- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫
কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায়, কে ওই গোপাল ভাঁড় ?
শহর থেকে দূরে । পর্ব তিন
শান্তিপুর থেকে কৃষ্ণনগর, মর্জিমতো কেনাকাটার পথে শেষ বেলার সফর। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়িটি হজম করে নিয়েছে গেছে রেললাইন। আছে শুধু প্রবেশদ্বার। ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক পেরিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকলাম। রাজবাড়ির ময়দানে আঞ্চলিক ফুটবলের হুল্লোড়। সিংহদুয়ারের মাথায় উড়ছে জাতীয় পতাকা। রাজবাড়ির গেটের বাইরে দু-সারি কামান ফিট। গেটটি খোলে বছরে দু-বার। জগদ্ধাত্রী পুজো এবং বারোদোলে। পূর্ণিমার সময় ১২ জায়গা থেকে আসে কৃষ্ণঠাকুর। তখন সমগ্র রাজবাড়ি নয়, খোলে দেউড়ি পর্যন্ত। বেঁচে আছেন নবম রাজা। রানি অমৃতা রায় ভোটে দাঁড়িয়ে ছিলেন মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে, ২০২৪ সালে। রাজা বা রানি যা-ই বলি, তা শুধু কথার কথা। স্বয়ং রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় নির্ধারিত সময়ে জমিদারির রাজস্ব পরিশোধ না করতে পারায় জেল খাটলেন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁর হুকুমে। ছাড়া পেলেন দুর্গোৎসবের পর। নিরুপায় হয়ে চালু করলেন জগধাত্রী উপাসনার। ৭৩ বছরের জীবন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দেখেছেন মন্বন্তর, বর্গীহাঙ্গামা এবং পলাশীর যুদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধে নিয়েছেন ইংরেজ পক্ষ। তখন ইংরেজ পক্ষ নেওয়া মানেই নানা সুযোগ সুবিধে। শোভাবাজারের দেব-রা বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর-রা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা এবং নানা কাজে জড়িয়ে অর্থবান হয়েছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রীদের দলে ফেলা কঠিন। সংস্কৃতিমনস্ক রাজার নবরত্ন সভা ছিল গর্বের বিষয়। সেখানে নিয়মিত বসতেন কালীসাধক রামপ্রসাদ সেন, ‘অন্নদামঙ্গল’ রচয়িতা কবি ভারতচন্দ্র, পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন, কৃষ্ণানন্দ বাচস্পতি, বানেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের মতো গুণীজন। কিন্তু গোপাল ভাঁড়? তাঁকে নিয়ে যতো গল্প কাহিনি রটনা থাকুক না কেন, ডক্টর সুকুমার সেন বলেছেন, গোপাল ভাঁড় এক কাল্পনিক চরিত্র। বাস্তব হলে অবশ্যই তাঁর দেখা মিলত ভারতচন্দ্রের রচনায়।
৭৩ বছরের জীবন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দেখেছেন মন্বন্তর, বর্গীহাঙ্গামা এবং পলাশীর যুদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধে নিয়েছেন ইংরেজ পক্ষ। তখন ইংরেজ পক্ষ নেওয়া মানেই নানা সুযোগ সুবিধে। শোভাবাজারের দেব-রা বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর-রা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা এবং নানা কাজে জড়িয়ে অর্থবান হয়েছিলেন
গোপাল চক্রবর্তী ছিলেন দেওয়ান। গোপাল ভাঁড় হতে পারেন কলকাতার গোপাল উড়ে। গল্পে গল্পে মিথ হয়ে গেলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নাটোর থেকে মৃৎ শিল্পী এনে বসিয়েছিলেন ঘূর্ণিতে। তখন থেকেই কৃষ্ণনগর মাটির পুতুলের জন্য বিখ্যাত। ২০০৩ সালে ঘূর্ণি এলাকায় কৃষ্ণনগর পৌরসভা বসিয়েছে গোপালভাঁড়ের মূর্তি। আমাদের মেয়ে দেখতে চায়, কিন্তু খুঁজে না পেয়ে ঘূর্ণির শোরুমে স্বামী- স্ত্রী ‘গোপাল ভাঁড়-পার্বতী’ পুতুল কিনে ক্ষান্ত হই। মেয়ে কেনে দুর্গার একচালার পরিবার।
