- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ১, ২০২৪
জ্বিনের মোহর
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। তুলে দেখি ছোটচাচা কল করছেন। ধরলাম। ছোটচাচা বললেন, কাজেম মারা গেল রে !
এই রাতদুপুরে কোথাকার কোন কাজেম মারা গেল ! বুঝতে পারলাম না। স্বভাবতই কেমন হকচকিয়ে গেলাম যেন ! কী জিজ্ঞেস করতে কী জিজ্ঞেস করে ফেললাম, কোন কাজেম ?
ছোটচাচা বললেন, বংশে কটা কাজেম আছে ? তারপর একটু থেমে বললেন, সবুজের আব্বা।
আশ্চর্য হলাম না। শুনেছিলাম কাজেম বেশ কিছুদিন যাবৎ হার্টের সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসাও চলছে। সেই ছোটবেলার একটি ঘটনার জন্য আজো তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না। কিছুদিন আগে দেখা হয়েছিল তার বড়ো ছেলে সবুজের সঙ্গে আমার দেখা।
রাস্তায়। আমি স্কুল যাচ্ছিলাম আর সেও কোথাও যাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ কেমন আছিস ? ”
বলেছিল, “ ভালো আছি। ”
“ তোর আব্বা কেমন আছে ? ”
“ এখন ভালো আছে। ”
“ কোন ডাক্তারকে দেখাচ্ছিস ? ”
“ ডাক্তারের নাম জানি না। কলকাতার একটা হাসপাতালে মাসে একবার আব্বাকে নিয়ে যাই। সেখানকার নির্দেশ মতো সব চলছে। ”
“ আর তোর আব্বার কাজকাম ? ”
“ এখন বন্ধ আছে। ডাক্তার বিশ্রামে থাকতে বলেছে। ”
“ তা তুই কোথায় যাচ্ছিস ? ”
“ বাজারে যাব। আব্বার একটা ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, সেটা আনতে। ”
“ সাবধানে থাকিস। ”
সবুজের সঙ্গে কাজেমকে নিয়ে সেই ছিল আমার শেষ কথা।
ছোটচাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, জানাজা ক’টায় হবে ?
ছোটচাচা বললেন, এখনো সময় ঠিক হয়নি। হলে তোকে জানিয়ে দিচ্ছি।
–দুই–
ইতিমধ্যে কাজেম এসে ভিড় করতে শুরু করেছে আমার স্মৃতিতে। সে আমার বড়চাচার ছেলে। আমরা একই বয়সী। আমি লেখাপড়া শিখে চুক্তির মাস্টার হলেও সে রাখাল থেকে রাঁধুনি হয়েছিল। এলাকায় রাঁধুনি হিসেবে বেশ নামও করেছিল।
আমার বড়চাচা মানে কাজেমের আব্বা আমজাদ আলি অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়েও স্বভাব দোষে অবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারেননি। মদ, মেয়েমানুষ, জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন। এসব কারণে কাজেমদের তিন ভাইকে জীবন টিকিয়ে রাখতে নানা ধরণের কাজ করতে হয়েছে। বড়োভাই হাসেম তো রাজমিস্ত্রী ছিল। ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে আর ফিরেই আসেনি। কোথায় কিভাবে লাপাতা হয়ে গিয়েছিল, আজও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। মেজভাই কাসেম গ্রামেই থাকে নিজের ঘরসংসার নিয়ে। যখন যে কাজ পায়, সেই কাজ করে দিন গুজরান করে। ব্যতিক্রমী ছিল কাজেম। ছোঁড়ার স্বপ্ন ছিল কিছু হওয়ার। কিছু হওয়া বলতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া নয়, মানুষ যাতে তাকে মনে রাখে তেমন ক্কিছু হওয়া। তাই সে প্রথমে রাখালী, তারপর মাহিন্দারি, কিছুদিন রাজমিস্ত্রীর কাজ করলেও শেষপর্যন্ত সেসব কোনোটাই ভালো লাগেনি বলে সব ছেড়েছুড়ে সে অন্যকিছু হতে চেয়েছিল। অন্যকিছু বলতে রাঁধুনি। হ্যাঁ, সে এলাকায় বেশ নামকরা রাঁধুনি হয়ে উঠেছিল। এই তো মাস খানেক আগে রামনগরের মন্টু চাচাহঠাৎ আমার কাছে এসে হাজির, “ হ্যাঁ গো-চাছা, তোমারঘের কাজেমের ফোন লম্বরটা দাও তো ! ”
জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ চাছা বিটির বিহা জুড়লেন নাকি ? ”
“ না রে বাপ। তোমার দাদী কাইল ইন্তেকাল কর্যাছে। তারই চাহারুমের কাম আছে। তাই ভাবছি কাজেমকে দিয়েই রাঁধাবাড়াটা করাবো। আমজাদ ভায়ের ছেলেটা নাকি আইজকাইল ভালোই রাঁধাবাড়া করছে। ”
