Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ৬, ২০২৫

ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৩

সোমা দত্ত
ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৩

 
ভারতচন্দ্র থেকে প্যারিচাঁদ, মাইকেল। ভানুসিংহ থেকে ভাবকুমার, পরশুরাম- খৈয়াম-সত্যপীর-টেঁকচাঁদ এবং রূপদর্শী এবং সনাতন পাঠক এবং ইবনে ইমাম এবং সঞ্জয়— এরকম গুচ্ছ গুচ্ছ কবি আর লেখক, বুদ্ধিধনে ভরা বঙ্গের গ্রাম আর শহরের দিনযাপনকে খুঁটিয়ে-খতিয়ে দেখতে দেখতে খ্যাতির আড়ালে বসে তাৎক্ষণিকের ছবি এঁকেছেন কালক্রমে। তীক্ষ্ণ-তির্যক ভঙ্গিতে। উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম ছিলেন একজনই, বাংলার চালচিত্রর-এর আব্দুল জাব্বার। ছদ্ম পোশাকে নয়, স্বনামে সরাসরি দেখেছেন গ্রাম-জীবনকে। তাঁর উত্তরাধিকারকেও স্পর্শ করে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠবেন আরেক ছদ্মহীন মুখোশহীন দুঃসাহসী। 

 
বাহারউদ্দিন

 

পয়সন ডি এভ্রিল

 
“April is the cruelest month, breeding / Lilacs out of the dead land, mixing / Memory and desire, stirring / Dull roots with spring rain.” – T.S. Eliot, “The Waste Land”

 
এমনকি ফুলও…
 
সেও পারে নিষ্ঠুরতার নিদর্শন হতে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের নির্মম ধ্বংসস্তূপের উপরে ধারালো রোদ আর অসহনীয় জলীয় বাষ্প নিয়ে এপ্রিল এলো প্রাণে। শহরের জল শুকিয়ে গেছে এপ্রিলের বিপন্ন শুষ্কতায়। অশ্বত্থ গাছের পাতায় জমে রয়েছে রোদ। ওই উন্মত্ত পাতাই একমাত্র হাসতে জানে খিলখিল করে। চোখে আলো ফেলে আয়নার মতো। কিছু অদ্ভুত ফুলের ভিতরে প্রেমের জন্ম হয়। এপ্রিল নিষ্ঠুর ! অনর্থক শীতের শব্দ এখন বহুদূর। বসন্ত মৃদু কম্পনে জানান দেয় হাওয়ার গন্ধে তারা এখনো বেঁচে আছে। অমাবস্যা এগিয়ে চলেছে আলোর লক্ষ্যে। ধূসর অন্ধকারে সাঁতার কাটে নিঝুম পল্লী। আনাচে কানাচে তৈরি হওয়া গল্প পুঁইডাঁটার মতো বেড়ে ওঠে।
 

গিবলি কথা বলবে সাংকেতিক শব্দবোধে। সে ভাষার অনুবাদ হবে। চ্যাট জিপিটি লিখে দেবে নিত্য মধুর কবিতা। ব্যাখ্যা দেবে সুরের এবং স্বরের। আমার এবং তোমার মধ্যে যাবতীয় বাক্যালাপ অনূদিত হবে বিপ শব্দে। সম্পর্কে জল জমবে, নির্মাণ হবে নিকাশি শৌচের, অন্তরালে কাজ করবে অ্যানালিটিক্স। যুদ্ধ হবে, রাজনীতি হবে, ষড়যন্ত্রে জ্বলে উঠবে আগুন– নিয়ন্ত্রক হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

 
এবছর এপ্রিল উৎসাহিত হয়েছে গিবলি আর্টে।সোশ্যাল মিডিয়ায় হায়াও মিয়াজাকি ছুড়ে দিয়েছেন জনপ্রিয় অ্যানিমে চরিত্র। চ্যাট জিপিটি লুফে নিয়েছে মানুষের হৃৎপিন্ড। মুহূর্তের মধ্যে মানুষ যেন প্লাস্টিক। আসল থেকে উন্নত হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতিচ্ছবি। গিবলি ‘দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনা সুখেষু বিগতস্পৃহঃ’! তার চামড়ায় ভাঁজ পড়ে না, চোখের তলায় শ্রমের অন্ধকার জমে না, রাগে দুঃখে অভিমানে তার ভ্রু কুঞ্চন হয় না। তার ক্ষয় নেই, শোক নেই, আলো-আঁধারীর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া নেই। সে অনন্ত কুসুমিত।

 

