Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১৯, ২০২৫

গেল চলে জানালো তাই

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
গেল চলে জানালো তাই

রবীন্দ্রনাথের এই গানটির আগের পংক্তিটি হচ্ছে, এলো যখন সাড়াটি নাই/ গেল চলে জানালো তাই। কলকাতায় বা এই বঙ্গে আমার বয়সী বাঙালি মানুষের জুবিনের মৃত্যুর পরের প্রতিক্রিয়াগুলি এরকমই। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ বাঙালি ভেবে পায় না, জুবিন গর্গের মৃত্যুতে আসামের মানুষ শোকে এতটা উত্তাল কেন ? যতদিন যাচ্ছে বিস্ময় বেড়েই চলেছে। বিস্ময়ের মাত্রা চরমে উঠছে যখন দেখতে পেল অপারেশন সিদুরের উত্তেজনায় রক্তগরম সময়ে পাকিস্তানের একটি ভিড়ঠাসা প্রকাশ্য গানের অনুষ্ঠানে সেখানকার শিল্পীরা জুবিনের গান গেয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর দৌত্যেই নাকি দু’পারের সামরিক আঘাত প্রত্যাঘাত বন্ধ হয়েছে।তর্কের খাতিরে সে কথা মেনে নিলেও দু’পারের আইটি সেলের নিয়ত ঘৃণাবর্ষণ তো বন্ধ হয়নি। সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াত স্বাভাবিক হয়নি। শিল্পীদের যাওয়া আসা শুরু হয়নি। ক্রিকেট খেলা হয়েছে করমর্দন ছাড়া। এমনকী বিষাক্ত আবহে পাকিস্তানের মানুষ ভারতীয় শিল্পী জুবিনের জন্যে স্বতঃস্ফূর্ত শোক জ্ঞাপন করছে !! অভাবনীয় ঘটনা। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমে ভারতীয় কোনো রাজনীতিবিদের বক্তব্য গুরুত্বের উল্লেখ হলেই যখন ভারতে সেই রাজনীতিবিদকে দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা হয়, তখন একজন গায়ক, যাকে কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি চেনেই না, তাকে নিয়ে মানুষের ভাবাবেগ সমস্ত কাঁটাতারকে তুচ্ছ করে দিচ্ছে। কেন ? কারণটা কি গান ? কিংবা, শুধু গান ? অবশ্যই গান, তবে গানের সাথে সাথে আরো অন্য কতগুলো কারণ যা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

জুবিনের মধ্যে তাঁর সময়ের স্বর যেমন রয়েছে, ঠিক একইভাবে তিনি এই সময়ের একটি বিরুদ্ধস্বরও। এই বিরুদ্ধতার স্বর শুধু গানে নয়, তাঁর সমাজবোধ, তাঁর রাজনৈতিক উচ্চারণে, সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নে তাঁর সরব উপস্থিতি, অর্থ ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর বেপরোয়া মনোভাব

