Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ৪, ২০২৬

১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার গরমিল! ‘সেবি’-র নিশানায় স্বর্ণ রফতানিকারক রাজেশ এক্সপোর্টস, উদ্বেগে বিনিয়োগকারীরা, চাপে এলআইসিও

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার গরমিল! ‘সেবি’-র নিশানায় স্বর্ণ রফতানিকারক রাজেশ এক্সপোর্টস, উদ্বেগে বিনিয়োগকারীরা, চাপে এলআইসিও

ভারতের স্বর্ণ রফতানি শিল্পে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম রাজেশ এক্সপোর্টস। বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক এ সংস্থা শুধু দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ পরিশোধনকারী  গয়না প্রস্তুতকারক হিসেবেই নয়আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের উপস্থিতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সে সংস্থাকেই ঘিরে এ বার সামনে এল এমন এক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগযার অঙ্ক শুনে বিস্মিত আর্থিক মহল। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি’-র দাবিসংস্থার হিসাবপত্রে প্রায় ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার গরমিলের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই রাজেশ এক্সপোর্টস এবং সংস্থার প্রোমোটার-চেয়ারম্যান রাজেশ মেহতার বিরুদ্ধে কড়া অন্তর্বর্তিকালীন পদক্ষেপ করেছে সেবি

গত ৩ জুন জারি হওয়া এক নির্দেশে রাজেশ মেহতা এবং রাজেশ এক্সপোর্টসকে আপাতত শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেবি’-র অভিযোগ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত টানা ৫ বছর ধরে সংস্থার আর্থিক বিবরণীতে বিপুল মাত্রার অসঙ্গতি আর তথ্য বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে। তদন্তকারীদের দাবিযে রাজস্বের হিসাব সংস্থা প্রকাশ করেছেতার সিংহভাগেরই বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেবি’-র অন্তর্বর্তিকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ বছরে রাজেশ এক্সপোর্টস মোট প্রায় ১৫.৩৪ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব দেখিয়েছে। কিন্তু ওই হিসাবের ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে। তদন্তকারীদের অনুমানপ্রকৃত গরমিলের পরিমাণ প্রায় ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকা। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতেএ অঙ্ক এতটাই বিশাল যে বিশ্বের বহু দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের সঙ্গেও তার তুলনা করা যায়।

তদন্তে উঠে এসেছেসংস্থার প্রকাশিত রাজস্বের অধিকাংশই বিদেশে অবস্থিত সহযোগী সংস্থাগুলির মাধ্যমে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছিল। বিশেষ করে সুইৎজারল্যান্ড-ভিত্তিক স্বর্ণ শোধনাগার ভ্যালক্যাম্বি এসএর নাম বার বার উঠে এসেছে। বহু বছর আগে ওই সংস্থাটি অধিগ্রহণ করেছিল রাজেশ এক্সপোর্টস। কিন্তু ফরেনসিক অডিটে দেখা গিয়েছেসহযোগী সংস্থাগুলির নথিপত্র এবং মূল সংস্থার প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য রয়েছে। সেবির দাবিযে পরিমাণ বিক্রির হিসাব দেখানো হয়েছেতার বড়ো অংশের যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। রাজেশ এক্সপোর্টসের এক শেয়ারহোল্ডার সেবি’-র কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। অভিযোগে বলা হয়েছিলসংস্থার বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পাওনা দীর্ঘ সময় ধরে আদায় হয়নি। সেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকেই সন্দেহের সূত্রপাত। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে সেবি। পরে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। সংস্থার হিসাবপত্র খতিয়ে দেখতে নিয়োগ করা হয় আন্তর্জাতিক ফরেনসিক অডিট সংস্থা বিডিও-কে।  

তদন্ত চলাকালীন আরও কিছু বিষয় সামনে আসে। সেবি’-র অভিযোগঅডিটরদের চাওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি সময়মতো জমা দেয়নি সংস্থা। গ্রাহক সংক্রান্ত তথ্যসরবরাহকারীদের বিবরণবিদেশি সহযোগী সংস্থাগুলির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি— অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তকারীরা প্রয়োজনীয় তথ্য পাননি। ফলে অসম্পূর্ণ নথির ভিত্তিতেই তদন্ত এগোতে হয়েছে। শুধু রাজস্বের হিসাব নয়আফ্রিকার সোনার খনি প্রকল্পে সংস্থার ১,০৩৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।  তদন্তকারীদের দাবিওই বিনিয়োগের অস্তিত্ব ও মূল্য নির্ধারণের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে পারেনি সংস্থা। এ ছাড়াও অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার্স অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুল অঙ্কের লেনদেন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজেশ এক্সপোর্টসের হিসাব অনুযায়ীওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১১,৪৮৭ কোটি টাকার বিক্রি এবং ১১,৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয়ের লেনদেন হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে অ্যাফ্লুয়েন্স এ সংস্থার সাথে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথাই অস্বীকার করেছে। তাদের দাবিরাজেশ এক্সপোর্টস কখনো তাদের গ্রাহক ছিল না, উল্লিখিত লেনদেনের কোনো রেকর্ডও তাদের কাছে নেই।

সেবি’-র রিপোর্টে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবিরাজেশ এক্সপোর্টসের তহবিলের একটি অংশ রাজেশ মেহতার সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে সে অর্থ ব্যক্তিগত ডেরিভেটিভ ট্রেডিং’-এ ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ।  তদন্তকারীরা অন্তত ৭.৪ কোটি টাকার এমন একটি লেনদেনের উল্লেখ করেছেনযা নাকি সংস্থার পরিচালন পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এলআইসিকে ঘিরে। রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা সংস্থাটির হাতে রাজেশ এক্সপোর্টসের প্রায় ১০.৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ফলে সংস্থাটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অভিঘাত শুধু শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়পরোক্ষ ভাবে লক্ষ লক্ষ বিমা গ্রাহকের স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সেবি’-র প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ীসম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১২,৭২৬ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

যদিও সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে রাজেশ এক্সপোর্টস। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছেতাদের প্রকাশিত রাজস্বের হিসাব সম্পূর্ণ সঠিক। কোনো ধরনের অতিরঞ্জন বা তথ্য গোপনের ঘটনা ঘটেনি। বরং সেবি এবং সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি ও তথ্য ব্যাখ্যার বিভ্রান্তি থেকেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। সংস্থার বক্তব্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত নথি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে, ব্যবসায়ী মহলে গুঞ্জন, এই বিতর্ক সামনে আসার আগেই আর্থিক চাপে ছিল রাজেশ এক্সপোর্টস। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার জেরে কানারা ব্যাঙ্ক সংস্থার ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ব্যাঙ্কটির কাছে সংস্থার বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫০৯ কোটি টাকা।

এদিন, রাজেশ এক্সপোর্ট-এর খবর সামনে আসতেই শেয়ার বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতেই রাজেশ এক্সপোর্টসের শেয়ারদর প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। শুধু তা-ই নয়গত তিন বছরে সংস্থার শেয়ারের মূল্য ৮০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।  তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। সেবির নির্দেশও আপাতত অন্তর্বর্তিকালীন। রাজেশ এক্সপোর্টস এবং রাজেশ মেহতার সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগগুলির একাংশও যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়তা হলে ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে এই মামলার নাম লেখা হতে পারে। একই সঙ্গে কর্পোরেট স্বচ্ছতানিরীক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে দেশের আর্থিক পরিকাঠামো।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!