- ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ২৪, ২০২৩
কবিতার মনোবাসীর খোঁজে।পর্ব ৫
কবিরা নিজের পথ নিজেরাই নির্মাণ করেন
চিত্রকর্ম: সমীর কুন্ঠু
কবির স্বভাব আর কবিতার শিল্পশর্ত কি নিয়ম মানে ? গ্রাহ্য করে অলঙ্কারশাস্ত্রের অনুশাসন ? কে আগে জন্মায় ? অনুভূতি শব্দ, বাক্য? আদিকালের ভাবুকেরা তাঁদের জয়-পরাজয়কে কীভাবে ব্যক্ত করতেন, তা আজ আর অজানা নয়।
কবির অন্তর্জগৎ সমস্ত অবগাহন শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসে যখন, তখনই আমরা তাঁর ভেতরের স্বভাবধর্মে, তাঁর বলার ভঙ্গিতে, শব্দ চয়নে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করে বুঝতে পারি, তাঁর ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে আছে কবিতাময়তা, ছন্দে, ছন্দের বাইরে।
একালের সাহিত্যবাসরে কবির মনস্তত্ব খুঁজে দেখার, তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা আর পরিকল্পিত বিন্যাস নিয়ে জিজ্ঞাসার প্রবণতা খুব একটা নজরে আসে না।ব্যক্তি কখন কবি হয়ে ওঠেন, তাঁর লেখা বা বলার মুহূর্ত কীভাবে ‘কবিতার মুহূর্ত’-র আকার নেয়, লেখার প্রস্তুতিপর্বে কবি কি স্বভাবিকতার বাইরে চলে যান, এসব জানবার আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন সাজিয়ে, আমরা কবিদের দ্বারস্থ হই। কেউ কেউ সরাসরি উত্তর দিয়েছেন, কেউ বা তুলে ধরেছেন তাঁদের রচনামগ্নতা আর আত্মস্থতাকে।
এই কলামে আজ আড্ডা জমালেন বরাক উপত্যকার প্ৰথম সারির কবি মনোতোষ চক্রবর্তী। মনোতোষের শরীর এখন কলকাতার বাসিন্দা, মন পড়ে রয় তাঁর শিলচরে, শিলচর থেকে খানিকটা দূরের এক চা বাগানে।বাস্তব আর পরাবাস্তব তাঁর ছায়াসঙ্গী।
সম্পাদক ।২৪.১২.২০২৩

চিত্রকর্ম: দেব সরকার
বোবা চোখ পেছনে তাকায়
- কবিতার মুহূর্তে কি খুব অস্থির হয়ে ওঠেন ?
না, অস্থিরতা নয়, তন্ময় হয়ে আত্মস্থ হয়ে পড়ি আর আচমকা এক ঘোরের মধ্যে কবিতার মুহূর্তটি আসে।
- ভেবেচিন্তে লেখেন,না স্বতঃস্ফূর্তভাবে ?
স্বত:স্ফূর্ততার সঙ্গে ভাবনা-চিন্তা মিলে মিশে যায়।
- কখনো কি মনে হয়,কেউ আপনাকে ভেতর থেকে লিখিয়ে নেয়, এমন কোনো মনোবাসী ?
লেখা অন্ত:শীল কোনো বোধ বা ভাবনার হঠাৎ ঝলক। কোনো মনোবাসিনীর কৃপা কখনো কখনো কবিতার মুহূর্তটি উপহার দেয় অবশ্য। ভেতর থেকে তাড়না ছাড়া লেখা হয়ে ওঠে না।
- একটানা লেখেন, না থেকে থেকে লিখতে হয় ?
সাধারণত একটানা লেখাই যে-কোনো কবিতার সম্পূর্ণ অবয়ব নির্মাণ করে, কখনো মনে রেশ থেকে যায়, অর্ধসমাপ্ত লেখা ধীরে ধীরে পরে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। কবিতার ঘর-গেরস্থালি কোনো ফর্মুলা মেনে চলেনা, অলৌকিকের, অহৈতুকীর কোন আবছা অন্তরাল থেকে সে ধরা দেয়, কাঁটাছেড়া করে সেটা বুঝতে চাইনা।
- লেখার আগে কি মনে মনে পংক্তি আওড়ান ?
ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখতে পারিনা। হঠাৎ পাওয়া কোনো পংক্তি কবিতা লেখার মন তৈরি করে। কোনো বিশেষ শব্দ, স্মৃতি, কোনো বিশেষ ঘটনা কবিতার মুহূর্তটি রচনা করে দেয়।
- অন্তমিল মধ্যমিল কি কবিতায় ফেরাতে চান ?
অন্ত্যমিল বা মধ্যমিল কোনো আরোপিত টেকনিক নয়। যেভাবে ধরা দেয় গ্রহন করি।
- ছন্দের ওলট-পালট বা ভাঙচুর কতটা পছন্দ ?
ছন্দ নিয়ে ওলোটপালট বা ভাঙচুর কোনো আরোপিত কাজ না হয়ে স্বাভাবিক প্রবণতা হলে আপত্তি নেই। বিষ্ণু দে, অলোকরঞ্জন, বা অমিতাভ গুপ্তের মতো সামর্থ্য এখনকার কজন কবির আছে। কবিরা নিজের পথ নিজেরাই নির্মাণ করেন। পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়,যে কোনো ফর্মের সার্থক লেখাই আলোড়িত করে।
মনোতোষ চক্রবর্তী