১৯৩৪ সালে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়িতে এসেছিলেন সরোজিনী নাইডু, কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভায়।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ি
একটি দোকানে লাইন নিয়ে কিনছিলাম কৃষ্ণনগরের জগৎখ্যাত সরভাজা। চোখে পড়ে প্রশস্ত রাস্তাটির নাম ‘অনন্তহরি মিত্র সরণি’। তক্ষুণি মনে পড়ে গেল অনন্তহরি মিত্রকে। শান্তিপুরে তাঁর জন্ম, বাবার চাকরির সূত্রে চট্টগ্রামে ছিলেন, ময়মনসিংহের স্কুলে পড়াশুনো শেষ করে ভর্তি হন কলকাতায় আইএসসি পড়তে। সালটা ১৯২১, শুরু হয়েছে মহাত্মা গাঁধির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন। কৃষ্ণনগরের কংগ্রেস নেতা এবং নেতাজি সুভাষের রাজনৈতিক বন্ধু হেমন্তকুমার সরকার অনন্তহরি মিত্রকে কলেজ থেকে ছাড়িয়ে সরাসরি যুক্ত করলেন জাতীয় আন্দোলনে। কৃষ্ণনগরের ‘গরবিনী কটেজে’ চরকায় সুতো কেটে তিনি তৈরি করতেন খাদি পোশাক। ১৯২৪ সালে, বেশির ভাগ কংগ্রেস নেতা জেল বন্দি হলে ভেঙে পড়লেন। আসলে অনন্তহরি মিত্র ছিলেন গোপীনাথ সাহার মতো আবেগপ্রবণ। যোগ দেন বিপ্লবীদলে, কাশীর শচীন সান্যালের নেতৃত্বে। দক্ষিনেশ্বরের একটি বাড়ি ভাড়া করে সেখানে বোমা তৈরি হচ্ছিল। সেখানেই ধরা পড়েন অনন্তহরি মিত্র, প্রমোদ চৌধুরী, রাজেন লাহিড়ী প্রমুখ। কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগে রাজেন লাহিড়ীকে রাখা হয় লক্ষ্ণৌ জেলে এবং বাকিদের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।
জেল কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের সায় থাকলে পুলিশ জেলের ভেতরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে, অত্যাচার চালায় কখনো কখনো। এভাবেই স্বাধীন ভারতে নকশাল আন্দোলনের সময় পুলিশ দমদম সেন্ট্রাল জেলে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে খুন করে বহু নকশালপন্থীকে
সাধারণ নিয়মে পুলিশের এক্তিয়ার হলো জেলের অফিস পর্যন্ত। জেল কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের সায় থাকলে পুলিশ জেলের ভেতরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে, অত্যাচার চালায় কখনো কখনো। এভাবেই স্বাধীন ভারতে নকশাল আন্দোলনের সময় পুলিশ দমদম সেন্ট্রাল জেলে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে খুন করে বহু নকশালপন্থীকে। পরাধীন ভারতে দক্ষিনেশ্বর ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত বিপ্লবীদের খবর সংগ্রহ করত আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ভেতরে যখন তখন ঢুকে পড়তেন গোয়েন্দা দপ্তরের স্পেশাল সুপার ভূপেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি। ১৯২৬ সালের মে মাসে প্রমোদ চৌধুরীর সহযোগিতায় অনন্তহরি মিত্র লোহার ডান্ডা মেরে হত্যা করেন ভূপেন চ্যাটার্জিকে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে একসঙ্গে ফাঁসি হয় কৃষ্ণনগরের অনন্তহরি মিত্র এবং চট্টগ্রামের প্রমোদ চৌধুরীর, ১৯২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। একদা অনন্তহরি মিত্রর রাজনৈতিক সঙ্গী এবং কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা: ‘গলায় জড়ায়ে ফাঁসির রশিটি, অধরে করুণ হাসি / তরুণ পথিক! বলে যাও মোরে কারে এত ভালবাসি।’
আশির দশকের শেষে চাকরিসূত্রে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ঢুকেই দেখলাম, শহিদ বেদিতে খোদিত নাম: অনন্ডহরি মিত্র। মনে গেঁথে ছিল সে নাম। আজ সম্পূর্ণ হল একটি বিপ্লবী পরিক্রমা ।
❤ Support Us