কাজেমের ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল না। তবে সবুজেরটা ছিল। সেটাই মন্টুচাচাকে দিয়েছিলাম।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাকি রাতটুকু আমি ঘুমোতে পারলাম না। ফজরের নামাজের আজান পড়ছে আশপাশের মসজিদ থেকে। তার মানে ভোর হয়ে এল। কিন্তু কাজেমের জানাজা কখন ? ভাবতেই আছি, ছোটচাচার ফোন বেজে উঠল। ধরতেই বললেন, সকাল আটটায় কাজেমের জানাজা। সময় মতো চলে আয়।
মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখলাম, চারটা বেজে পনেরো মিনিট। না আর শুয়ে থাকলে হবে না। আমি বিছানা ছাড়লাম। বউ ঘুমিয়ে আছে। ছেলেও ঘুমোচ্ছে তার নিজের ঘরে। কাউকে কিছু না বলে আমি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম।
ছেলেবেলায় ওই কাজেমই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। সকাল-সন্ধ্যা তার সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল দৈন্যন্দিন রুটিনের মতো। সকালবেলা আমরা চামাবেড়ার ডিহিতে প্রাতকৃত্য সারতে যেতাম। আর সন্ধ্যাবেলা গিয়ে বসতাম কৎ-বেলতলার মাঠে। তার মধ্যে কত কথা ! কত গল্প ! কত স্বপ্ন ! কাজেমের সেইসব কথায়, গল্পে আমি অনেককিছু জানতে পারতাম, শিখতাম
মনে পড়ল গ্রামে থাকতে বাড়িতে বাথরুম থাকা সত্ত্বেও আমি কাজেমের সঙ্গে প্রাতকৃত্য সারতে যেতাম পার্শ্ববর্তী চামাবেড়ার ডিহিতে। একসময় ওই ডিহিটা কাজেমদেরই ছিল। মানে বড়চাচা আমজাদ আলির। বড়চাচার স্বভাবদোষে সব বেহাত হয়েছে বহুদিন আগেই। তা নিয়ে কাজেমের কোনো আক্ষেপ দেখিনি কখনো। কপালের লিখন ভেবে যখন যে কাজ পেরেছে করেছে। রাখালি থেকে মুনিষখাটা, রাজমিস্ত্রীর কাজেও। কিন্তু ভালো লাগেনি বলে ফিরে চলে এসেছিল। তারপর জর্দাওয়ালা আব্বাসের ছেলে কালামের সঙ্গে রাঁধুনির কাজে যোগদান। দেখতে দেখতে কালামের ডান হাত হয়ে ওঠা। তার মধ্যেই কালামের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে। দুই ছেলে এক মেয়ের জন্ম। ছেলে-দুটি এখন সাবালক। একজন বিএলআরও অফিসে মুহুরিলের কাজ করে। আর একজন কাজেমের সঙ্গেই থাকত। মেয়েটির ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছে। বলতে গেলে কাজেম সবে সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই সুখ তার সহ্য হল না।
গ্রামের পথে সাইকেল চড়ে যেতে যেতে কত কথা মনে পড়ছিল। আসলে ছেলেবেলায় ওই কাজেমই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। সকাল-সন্ধ্যা তার সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল দৈন্যন্দিন রুটিনের মতো। সকালবেলা আমরা চামাবেড়ার ডিহিতে প্রাতকৃত্য সারতে যেতাম। আর সন্ধ্যাবেলা গিয়ে বসতাম কৎ-বেলতলার মাঠে। তার মধ্যে কত কথা ! কত গল্প ! কত স্বপ্ন ! কাজেমের সেইসব কথায়, গল্পে আমি অনেককিছু জানতে পারতাম, শিখতাম। যেমন ইলেক্ট্রিকের নাগরদোলার গল্প সে-ই আমাকে প্রথম শুনিয়েছিল। পরে যেটা আমি আমাদের রথের মেলায় দেখেছিলাম। শুধু দেখিনি, কাজেমের সঙ্গে সেই নাগরদোলায় চড়েছিলাম। হাওড়া ব্রিজের কথা প্রথম তার মুখেই শুনি, “ এমনই ব্রিজ যার কোনও পিলার নেই। ” তারপর কোথা থেকে সে শুনেছিল টেলিভিশনের কথা, সেই গল্পও করেছিল, “ জানিস- এমন যন্ত্র আবিস্কার হলছে যা দিন খালি রেডিওর মুতোন খবর, গান শুনা যাবে না, যারা খবর পড়বে, যারা গান গাহিবে, তাদের চোখে দেখাও যাবে।”
এই সব নিত্য নতুন খবর ছাড়াও ওই কাজেমের তোড়জোড়ে আমরা প্রতিবছর শীতকালে কোনো এক সন্ধ্যায় নিজের নিজের বাড়ি থেকে চাল, ডাল, আলু, পিঁয়াজ, ডিম, নুন, হলুদ, তেল নিয়ে এসে কৎবেলতলার মাঠে পোশাড়ু-উৎসব পালন করতাম। শাবল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে উনুন তৈরি থেকে লকড়ি কুড়ানো— সব আমরাই করতাম। রান্না করত কাজেম। বোধহয় সেখান থেকেই কাজেমের রাঁধুনি হওয়ার সখ জেগেছিল।
