- ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
- জুন ২৫, ২০২৩
দয়াময়
..দিগন্ত ভরে ওঠে সুরে
অংশুমান কর। প্রথমত কবি। দ্বিতীয়ত কবি। তৃতীয়ত সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার সুচিহ্নিত মুখ। এ মুখের আড়ালে আর বাইরে, যেসব উদ্ভাসিত চেহারা আমাদের নজরে আসে, তা তাঁর গল্পে, উপন্যাসে, কখনো কখনো প্রবন্ধে; সেখানেও অংশুমানের স্বাতন্ত্র্য আর ক্ষেত্রমিতি ভাবিয়ে তোলে।
অংশুমান বাঁকুড়ার রুক্ষভূমির সজল সন্তান। গোড়ার দিককার কবিতায় নাগরিক অস্বস্তির পাশাপাশি, যামিনী রায়ের লোকজ সুন্দর, শুষ্ক নিসর্গ, ধূমায়িত, ধূলিধূসরিত জল-হাওয়ার নৃত্য চিনিয়ে দেয় তাঁর অন্যরকম কবিসত্তাকে। এ এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। পরেও, নাগরিক বাক- কৌশল, সংযম আর চিন্তার সংহতিতে ঢাকা পড়েনি তাঁর শিল্পিত রহস্যমগ্নতা।
সম্প্রতি নিজেকে তলিয়ে দেখছেন অংশুমান। অনুচ্চ কন্ঠে। রঞ্জিত, অনুরঞ্জিত করে তুলছেন জন্ম রোমান্টিকের ছায়াবাদী সর্বেশ্বরতাকে (প্যানথেয়িজম), এক্ষেত্রে কি তিনি এমন কোনো ছায়া মানুষ, যিনি রহস্যাবৃত হয়েও অখণ্ড ও অকৈতব আর অতীন্দ্রিয় চেতনার নিবেদিত উপাসক?অংশুমানকে নিয়ে ভাবতে হবে, বলতে হবে যে, পাঠকের ভাবনা-চিন্তায় রসদ জোগাচ্ছে অস্তিত্ববাদের প্রতি তাঁর পরিমিত আসক্তি। এর উৎস কী ? প্রকৃতি না কোনো অধরা, অদৃশ্যের আবহমান অনুমিতি ?
বাহার উদ্দিন
২০.০৬.২০২৩
•১•
গাছের তলায় ধুলোর ওপর পড়ে আছে যা তা তিনি কুড়িয়ে নেন। এরপর তাঁর নজর পড়ে গ্রামের শেষ মাথায় সদ্য তৈরি হওয়া ছ-তলার ফ্ল্যাটটির কার্নিসে। কুড়িয়ে নেন যা পড়ে আছে তার ওপর, তাও। ওই যে পড়ে আছে আরও একটু, পাড়ে ফেলে গেছে নদী। দয়াময় পৌঁছে যান নদীর পাড়ে। পৃথিবীতে যেখানে যেখানে পড়ে আছে বেদনা, দিনের শেষে কুড়িয়ে নেন তিনি। কখনও গাছের, কখনও মানুষের, কখনও নদীর। কান্না কুড়িয়ে কুড়িয়েই তাঁর দিন শেষ হয়। পাতাকুড়ুনিদের দেখে দেখে তিনি শিখেছেন এই কাজ। তিনি দয়াময়, এক কান্নাকুড়ুনি।

•২•
কত মানুষ কাঁদছে। কত মানুষ ধেই ধেই করে নাচ করছে আনন্দে। কত মাইক্রোফোন বাজছে। বাজছে কত মন ও মাধুরী। ওই আমাদের কানাই। আর ওই তো রাই। হরিবোল তলায় আজ দয়াময় সেজেছেন কীর্তন। দূর শহর থেকে আসা পদ্মপলাশের কণ্ঠে।

•৩•
ছোটো প্রাণেদের প্রতি দয়াময়ের পক্ষপাত অপরিসীম। এদের তিনি উপহার দেন অপরিমিত মায়া। এই যেমন জোনাকি। কতটুকু আলো তার? সে এমনকি বাঁশগাছটির জন্য প্রদীপ শিখাও নয়। তবু দয়াময় জোনাকিদের বড়ো আগলে আগলে রাখেন। অমাবস্যার রাতেই বোঝা যায় জোনাকির মূল্য। সহস্র ঝাড়বাতির চেয়েও, নিয়ন আলোর চেয়েও তখন তার ক্ষমতা বেশি। সে তখন সুন্দরের মা, মায়ার জননী।

