- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ৩০, ২০২৬
প্রশাসনিক সংস্কারের গতি বাড়াতে শীর্ষ আমলাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ম্যারাথন বৈঠক, মন্ত্রিসভায় রদবদলের জল্পনা
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর রূপরেখাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ আমলাদেরকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর দফতর, ‘সেবাতীর্থ’-এ আয়োজিত এ বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত মন্ত্রকের সচিব। বৈঠককে ঘিরে কেবল প্রশাসনিক মহলেই নয়, রাজনৈতিক মহলেও তৈরি হয়েছে জোর জল্পনা। কারণ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য ‘বড়ো মাপের’ রদবদল নিয়ে যখন বিজেপির অন্দরেই নানা জল্পনা চলছে, ঠিক সে সময় সচিবদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বৈঠককে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, বিশেষ এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য প্রশাসনিক সংস্কারের গতি বাড়ানো। তৃতীয় দফার সরকারে প্রধানমন্ত্রী যে সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তা ইতিমধ্যেই একাধিক বার স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের অন্দরে ‘সংস্কার এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত একটি দ্রুত সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে। মঙ্গলবারের বৈঠক এই কর্মসূচিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে মনে করা হচ্ছে। আরও জানা যাচ্ছে, বৈঠকের আগে ক্যাবিনেট সচিবালয় থেকে সমস্ত মন্ত্রকের সচিবদের কাছে বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মূলত তিনটি বিষয়ে তাঁদের মতামত জানতে চান। প্রথমত, ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজ করার পথে কোথায় কোথায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার আনা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, আত্মনির্ভর ভারত কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে প্রতিটি মন্ত্রক কী করেছে, আগামী দিনে কী করতে পারে, তা জানাতে হবে। তৃতীয়ত, নিজেদের মন্ত্রকের বাইরে অন্য মন্ত্রক বা সরকারি ব্যবস্থার কোথায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন, সে সম্পর্কেও তাঁরা মতামত দিতে পারবেন। সরকারি সূত্রের দাবি, সচিবদের কাছে মূল বার্তাই হল— প্রথমে বলতে হবে, ‘আমি কী করেছি’ অথবা ‘আমি কী করতে পারি’। তারপর বলা যেতে পারে, ‘অন্যরা কী করতে পারেন।’ অর্থাৎ আত্মসমালোচনা ও পারস্পরিক পরামর্শ; দু–দিকই গুরুত্ব পাবে এ বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য রাখার জন্য প্রত্যেক সচিবকে দেওয়া হবে মাত্র তিন মিনিট। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদের নিজেদের মন্ত্রকের কাজ, সংস্কারের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরতে হবে। সে কারণে সোমবারই বিভিন্ন মন্ত্রকের সচিবেরা তাঁদের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন। নির্দেশ দেওয়া হয়, দ্রুত আলোচনায় বসে সম্ভাব্য সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরি করে বিকেলের মধ্যেই সচিবদের হাতে তুলে দিতে। যে তথ্যের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের বক্তব্য জানাবেন তাঁরা।
মঙ্গলবারের বৈঠকে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডিরেগুলেশনও বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই এ লক্ষ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। প্রাক্তন ক্যাবিনেট সচিব ও নীতি আয়োগের সদস্য রাজীব গৌবার নেতৃত্বে গঠিত ‘হাই-লেভেল কমিটি অন নন-ফিনান্সিয়াল রেগুলেটরি রিফর্মস’ বিভিন্ন খাতের আইন, লাইসেন্স, শংসাপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে আধুনিক, নমনীয় ও আস্থাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির সুপারিশ করছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের বিশেষ সচিব এবং বিহার ক্যাডারের আইএএস অফিসার কে কে পাঠকের নেতৃত্বে গঠিত ‘টাস্ক ফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স রিডাকশন’ কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই স্তরেই অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমিয়ে বিনিয়োগ, প্রশাসনিক পরিষেবাকে আরও সহজ করার কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কয়েক জন নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সচিবকে বিভিন্ন রাজ্যের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে, যাতে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গেও সমন্বয় রেখে সংস্কারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
গত দুই মাসেরও কম সময়ে শীর্ষ আমলাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এটি দ্বিতীয় বৃহৎ বৈঠক। এর আগে গত ২১ মে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ও কেন্দ্রীয় সচিবদের যৌথ বৈঠকে ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যপূরণে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সে সময় তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা দেরি চলবে না, কোনো ফাইল অকারণে আটকে রাখা যাবে না এবং প্রশাসনকে আরও গতিশীল ও জনমুখী করে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। আগের বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নও করা হয়েছিল। যেসব মন্ত্রকের ‘পারফরম্যান্স’ তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল না, তাদের প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ফলে মঙ্গলবারের বৈঠকেও বিভিন্ন মন্ত্রকের কাজের অগ্রগতি ও সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতেই নতুন করে জোরালো হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদলের জল্পনা। সরকারের অন্দরেই একাংশের ধারণা, সচিবদের কাছ থেকে সরাসরি বিভিন্ন মন্ত্রকের কাজের রিপোর্ট শোনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কার্যত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাজেরও মূল্যায়ন করতে চাইছেন। সে মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভার রদবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অন্যদিকে কেন্দ্র সরকারেরই আর একাংশ মনে করছে, সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগে বড়ো ধরনের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বা রদবদলের সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। তাঁদের যুক্তি, হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত। আপাতত বিজেপির সাংগঠনিক রদবদলের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করাই দলের অগ্রাধিকার হতে পারে। তার পর সংসদের বাদল অধিবেশন শেষ হলে আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, ২১ মে-র বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পাঁচ দেশের বিদেশ সফর সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ওই বৈঠকে বিদেশমন্ত্রী সফরের কূটনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, গত ১২ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ এবং সাফল্য আরও সক্রিয়ভাবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে জনসংযোগ বৃদ্ধি করতে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মঙ্গলবারের বৈঠক নিছক ‘রুটিন’ পর্যালোচনা নয়। সরকারের সংস্কার কর্মসূচির পরবর্তী পর্যায়ের রূপরেখা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর কৌশল, নীতি বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস— সব মিলিয়ে এ বৈঠক থেকেই আগামী কয়েক মাসের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অগ্রাধিকারের স্পষ্ট ছবি উঠে আসতে পারে।
❤ Support Us