ভুলে গিয়েছিলাম সেসব কথা। সেই সব দিনের কথা। ভুলে যাওয়ারই কথা। কতদিন হয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে চলে আসা! কাজেম মরে গিয়ে সব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
যেমন সেই কৈশরেই আমরা প্রেম ব্যাপারটা বুঝতে শিখে গিয়েছিলাম। শিখেছিলাম কাজেমের জন্যই। কাজেম কাকে ভালোবাসে তা নিয়ে সে সন্ধ্যেবেলা কৎ-বেলতলার মাঠে বসে আমার সঙ্গে আলোচনা করত। সে ভালবাসত গ্রামের মহি সেখের মেয়ে তাঞ্জিলাকে। কিন্তু মহি সেখ খুব বড়োলোক। তাহলে মহি সেখের মেয়ে তাঞ্জিলা তার বউ হবে কী করে ? এসব আলোচনায় রোজ সন্ধ্যাবেলাটা আমরা কাটাতাম কৎবেলতলার মাঠে বসে। কিন্তু কোনও উপায় বের করতে পারতাম না।
এর মধ্যেই একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল, যার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। হয়ত কাজেমও প্রস্তুত ছিল না। আগের দিন বিকেল থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টি। এমনই যে, আমরা রীতিমতো আতঙ্কিত। এই হয়ত বাসুমাটির বাঁধ কেটে জল ঢুকে পড়বে আমাদের গ্রামেও। কিন্তু সেসব কিছুই ঘটে না। আমরা রোদ ঝলমলে একটি সুন্দর সকাল পাই। প্রতিদিনের মতো আমি ও কাজেম চামাবেড়া ডিহিতে প্রাতকৃত্য সারতে যাই। দেখি ডিহিটা তকতক করছে। সেই তকতকে ডিহিতে কাজেম একটি চাঁদির মোহর কুড়িয়ে পায়। চাঁদির মোহর খুব দামি জিনিস। কাজেম সেটা আমাকে রাখতে দেয়। কিন্তু আমি জানি ওটা জ্বিনের মোহর আমি যদি সেটা নিজের কাছে রাখি, জ্বিন আমার সর্বনাশ করতে পারে। চামাবেড়ার ডিহিতে আগেও কেউ কেউ চাঁদির মোহর পেয়েছিল। বিশেষ করে প্রচণ্ড বৃষ্টির পর ওই ডিহিতে মাটি ফুঁড়ে মোহর বেরিয়ে আসে। যেহেতু আগের রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে তাই মোহর বেরিয়ে আসাটা স্বাভাবিক। আগেও এসেছিল। আসু হাজীর পুত মোতালেব পেয়েছিল। মোতালেব পাগল হয়ে গিয়েছিল। গিয়াস সেখের বেটা কালু তো ডিহির জঙ্গলে মরে পড়েছিল। না, এসব আমরা দেখিনি, লোকমুখে শুনেছিলাম মাত্র। তা থেকেই আমার খুব ভয় হয়। সেই ভয় থেকে চামাবেড়া ডিহির জঙ্গলে আমি সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিই। আর যাই কোথায়, কাজেম আমার ওপর এমন চোটপাট শুরু করে যে, পারলে যেন আমাকে মেরেই ফেলে। যদিও মারে না। শুধু গালাগাল করে। তার বিশ্বাস, ওই মোহরটা তাকে বড়লোক বানিয়ে দিত। তার ফলে তাঞ্জিলার সঙ্গে তার বিয়েতে মহি সেখের কোনও আপত্তি থাকত না। তারপর মোহর খুঁজতে সে নিজেই গিয়ে ঢুকে পড়ে ওই জঙ্গলের ভিতর।
কাজেম খুব সাহসী। তার তুলনায় আমি ছিলাম ভীতু। কাজেমের কিছু হয়ে যায় যদি— এই ভয়ে গ্রামে ছুটে গিয়ে কাজেমের মাকে বলি সেই কথা। কাজেমের মা আলিয়া চাচি কোথায় ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করবেন তা নয়, বারান্দার চাল থেকে একটা লম্বা লাঠি বের করে ছুটে চলেন সেই জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। ভাবটা এমন, ধরতে পারলে কাজেমকে আচ্ছা করে পেটাবেন। কিন্তু কাজেমকে ধরা অত সহজ নয়। আলিয়া চাচি কাজেমকে না পেয়ে কাজেমের বাপ মানে আমজাদ চাচাকে গাল পাড়তে পাড়তে ফিরে আসেন। “ আচ্ছা ঝঞ্ঝাট থুন গেলছে মরা। বেঁচি থাকতে নিজে যেমুন হামাকে শান্তি দেয়নি, বেটাও হয়েছে তেমনি। হায় রে হামার কপাল ! ”
আলিয়া চাচির আক্ষেপ শুনতে শুনতে আমিও বাড়ি ফিরে আসি। আমার আবার স্কুল আছে। আমি শহরের স্কুলে পড়ি। সাইকেল চড়ে যাই। প্রায় ঘণ্টা খানেক সময় লাগে। আজ কাজেমের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই আমি তড়িঘড়ি গোসুল করি। মা ভাত বেড়ে দেন। আমি নাকেমুখে গিলি। মা বলেন, গলায় ভাত আটকে মরবি যে ! আস্তে সুস্থে খেতে পারিস না।
না, সত্যিই আমি আস্তে সুস্থে খেতে পারি না। জলদি খাওয়া শেষ করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। শেষপর্যন্ত কাজেমের কী হল কে জানে !
