Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫

ভোটমুখী সময়ে ফের তৎপর ইডি-সিবিআই! শুধু বিরোধী রাজ্যেই কেন সক্রিয়তা? উঠছে প্রশ্ন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভোটমুখী সময়ে ফের তৎপর ইডি-সিবিআই! শুধু বিরোধী রাজ্যেই কেন সক্রিয়তা? উঠছে প্রশ্ন

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ও ইডির অভিযান কি শুধুই দুর্নীতির অনুসন্ধান? না কি এর আড়ালে রয়েছে রাজনৈতিক কৌশল? অ-বিজেপি রাজ্যগুলিতে লাগাতার অভিযান ও সেখানকার শাসক ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের তলব ঘিরে নতুন করে এ প্রশ্নই মাথাচারা দিয়ে উঠছে রাজনৈতিক মহলে। গত কয়েক মাসে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির একের পর এক অভিযান লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি প্যাটার্ন— সবকটিই চালানো হয়েছে অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের নেতামন্ত্রী, ঘনিষ্ট, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভুপেস বাঘেল ও তাঁর পরিবার, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল ও প্রাক্তন আপ মন্ত্রী মণিশ সিসোদিয়া, ডিমএমকে প্রধান স্ট্যালিন সহ একাধিক হেভিওয়েটরা ইডি-সিবিআইয়ের পদক্ষেপের সম্মুখীন হয়েছেন। অন্যদিকে, বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কোনো তদন্ত, তল্লাশি বা গ্রেফতারের খবর নেই।

বিহারে আরজেডি নেতা লালু প্রসাদ যাদবের পরিবারের বিরুদ্ধে ‘ল্যান্ড ফর জব’ মামলায় সিবিআই ও ইডি বারবার তৎপর হয়েছে। কারাবাসে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন প্রবীণ নেতা লালু। সম্প্রতি ভোটমুখী বিহারে ‘মাই বহিন মান যোজনা’-’ ঘিরেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এক মহিলার অভিযোগ, ২৫০০ টাকা পাওয়ার আবেদন করতে গিয়ে তাঁর থেকে ২০০ টাকা প্রতারণা করে নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন তেজস্বী যাদব, কংগ্রেস নেতা মাসকুর উসমানি-সহ একাধিক বিরোধী নেতা। অভিযোগ, এ প্রকল্পের আড়ালে মহিলাদের ব্যাঙ্ক, আধার ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছে। ‘মাই বহিন মান যোজনা’ কংগ্রেস ঘোষিত একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। এখানে উপযুক্ত মহিলাদের মাসে ২,৫০০ করে দেওয়া হয়, স্বনির্ভরতা ও সামাজিক অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতেই এই প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গে গরু পাচার, কয়লা কেলেঙ্কারি, শিক্ষক নিয়োগ ও রেশন দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার সক্রিয় হয়েছে ইডি তল্লাশি। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অনুব্রত মণ্ডল-সহ একাধিক নেতামন্ত্রীকে জেলে যেতে হয়েছে। বারবার শমন পেয়েছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রাজস্থানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটের ভাইয়ের বাড়িতে সিবিআই হানা দিয়েছে, সার কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে । মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখের বিরুদ্ধে মুম্বই পুলিশের ঘুষ আদায়ের অভিযোগ, কেরলে সিপিএম পরিচালিত একটি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে ৩১২ কোটি টাকার প্রতারণা মামলা সহ একাধিক ইস্যুতে অতি সক্রিয় হতে দেখা গেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে। অথচ কর্ণাটকে বিজেপি শাসনের সময় ৪০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ ওঠে সরকারি কাজে। ঠিকাদার সংগঠন, স্কুল পরিদর্শন সংস্থা একাধিকবার মুখ খোলার পরেও কেন্দ্রীয় কোনো সংস্থা সেই অভিযোগে তদন্ত করেনি। বিহারে নীতিশ কুমারের সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ ঠাণ্ডাঘরে বন্দী, মেঘালয়ে বিজেপি-রই সহ-সভাপতি বার্নার্ড এন মারাক পতিতালয় চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হন, পালিয়ে থাকার পর ধরা পড়েন উত্তরপ্রদেশে। কেন্দ্রীয় সংস্থার নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বিরোধীরা। একই অভিযোগ যোগী শাসিত উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রেও। ইডি-সিবিআইয়ের সাম্প্রতিক তৎপরতায় বিরোধী নেতাদের প্রশ্ন—‘ ভোট আবহে এসব তদন্ত না কি রাজনৈতিক চাপ দেওয়ার কৌশল?’