নিজের স্টুডিয়োতে হায়াও মিয়াজাকি

যে ছবি অলীক, যে ছবি রূপকথার রাজ্যে উড়ে চলেছে পক্ষীরাজের পিঠে, যে ছবির দুঃখ নেই, যে ছবির বুক ধড়ফড় করে অ্যালগোরিদমে, যে ছবির নিয়ন্ত্রিত আবেগ বয়ে যায় লুপে সে ছবির স্মৃতি থেকে ভালোবাসা চুরি করে অন্তর্যামী। সে ছবি নিঃস্ব অথচ প্রবল দামি।
 
এখন গিবলি কথা বলবে সাংকেতিক শব্দবোধে। সে ভাষার অনুবাদ হবে। চ্যাট জিপিটি লিখে দেবে নিত্য মধুর কবিতা। ব্যাখ্যা দেবে সুরের এবং স্বরের। আমার এবং তোমার মধ্যে যাবতীয় বাক্যালাপ অনূদিত হবে বিপ শব্দে। সম্পর্কে জল জমবে, নির্মাণ হবে নিকাশি শৌচের, অন্তরালে কাজ করবে অ্যানালিটিক্স। যুদ্ধ হবে, রাজনীতি হবে, ষড়যন্ত্রে জ্বলে উঠবে আগুন– নিয়ন্ত্রক হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এপ্রিল থেকে ধ্বংস হবে ফুউল– নির্বুদ্ধিতার অগ্যস্ত যাত্রা।
 
মনে পড়ে হলিউডের সেই ‘Her’ ছবির কথা যেখানে প্ৰোটাগনিষ্ট চরিত্র থিওডর ভালোবেসে ফেলেছিল অত্যাধুনিক এক অপারেটিং সিস্টেম সামান্থাকে। যান্ত্রিক ভালোবাসা প্রতিস্থাপিত করেছিল সম্পর্কের ভিতরে জন্মে যাওয়া ঘুণ এবং যাবতীয় অজীর্ণ অন্ধকার। তবু নির্বাসিত সেই আলোর সন্দর্ভ। সীমাবদ্ধ শ্বাসের দ্যোতনা।
 
ভালোবাসাটি শেষপর্যন্ত ভালোবাসা পায় না। প্রযুক্তি বদল হয়। সামান্থা বদলে যায় উন্নততর নামে। শেষপর্যন্ত তোমার মানবিক অস্তিত্ব ফিকটিশাস হে সিস্টেম। মানুষ প্রাকৃতিক প্রযুক্তির চুড়ান্ত পার্থিব সাফল্য। তাকে অতিক্রম করবে কোন গিবলী আর্ট?
 
অস্বীকার করার পথনির্ভরতা যেমন নেই তেমনই স্বীকার করে নেওয়ার বাধ্যবাধকতার কাছেও তুমি অসহায়, নির্বাক এবং উত্তেজিত অনুসরণকারী। ক্রমপরিবর্তনের ধারায় তুমি হারিয়ে ফেলছ প্রাকৃতিক চেতনা। রোবট জীবন এবং রোবোটিক সংবেদনশীলতা। মুগ্ধ, সম্মোহিত তুমি ছুটে চলেছ । তোমার চলার, বলার এবং জীবন যাপনের সমস্ত আধুনিকতার নকশা তৈরি হয়ে চলেছে অলক্ষ্যে। যে কোনো মাধ্যমে তুমি আর একা নও। নীরবে অথবা সরবে  তোমাকে অনুসরণ করে চলেছে অশরীরী শৃঙ্খল। আপাতভাবে স্বাধীন তুমি আসলে একটি উন্নত স্বচ্ছ দেওয়ালের ভিতরে ঘুরে চলেছ। অজ্ঞানতাই তোমার স্বাধীনতার বোধ। আপাত পরাধীন তুমি ক্রমশই ছুটে চলেছ প্রযুক্তির কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে।
 
এপ্রিল এগিয়ে চলেছে গিবলি আর্টে। জলীয় বাষ্প জমে যাচ্ছে মানুষের বুকে। বৃষ্টি পড়ে না। মাটি থেকে ভেসে আসে না সোঁদা গন্ধ। ঝোড়ো হাওয়ায় অন্ধকার হয়ে আসা বিকেলের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে একটি ছাতার নীচে আড়ষ্ট দুটি মানুষের বাড়ি ফেরার কথা। প্রবল এপ্রিলের গিবলি আর্ট বয়ে চলে শহুরে প্রাণের শ্বাসকষ্ট।
 

♦–•–♦♦–•–♦♦–•–♦

ক্রমশ..

আগের পর্ব পড়ুন: ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ২

ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ২


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!