গ্রাম ছেড়ে ডাক্তারের বাগান পেরিয়ে যেই দরগাতলায় উঠতেই দেখি কাজেম দরগাতলার বটগাছের নীচে বসে বিড়ি টানছে। আমি গিয়ে দাঁড়াই তার কাছে। জিজ্ঞেস করি, এখানে বসে কী করছিস তুই ? ওদিকে তোর মা যে তোকে ঢুঁড়ে বেড়াইছে।
উত্তরে কিছু বলে না কাজেম। বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গটগট করে এমন ভাবে তাকায়, আমি ভয় পাই। তবু দাঁড়িয়ে থাকি। ধোঁয়া ছাড়া হয়ে গেলে সে বলে, তু তোর ইস্কুলে যা ! হামাকে জ্ঞান মারাতে হবে না।
সত্যিই আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। স্কুলে দেরিতে পৌছালে আমাদের ক্লাসটিচার আনন্দবাবু আবার ছেড়ে কথা বলবেন না। বেঞ্চে মাথা নুইয়ে পিঠে গদাম গদাম করে কিল মারবেন। যা আমার কাছে অসহনীয়। অগত্যা কাজেমের উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি আবার সাইকেলে চড়ে বসি।
সেই ছিল আমার কাজেমের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ। তার কিছুদিনের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে আমরা শহরে চলে আসি।
কাজেমকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। তার জানাজায় অংশ নিতে যেতে যেতে সব মনে পড়ছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি।
–তিন–
সাইকেল চড়ে বাঁধপুলে উঠছি, বাঁধপুলের ওপারেই আমাদের গ্রাম, পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, কাজেমের জানাজায় যেছো নাকি বাপ ?
ফিরে দেখি আবোল চাচাকে। সাইকেল থেকে নেমে বললাম, হ্যাঁ চাচা।
আবোল চাচা বললেন, দ্যাখো গা জানাজা বোধায় হুন গেল।
আমি ঘড়ি দেখলাম। সবে সাতটা বাজছে। জানাজা তো হওয়ার কথা আটটায়। আমি সেকথা আবোল চাচাকে বললাম। আবোল চাচা বললেন, লাশে নাকি পচন ধরছিল তাই জানাজার সুমায় আগিন নি আলছে।
সেটা তো আমার জানার কথা। ফোন করে ছোটচাচা নিশ্চয় জানাত। কিংবা হয়ত জানিয়েছে, আমি টের পাইনি। দেখি তো ! বলে মোবাইলটা বের করতে পাজামার পকেটে হাত দিই। দেখি পকেটে মোবাইল নেই। বদলে একটি চাঁদির মোহর হাতে উঠে আসে। দেখি সেই চাঁদির মোহরটা, কাজেম যেটা চামাবেড়ার ডিহিতে কুড়িয়ে পেয়েছিল আর আমি নিজেকে বাঁচাতে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম চামাবেড়ার ডিহির জঙ্গলে ! তাঞ্জিলাকে নিয়ে কাজেমের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে ! যে-কারণে সেই কৈশরেই কাজেমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল।
আমি চমকে উঠি। হঠাৎ তাহলে সেদিনের সেই মোহরটা আমার পকেটে কী করে এল ? কাজেমের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ! নাকি জ্বিনের মোহর বলেই …
♦—♦•♦—♦♦—♦•♦—♦
❤ Support Us