•৪•
গোলকি, ও বোকা গোলকি, তুমি কি কোনোদিনই গোলপোস্টের ব্যথা বুঝবে না? কে তোমাকে বলেছে একের পর এক শট আটকাতে? গোলকি, বোকা গোলকি, তুমি কি বোঝো না গোলপোস্ট কতদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল আজকের এই বলখেলার জন্য? কতদিন ধরে সে চেয়েছে, ব্ল্যাকহোলের মধ্যে বল ঢুকুক, গোল হোক–বোঝো, না বোঝো না, গোলকি? দয়াময় ভাবেন। বল মানে কি গোলকি? বল হল শক্তি, মানে বীর্য।

•৫•
“বাঁশি বাজো। ঘুমিয়ে পড়ো না তুমি”। দয়াময় বলেন। বলেন, “যাও, খুঁজে নাও সেই ওষ্ঠ যে তোমাকে আদর করবে, বাজাবে ছিদ্রগুলির অপরূপ ব্যবহারে”। বাঁশি বাজে আর দিগন্ত ভরে ওঠে সুরে। যেদিন ওষ্ঠ মেলে না বাঁশির, সেদিনও দয়াময় বলেন, “বাঁশি বাজো, ঘুমিয়ে পড়ো না তুমি। কালঘুম ডেকে আনবে কালনাগিনী। বাজো বাঁশি, বাজো, সুরে ভরিয়ে দাও ছিদ্রগুলি”। বাঁশি নিরুপায়। ওষ্ঠ বিনা বাজে না। তখন পৃথিবীর ছিদ্রগুলিকে বাজান পবনদেব। সুর তুলে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, ঘাসের মধ্যে দিয়ে তিনি বয়ে যান। তিনিই তখন রাধিকার কানু আর দুনিয়ার হরিপ্রসাদ।

•৬•
ইট ভরতি ট্রাক্টর দেখলেই দয়াময় পথচলতি শিশু আর বৃদ্ধদের সতর্ক করে দেন। সূর্য যখন ক্রুদ্ধ দানব, তখন মাথায় হাত বুলিয়ে দেন পুষ্করিণীর। বলেন, “সাবধানে থেকো মা”। কুমুদনাথ যখন কৃষ্ণ অথচ অন্ধ, তখন দয়াময় মৃত্তিকাকে বলেন, “উদ্ধত হয়ো না, নম্র ও শান্ত হও। বর্ষণ ভিক্ষা করো”। আলোকেও তিনি বলেছেন, “অমানিশাকে ভয় করো না, কিন্তু সমীহ করো”। স্পর্ধা আর দু:সাহসের তফাত দয়াময় বোঝেন। তাঁর মনে পড়ে দামাল ছেলেগুলো তাঁর কথা শোনেনি। ফসল নয়, ঘরে তুলেছিল কাটা মুণ্ড।

•৭•
পুরোনো মন্দিরের ভাঙা চাতালের কথা মন দিয়ে শোনেন দয়াময়। শোনেন শ্যামের সেবার রমরমার কথা। ঝড় ও উদযাপনের বৃত্তান্ত। শোনেন এক সময় কত কত পদভারে দলিতমথিত হত ভগ্ন চাতালটির বুক ও নিতম্ব। বিলাপ শোনেন দয়াময়। হা-হুতাশ। সান্ত্বনা দেন না। শুধু নিশ্চিত করেন ধর্মদাস চট্টরাজ যেন অসুস্থ না-হন, যেন শ্যামের সেবায় বাঘ্যাত না-ঘটে, যেন অন্তত একটি পদছাপ রোজ আঁকা হয় ভাঙা চাতালের শ্যাওলায়।
চিত্র: যামিনী রায়
অংশুমান কর : বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির অধ্যাপক। প্রতিষ্ঠিত কবি, গল্পকার , ঔপন্যাসিক।
❤ Support Us