গতকাল দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ইডির দফতর থেকে ছাড়া পান তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ, অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী। বেআইনি বেটিং অ্যাপ কাণ্ডে সোমবার দিল্লিতে হাজিরা দেন যাদবপুরের প্রাক্তন সাংসদ। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী ও একাধিক নথি। তবে ইডি দফতর থেকে বেরিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি নি তিনি। অভিযোগ, একাধিক অনলাইন বেটিং অ্যাপের প্রচারে নামী তারকাদের ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলি কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনে যুক্ত। কর ফাঁকি তো বটেই, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে এই অ্যাপগুলির বিরুদ্ধে। সেই মামলার তদন্তেই মিমিকে তলব করে ইডি। মিমি ছাড়াও টলিউড অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরাকে এই মামলায় দ্বিতীয়বারের জন্য তলব করেছে ইডি। মঙ্গলবার সকালে দিল্লিতে হাজিরা দিতে হবে তাঁকে। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর কর্নাটকে তাঁকে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এবার ডাক পড়ল দিল্লিতে। একই মামলায় বলিউড অভিনেত্রী উর্বশী রৌতেলাকেও তলব করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাঁরও হাজিরা দেওয়ার কথা। তা ছাড়াও ডাক পেয়েছেন অভিনেতা সনু সুদ, প্রাক্তন ক্রিকেটার রবিন উত্থাপ্পা ও যুবরাজ সিং-ও।

এর আগে, বেআইনি বেটিং অ্যাপের মামলায় ইতিমধ্যেই ইডি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ান এবং সুরেশ রায়নাকে। জানা গিয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় অ্যাপ কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কীভাবে অর্থ লেনদেন হয়েছিল এবং কর সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা তাঁরা পালন করেছিলেন কি না — সে সব নিয়েই চলেছে জেরা। এই মামলায় মোট ২৯ জনের নাম রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণী অভিনেতা রানা ডগ্গুবতী, কপিল শর্মা, বিজয় দেবরাকোন্ডা সহ একাধিক চেনা মুখ। প্রশ্ন উঠছে, প্রচারের বিনিময়ে তারকারা যদি মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁরা কি আদৌ কর দিয়েছেন?

এদিকে, মিমি-অঙ্কুশ-উর্বশী সহ একাধিক তারকার উপর যখন ইডির কড়া নজর, তখন নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় একধাপ এগোলেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত আরো একটি মামলায় তাঁকে জামিন দিল সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত। ৯০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে জামিন মঞ্জুর হলেও আপাতত মুক্তি মিলছে না পার্থর। কারণ, এসএসসি নিয়োগ ও প্রাথমিক নিয়োগ— দুই মামলাতেই তিনি এখনো সিবিআই হেফাজতে। সোমবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালতে হাজির ছিলেন পার্থ। তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, হাইকোর্টে প্রাথমিক মামলার শুনানিও হয়েছে সোমবার। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ রায়দান স্থগিত রেখেছেন। সে রায়ের উপরেই নির্ভর করছে তাঁর মুক্তির বিষয়টি।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের জুলাইয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দক্ষিণ কলকাতার নাকতলার বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। তার পরের পর্বে টালিগঞ্জের ‘ডায়মন্ড সিটি’ এবং বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা নগদ এবং সোনাদানা, বিদেশি মুদ্রা-সহ সম্পত্তির পাহাড়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির পরিমাণ ছিল অন্তত ৬০ কোটি টাকারও বেশি। পার্থের ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কেও গ্রেফতার করে ইডি। পরে সিবিআই-ও এই মামলায় নাম লেখায়। একে একে গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি, নবম-দশম শ্রেণির নিয়োগ থেকে প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ — সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতির অভিযোগে নাম জড়ায় প্রাক্তন মন্ত্রীর। প্রাথমিক নিয়োগ মামলায় সিবিআই গত ডিসেম্বরে চার্জশিট জমা দেয়। সেই তালিকায় ছিল অয়ন শীল, সন্তু গঙ্গোপাধ্যায় এবং পার্থের জামাই কল্যাণময় ভট্টাচার্যের নাম। পরে কল্যাণময় রাজসাক্ষী হয়ে গেলে অভিযুক্তদের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যায় তাঁর। পার্থের আইনজীবীরা প্রশ্ন আদালতে তুলেছেন, একই মামলায় যখন অনেকে জামিন পেয়ে বাইরে, তখন কেন পার্থকে আটকে রাখা হচ্ছে? সোমবার হাইকোর্টে সেই শুনানির পর রায়দানে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, প্রাথমিক মামলায় জামিন পেলেই জেল থেকে মুক্তি মিলতে পারে পার্থর। তবে এও ঠিক, এই মামলায় এখনও অনেক কিছু বিচারাধীন। ফলে চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত মুক্তি কার্যত অনিশ্চিত।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!