আমাদের কথা বলার আগে প্রথমে আমার কথাই বলি। কলকাতায় বসে কেন আমি জুবিন-সত্তাটিকে চিনতে পারলাম না ?সোজাসাপ্টা প্রথম কারণটি হল, প্রজন্মের দূরত্ব। জুবিনের গায়নশৈলীটি ভীষণই অধুনাতন বা ইদানীন্তন। গায়নশৈলী সবসময়ই সময়ের সাথে সম্পর্কিত এবং অবশ্যই সময়ের প্রযুক্তিগত স্তরের সাথে। প্রযুক্তির বদলের সঙ্গী হয়ে গায়নেরও বদল হয়েছে। শব্দ প্রক্ষেপন ব্যবস্থা প্রযুক্তির দৌলতে রেকর্ডিংয়ের সময় গানকে অংশ অংশ করে গাওয়া যায় বা ভুল হলে পরে নির্দিষ্ট অংশটি আবার গেয়ে পুরোনো রেকর্ডিংয়ে জুড়ে দেওয়া যায়। কোথাও সুর কম লাগলে তাকে সুরে স্থিত করা যায় সফটওয়ারের প্রয়োগে। এখন প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে একটি চলমান অনুষ্ঠানের গায়কের সুরচ্যুতিও চলমান স্তরেই শুদ্ধ করে দেওয়া যায়। গায়নশৈলীর সাথে নৈকট্য অনুভূত হওয়ার জন্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল জুবিনের গানের সাথে, তার সাথে আরো একটি সত্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুবিনের বাংলা গান এবং অসমীয়া গানগুলি গুণগতভাবেই সম্পূর্ণ আলাদা। কলকাতার বাংলা গানের বাজারের রুচি অনুযায়ী জুবিনের জন্যে যে বাংলা গানগুলি তৈরি হয়েছে তার বাণীগুলি খুবই লঘু। জুবিনের অসমীয়া গানগুলি অনেকবেশি কাব্যময়। ভূপেন হাজারিকার সৌভাগ্য ছিল যে তিনি বাংলায় একজন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেয়েছিলেন যিনি ভূপেনের অসমীয়া গানগুলির সাথে বাঙালি শ্রোতার একটি সেতুর ভূমিকা পালন করেছেন। ভূপেনের বহু অসমীয়া গান বাংলায় অনুবাদ হয়নি ঠিকই। তবু যে গানগুলির অনুবাদ হয়েছে তার সুবাদে আসামও বাংলায় ভূপেন অভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন।
জুবিনের মধ্যে তাঁর সময়ের স্বর যেমন রয়েছে, ঠিক একইভাবে তিনি এই সময়ের একটি বিরুদ্ধস্বরও। এই বিরুদ্ধতার স্বর শুধু গানে নয়, তাঁর সমাজবোধ, তাঁর রাজনৈতিক উচ্চারণে, সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নে তাঁর সরব উপস্থিতি, অর্থ ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর বেপরোয়া মনোভাব এবং একইসাথে সমাজের সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম মমত্ববোধ তাঁকে এই সময়ের অবশিষ্ট শিল্পীদের দঙ্গলের মধ্যে এক অন্য বিশিষ্টতা দিয়েছে। ভূপেন হাজারিকার মৃত্যুর পর কালিকাপ্রসাদ একটি অনুষ্ঠানে বলেছিল, আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন শিল্পী গান গাইছে ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’, আর আজ যে শিল্পীর মৃত্যু হল তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্যে’। জুবিন শিল্পী হিসেবে যে সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন তখনকার মতাদর্শ হল ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’। আর তিনি নিজে যে জীবনটি গানে ও সমাজ-সংবেদনে কাটালেন তার পরতে পরতে রয়েছে তার মতাদর্শ, ‘মানুষ মানুষের জন্যে’। ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’-এর মতাদর্শ জুবিনকে পণ্য করতে চেয়েছে।

পুঁজিবাদী নিগমবাদের এই পণ্যায়ন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে জুবিন প্রতিষ্ঠার তুঙ্গ শিখরে থেকেও মুম্বাইয়ের রূপোলী জগৎ থেকে ফিরে এসেছেন নিজের মাটিতে নিজের মত করে বাঁচতে। কিন্তু লোভাশ্রয়ী পণ্যায়নে এখানেও তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছে। তাঁর শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে জোর সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়েছিল পণ্যায়নের প্রতিভূরা। তাঁর মৃত্যূর জন্যে এই পণ্যায়নই তাঁর আততায়ী। জুবিনের মৃত্যুর পর আসামের সরকার ও শাসক রাজনৈতিক দল জুবিনের মৃত্যুকে রাজনৈতিক পণ্যে পরিণত করতে চাইছে। সাধারণ মানুষ যে অকুতোভয় প্রতিবাদী বহুত্ববাদী জুবিনের উদযাপন করছে তার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই এই রাজনীতি ব্যবসায়ীদের। তাদের নিশানা রয়েছে জুবিনকে ঘিরে মানুষের ভাবাবেগের দিকে যাকে তারা ভোটের বাক্সে নিয়ে আসতে চাইছে নিজেদের অনুকূলে। জুবিনের মৃত্যু, মৃত্যু-পরবর্তী জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ভাবাবেগ, তাঁর মৃত্যুকে রহস্যের দানা বাঁধা এবং জুবিনের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতির ব্যাপারীদের তৎপরতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুরহস্য নিয়ে বাঙালির ভাবাবেগ ও সেই নিয়ে গত সাত দশকের রাজনীতি। নেতাজী যেমন বাঙালির সমস্ত অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক যার মৃত্যু আজো বাঙালি মেনে নিতে পারে না, তেমনিই আসামের জুবিন। আত্মসমর্পন ও স্বার্থপর লোভাশ্রয়ী পণ্যায়নের যুগে জুবিন ছিলেন মানুষের না-বলতে পারা কথাগুলির কথক। তাঁর অস্বাভাবিক ও অসময়ের মৃত্যূকে আসামের মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। বাঙালির নেতাজীর যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি অসমীয়া সমাজের কাছেও জুবিন মৃত্যুহীন।
কারণ স্বপ্নের কখনো মৃত্যু হয় না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!