- খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- মার্চ ৩১, ২০২৫
আরবি স্যার
যে স্কুলে পাক্কা তেত্রিশ বছরকাল চাকরি করে অবসর নিয়েছি, সে স্কুলে আমার শিক্ষকতা-জীবনের সময়সীমায় চতুর্থ প্রিন্সিপাল ছিলেন ফখরুজ্জামান স্যার। তিনি আরবি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে আরবি স্যার বলে ডাকত। ইংরেজি ভাষার ব্যাকরণ খুব ভালো জানতেন। নাইন-টেনের ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি পড়িয়ে তিনি খুব আরাম পেতেন।এফ জেড স্যারের কথা মনে পড়লে, তাঁর সই, হাতের লেখার স্টাইল সবকিছুই স্মৃতিপথের মোড়ে এসে ভিড় করে । অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মুসলিম এফ জেড স্যার জোহরের নামাজ বলে স্কুলের টিউবওয়েলের জল নিয়ে ওজু করে প্রিন্সিপাল-রুমের কোণায় রাখা জায়নামাজটা পেড়ে নিচ্ছেন – দৃশ্যটা চোখের ওপর ভেসে উঠল। খুব একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন না এফ জেড স্যার, যেমনটা থাকতেন না আমাদের বিশ্বজ্যোতি স্যারও। এফ জেড যখন প্রিন্সিপাল, আমাদের অনুজপ্রতিম শংকর দেব তখন, ফুল ফর্মে । এফ জেড তার স্কুলজীবনের মাস্টারমশাই, সে সূত্রে সে স্যারের আদর কাড়তে উন্মুখ থাকত।
শংকর দেব, মর্নিং প্রেয়ারের বেশ একটু পরেই স্কুলে ঢুকল । ঢুকেই সোজা এফ জেড স্যারের রাগের মুখোমুখি। ‘দেরি কেন বা ?’ প্রশ্নটি করার সুযোগ না দিয়ে, শংকর অম্লানবদনে বলল, ‘ আজকে স্যার, সইত্য কইরাম ( পাঠক, খেয়াল রাখবেন, এর মানে তো দাঁড়াল যে অন্য অন্য দিন সে অসত্য বলেছে) আজকে তো আপনার লাগিয়াউ দেরি !!’ ‘মানে ? মানে ?’ উপস্থিত সবাই উত্তেজিত। এর মানে কী ? শংকর সোজা এফ জেড স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আমি তো ঠিক সময়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। কিন্ত বাজারের তিনমুখীর সামনে এসে দেখি সবাই আপনারে গালিরা।অখন, ইটা তো আমার দায় স্যার আপনার ইস্কুলোর মাস্টার হিসাবে আর আপনার এক্স স্টুডেন্ট হিসাবে আপনার পক্ষ লইয়া কথা বলা। আমি তাই করলাম
সে এফ জেড এবং বিশ্বজ্যোতি দুজনের কাছেই প্রস্তাব পেশ করল, তার হাতে কামলা মানুষ আছে। দুজনেরই কাপড়ের মালিন্য অতি তৎপরতায় মুছে দেবে।এফ জেড স্যারকে তার পারিশ্রমিক কিঞ্চিত বেশি দিতে হবে । এক টাকা হলেও বেশি । আফটার অল, প্রিন্সিপাল বলে কথা ! দুই স্যারই প্রস্তাব শুনে, ‘যাও বা, তোমার পাগলামি ছাড়ো’ বলে হাস্যমুখরতা দিয়ে শংকর নামক বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেন। এরপর শংকর আরেক কাণ্ড ঘটালো। সে স্কুলে আসতে দেরি করতে শুরু করল। জিজ্ঞেস করলেই নানা অজুহাত দেখায়। আজ এই তো কাল ওই। টিফিনের সময় ম্যাডামরা জিজ্ঞেস করলে তাদের বোঝায় : ‘ দিদি, আমার হাত আসলে তিনটা। ডানহাত, বাঁহাত আর অজুহাত। ‘ দিদিমণিরা রেগে যান।দিনচারেক পরে শংকর, মর্নিং প্রেয়ারের বেশ একটু পরে স্কুলে ঢুকল । ঢুকেই সোজা এফ জেড স্যারের রাগের মুখোমুখি। ‘দেরি কেন বা ?’ প্রশ্নটি করার সুযোগ না দিয়ে, শংকর অম্লানবদনে বলল, ‘ আজকে স্যার, সইত্য কইরাম ( পাঠক, খেয়াল রাখবেন, এর মানে তো দাঁড়াল যে অন্য অন্য দিন সে অসত্য বলেছে) আজকে তো আপনার লাগিয়াউ দেরি !!’ ‘মানে ? মানে ?’ উপস্থিত সবাই উত্তেজিত। এর মানে কী ? শংকর কাউকে পরোয়া না করে , সোজা এফ জেড স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আমি তো ঠিক সময়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। বাজারের তিনমুখীর সামনে এসে দেখি ভিড় । কী ? শুনলাম, সবাই আপনারে গালিরা। বদনাম কররা, আপনি নাকি স্কুল চালাতে পারছেন না। অখন, ইটা তো আমার দায় স্যার আপনার ইস্কুলোর মাস্টার হিসাবে আর আপনার এক্স স্টুডেন্ট হিসাবে আপনার পক্ষ লইয়া কথা বলা। আমি তো তাই করলাম। এতগুলা লোক। এতজনরে বুঝাইতে সময় লাগব না ? আজকে স্যার আপনার নাম বাঁচাতে দেরি হয়ে গেল। ‘এফ জেড স্যার কোথায় রেগে যাবেন, তা না করে আমার দিকে তাকিয়ে, চোখ পিটপিট করে বললেন, ‘ কী বলব এডিসি স্যার, নিজের ছাত্র। গালি দিলে নিজের গায়েই এসে লাগবে। বড় মায়া লাগে। ‘ এই মায়ার জন্যই ।
ফখরুজ্জামান স্যার এক সহপাঠীকে নিয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখলেন ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে। দুজনে দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরলেন।করিমগঞ্জ পৌঁছে, সঙ্গীটি দেখে, ফখরুজ্জামান স্টেশনের বাইরে না গিয়ে সোজা টিকেট কাউন্টারের দিকে যাচ্ছেন। কী ব্যাপার ? দেখা গেল, ফখরুজ্জামান স্যার করিমগঞ্জ টু বদরপুরের সেই দিনের দুটো টিকেট কাটছেন।এর মানে কী ? বাইরে এসে টিকেট ছিঁড়ে ফখরুজ্জামান স্যার সঙ্গীটিকে বললেন, ‘ আল্লাহ্র ঘরে গুনাহ রাখতে নেই। তাই টিকেটের মূল্য রেলকোম্পানিকে ফেরত দিলাম
এফ জেড স্যার মারা যান গলার ক্যানসারে। মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে অসুস্থ বোধ করলেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর এককালীন বন্ধু আবুল হোসেন মজুমদার একটি বৃত্তান্ত লিখেছিলেন। সেটা পড়েই জানতে পেরেছিলাম, এফ জেড আরবি, ফার্সি ও উর্দু তিনটি ভাষাই বেশ ভাল জানতেন। মনটা হায় হায় করে উঠেছিল, কেন আগে এ তথ্য জানিনি ? তাহলে তো উর্দুভাষা অন্তত তাঁর কাছ থেকে শিখে নেওয়া যেত ! ওই লেখা থেকেই ফখরুজ্জামান স্যারের চরিত্রের এক আশ্চর্য দিক জানতে পারি। একবার তিনি এক সহপাঠীকে নিয়ে তাঁর তৎকালীন শিক্ষাস্থান বদরপুর থেকে তৎকালীন বাসস্থান করিমগঞ্জ যাচ্ছেন। স্টেশনে গিয়ে দেখলেন, ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে। দুজনে দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরলেন।করিমগঞ্জ পৌঁছে, সঙ্গীটি দেখে, ফখরুজ্জামান স্টেশনের বাইরে না গিয়ে সোজা টিকেট কাউন্টারের দিকে যাচ্ছেন। কী ব্যাপার ? দেখা গেল, ফখরুজ্জামান স্যার করিমগঞ্জ টু বদরপুরের সেই দিনের দুটো টিকেট কাটছেন।এর মানে কী ? তাদের তো সেদিনই বদরপুর ফেরার কথা নয় ! বাইরে এসে সেই দুটি টিকেট ছিঁড়ে স্যার সঙ্গিকে বললেন, ‘ আল্লাহ্র ঘরে গুনাহ রাখতে নেই। তাই টিকেটের মূল্য রেলকোম্পানিকে ফেরত দিলাম। ‘এখনও চোখের ওপর ভাসছে, এফ জেড স্যারের ফেয়ারওয়েলের দিনে পাশাপাশি বসে ভাত খাচ্ছেন দুই বন্ধু ফখরুজ্জামান ও বিশ্বজ্যোতি স্যার । বিশ্বজ্যোতি জানেন, তাঁর বন্ধু আর বেশিদিন বাঁচবেন না । তখনই খেতে খানিকটা কষ্ট হয়। জানেন বলেই বামুন হয়েও তিনি অন্তরের সব স্পর্শদোষ জয় করেছেন।সেদিন তাঁদের পেছনের সারিতে ওই পংক্তিভোজনে বসে আমার চোখ সে আশ্চর্য শুচিতার স্পর্শে জলে ভরে উঠছে।
এখন লিখতে লিখতে ভাবছি, আমার এ লেখাটার গায়েও যেন সেই স্পর্শদোষহীনতার ছায়া এসে লাগে ! যেন আগামীজন্মেও আমি এঁদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত না হই ।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
লেখক কথা সাহিত্যিক এবং কবি, শিলচরের বাসিন্দা ।
❤ Support Us







