশ্বিন ১৩৪৬) প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি এই দিক্ দর্শক উচ্চারণ করে ছিলেন; ‘আমরা বাংলা জাতির যে শক্তি প্রতিষ্ঠা করবার সংকল্প করেছি তা সেই রাষ্ট্রশক্তি নয়, যে শক্তি শক্রমিত্র সকলের প্রতি সংশয় কণ্টকিত। জাগ্রত চিত্তকে আহ্বান করি, যার সংস্কারমুক্ত উদার আতিথ্যে মনুষত্বের সর্বাঙ্গীণ মুক্ত অকৃত্রিম সত্যতা লাভ করে।’
এবারকার পয়লা বৈশাখ সেই অকৃত্রিম ‘সততা’কে প্রতিষ্ঠিত করুক ‘কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন।’
এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us