চিত্রকর্ম: সমীর কুন্ডু
সূর্যোদয়
আ-হা , আজ কী দেখলাম !
নিজের চেয়ারে বসে দেখা
অপূর্ব সুন্দর এই সূর্যোদয় ,
কেউ নেই পাশে, এই অনুভূতি একাকী আমার
আ-হা কী দেখলাম !
জগৎ সুন্দর জানি, নির্জনতা বয়ে আনে
নীরব নিস্তব্ধ এক পৃথিবীর মায়া ;
ক্ষণে ক্ষণে শুধু পাখি -ডাক,
সূর্য — আরেকটু উপরে উঠে
সুপুরি গাছের নিষ্কম্প সবুজ পাতার আড়ালে
ঢাকা পড়ে গেছে।
আকাশে লালের আভা
রোদ উঠবে
শুধু সেই মেয়েটি তোমাকে
আর বার্তা পাঠাবে না
গ্রহন করে নি যাকে, বর্জনের প্রশ্নই ওঠে না ।

চিত্রকর্ম: সমীর কুন্ডু
সকল মেঘের মন
সকল মেঘের মন তুমি তো পাবে না
ডাইনোসরাসেরা কালো করে রেখেছে আকাশ
ঐ লম্বা গলা, ঐ দীর্ঘ পা, বাকিটা জঙ্গল
প্রাগৈতিহাসিক সে-তো কাছে এসে দূরে চলে গেছে
আর সাড়া পাবে না -তো তার।
নিভে গেছে আকাশের আলো তাই মনে
ঘুটঘুটে কঠিন আঁধার,
তোমার মনকে ঘিরে নাচে ভূত, প্রাচীন কঙ্কাল
স্বপ্ন নিভে গেলে
আরো কতকিছু হয়
সকল মেঘের মন তুমি তো পাবে না।

বোবা
তোমার সুঘ্রাণ আমি পেয়েছি বলে কি
তোমাকে হারাতে হলো,—বোবা পাথরের গায়ে
আছড়ে -পড়া জলের মতন
আকুল আছড়ে পড়ে মন।
স্থির গাছপালা , মূক বনভূমি। স্রোতের গর্জন
গান হয়ে সুর হয়ে বনান্ধকারের দিকে ছুটে যায়,
লুপ্ত হয়, — বাক্যহারা নির্জন নিস্তব্ধ ভূমি
নিজেকে যে খুনী মনে হয় ,
আনমনা মনটি তোমার আজ সতর্ক, সুদূর
লুপ্তকরে প্রশ্রয়ের ছায়াভূমি নিজেকে ধিক্কার দিই
স্রোত,আছড়ে পড়ে,বহে যায়, বনভূমি পার হয়ে যায়
দূর গহনের দিকে চলে যায়,
বোবা দৃষ্টি মেলে
বোবা চোখ পেছনে তাকায়।
♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦
❤ Support Us








