- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ২০, ২০২৩
আমার আম্মা
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেখ হাসিনা এবং শেখ ফজিলাতুন নেছা
আদর্শ মা, আদর্শ গৃহিণী আর দেশ প্রেমের অনিঃশেষ শিখা হয়ে জেগে থাকবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সর্বংসহা গৃহিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা।পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানে গণ অভ্যুত্থান আর মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে তার সুকঠিন দৃঢ়তা, তাঁর সাংগঠনিক সংযোগ, কর্মতৎপরতার কিছু কিছু দৃষ্টান্ত, কৌশলী সতর্কতা এবং ১৯৭৫ সালের নৃশংস ১৫ আগস্টের রক্তখেকো দেশদ্রোহীদের বিকৃত উল্লাস, বিকৃত মানসিকতা— স্মরণ করলেন বাংলাদেশের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী
আমার বয়েস এখন ৭৫ বছর। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের স্মৃতিগুলো আরও প্রকট হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠছে। নিষ্ঠুর অগাস্ট আমার আম্মার স্মৃতিকে রক্তাক্ত ক্যানভাসে এঁকে তোলে। এর পুরোটাই দুঃখের আধারে পূর্ণ। অগাস্ট মাসে এই ভেবে এই দুঃখের মধ্যেও খানিক স্বস্তি পাই যে অগাস্ট মাসে আমার মায়ের যেমন জন্ম হয়েছিল, তেমনই কামাল, আমার ভাই, আমার থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট, তাঁরও জন্ম এই অগাস্ট মাসে। ৫ অগাস্ট ওর জন্ম। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস যে, অগাস্টের নৃশংস ১৫-য় ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাত ঝাঁঝরা করে দেয় আমার আম্মাকে। প্রাণ দিতে হয়েছে আমার আব্বা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার আম্মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাড়াও কামাল, জামাল, রাসেল, কামাল-জামালের নব বিবাহিত বধূ, সুলতানা, রোজি, আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের, আমার ফুফা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ১৩ বছরের মেয়ে বেবী, ১০ বছরের আওরাফ, ৪ বছরের নাতি সুকান্ত, সুকান্তের মা, আমার বাবার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল, যে ছুটে এসেছিল বাঁচানোর জন্য। ১৫ আগস্টে একই সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে। এভাবে পরিবারের এবং কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারসহ ১৮ সদস্যকে।এই শোক আমি কি ভুলতে পারি ?
কেন এই হত্যাকাণ্ড? একটাই কারণ, জাতির পিতা মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়ে যুদ্ধ করেছে।ইতিহাসে কত নাম না জানা মানুষ হারিয়ে যান।আমার আম্মার স্মৃতি অম্লান। আমার মায়ের স্মৃতির কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে যে আজ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য আমার আব্বা যেমন সংগ্রাম করেছেন, আর তাঁর পাশে থেকে আমার মা, আমার দাদা-দাদি সব সময় বাবাকে সহযোগিতা করেছেন। আমার মা’র জন্মের পরেই তাঁর পিতা প্রয়াত হন। আমার মায়ের তখন মাত্র তিন বছর। নানা খুব সৌখিন ছিলেন। যশোরে চাকরি করতেন এবং সব সময় বলতেন, আমার দুই মেয়েকে বিএ পাস করাবো। সেই যুগে টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়াগাঁয়ে ঢাকা থেকে যেতে ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগতো।তখন এরকম কেউ ভাবতেই পারতেন না। ভাবনাটা ছিল অনেক বড় মনের পরিচয়। তখনকার দিনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াও প্রায় নিষিদ্ধ ছিল।
মিশনারি স্কুলে কিছুদিন প্রাথমিক শিক্ষা আমার মা গ্রহণ করেন। তারপর আর বেশি দিন স্কুলে যেতে পারেননি, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ওই এলাকায় অন্য কোনো স্কুল ছিল না। একটাই, জিটি স্কুল। অর্থাৎ গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া স্কুল। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরত্বের পরেও আরও প্রায় দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি। দূরে, কাঁচা মাটির রাস্তা।যেতে হতো একমাত্র কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে অথবা নৌকায় । এই পথে মেয়েদের যাওয়া একদম নিষিদ্ধ ছিল। তখন বাড়িতে পড়াশোনার জন্য পণ্ডিত রাখা হতো। শিক্ষক ছিলেন আরবি পড়াবার জন্য। আমার মা’র পড়শোনার প্রতি অদম্য একটা আগ্রহ ছিল। মায়ের যখন তিন বছর বয়স, তখন তার বাবা মারা গেলেন। সে সময় বাবার সামনে ছেলে মারা গেলে মুসলিম আইনে ছেলের ছেলে-মেয়েরা কোনো সম্পত্তি পেতনা। আমার মায়ের দাদা তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার দুই নাতনিকে তার নিজেরই আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে যান এবং সব সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে আমার দাদাকে মোতাওয়াল্লি করে দেন। এর কিছু দিন পর আমার নানীও মারা গেলেন। সেই থেকে আমার আম্মা মানুষ হয়েছেন আমার দাদির কাছে। পাশাপাশি বাড়ি, একই বাড়ি, একই উঠোন। কাজেই আমার দাদি নিয়ে আসেন আমার আম্মাকে। আর আমার খালা দাদার কাছেই থেকে যান।
ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদের সঙ্গেই আমার মা বেড়ে ওঠেন ছোটবেলা থেকেই। মায়ের ছোটবেলার অনেক গল্প আমরা শুনতাম। আমার দাদা-দাদির কাছে, ফুফুদের কাছে। বাবা রাজনীতি করছেন, কলকাতায় পড়াশোনা করতেন তখন থেকেই। মানবতার জন্য তাঁর যে কাজ এবং কাজ করার যে আকাঙ্ক্ষা, যার জন্য অনেক ঝুঁকি আমার আব্বা নিয়েছেন। ১৯৪৭-এর রায়টের সময় মানুষকে সাহায্য করা। যখন দুর্ভিক্ষ হয় তখন মানুষকে সাহায্য করা; সেই স্কুল জীবন থেকেই তিনি এভাবে মানুষের সেবা করে গেছেন। আমরা দাদা-দাদির কাছেই থাকতাম। যখন পাকিস্তান হলো, আব্বা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন, সে সময় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন আমার আব্বা। তার পর ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। প্রথম ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ সালে। ১১ মার্চ ধর্মঘট ডাকা হলো, সেই ধর্মঘট ডাকার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা গ্রেপ্তার হলেন।এটাই সম্ভবত তাঁর প্ৰথম হাজত বাস।
১৯৫৯ সালে ভুখা মিছিল করলেন, তখনও গ্রেপ্তার হতে হল আব্বাকে। বলতে গেলে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ৩-৪ বার গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে সরকার আবার গ্রেপ্তার করে আর কিন্তু তাঁকে ছাড়েনি। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দীই ছিলেন এবং বন্দিখানায় থেকেই ভাষা আন্দোলনের সব রকম কর্মকাণ্ড চালাতেন। গোপনে হাসপাতালে বসে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আব্বার সাক্ষাৎ হতো, আন্দোলনের বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।কৌশল ঠিক করতেন।
আম্মার তখন সাংঘাতিক অবস্থা। শুধু খবর শুনেই তাঁকে থাকতে হতো।স্বামীকে তিনি খুব কম সময়ই কাছে পেতেন। আমি যদি পিছন দিকে ফিরে তাকাই এবং আমার আব্বার জীবনটা যদি দেখি, কখনও একটানা দু’বছর আমরা তাঁকে কাছে পাইনি। কাজেই স্ত্রী হিসেবে আমার আম্মা ঠিক এভাবেই তাঁর স্বামীকে কাছে পাওয়া থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কখনও, তাঁকে কোনও দিন কোনও অনুযোগ-অভিযোগ করতে শুনিনি। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন , তাঁর স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন। আম্মার দাদু যে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন, তাতে প্রচুর জমিজমা ছিল। জমিদার ছিলেন তাঁরা। সব সম্পত্তিই ছিল আম্মার নামে। এর থেকে যে টাকা আসত আমার দাদা সব সময় সে টাকা আমার মায়ের হাতেই দিয়ে দিতেন। একটি টাকাও মা নিজের জন্য খরচ করতেন না, সব জমিয়ে রাখতেন। কারণ জানতেন যে, আমার বাবা রাজনীতি করেন, তাঁর টাকার অনেক দরকার, আমার দাদা-দাদি সব মাকে সহায়তা করতেন। দাদা সব সময় ছেলেকে দিতেন, তার পরেও মা তার ওই নিজের জমানো অংশটুকু, বলতে গেলে যা নিজেকে বঞ্চিত করে হাতে রাখতেন, সে টাকাটা আব্বার হাতেই তুলে দিতেন। এভাবেই আব্বাকে মা সহযোগিতা শুরু করেন। তখন কতইবা তাঁর বয়স? ১৯৫৪ সালে প্রথম নির্বাচন হয়, নির্বাচনের সময় নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে নির্বাচনী কাজে সবাই যুক্ত হলেন। আমার আম্মাও সে সময় কাজ করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন, আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাদের ভালোভাবে স্কুলে পড়াবেন। এর পরে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। আবার মন্ত্রিসভা ভেঙে গেল, তখন আমরা খুব ছোট, কামাল-জামাল কেবল হামাগুড়ি দেয়। তখন মিন্টু রোডের তিন নম্বর বাসায় থাকি আমরা। একদিন সকাল বেলা উঠে দেখি আম্মা খাটের ওপর বসে আছেন চুপচাপ, মুখটা গম্ভীর। আমি তো খুবই ছোট, কিছুই জানি না। শুনলাম, রাতে বাসায় পুলিশ এসেছিল, আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।
আম্মা বসা খাটের উপরে, চোখে জল। আমি জিজ্ঞেস করলাম- আব্বা কই? বললেন, তোমার আব্বাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে।১৪ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হল। আম্মা তখন আমাদের নিয়ে কোথায় যাবেন? কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে মা চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় বাসা গমগম করত, কিন্তু ওইদিন সব ফাঁকা। আমার আব্বার ফুফাতো ভাই, আমার এক নানা এলেন, বাড়ি খোঁজার চেষ্টা শুরু হল। নাজিরাবাজারে একটা বাড়ি পাওয়া গেল, সে বাসায় আমাদের নিয়ে আম্মা উঠলেন। এভাবেই একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে মায়ের ওপর। একটা কথা বলা খুবই জরুরি, কোনও অবস্থাতেই আমার মাকে আমি কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। যত কষ্টই হোক আমার আব্বাকে কখনও মা বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও, বা চলে আসো বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনো এসব কথা মায়ের মুখে আমি শুনিনি।
সংসারটা কীভাবে চলবে পুরোপুরি সে দায়িত্ব আম্মা সামলাতেন। কোনও দিন কোনও প্রয়োজনে আব্বাকে বিরক্ত করেননি। মেয়েদের অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়ার। শাড়ি, গয়না, বাড়ি, গাড়ি কত কিছু। মায়ের এসব চাহিদা কোনোদিন দেখিনি। কী ধৈর্য আর সহ্য শক্তি! সবসময় চুপচাপ। গম্ভীর।
১৯৫৪ সালের পর আব্বা আবার গ্রেফতার হলেন। তারপর ১৯৫৫ সালে আবার মন্ত্রী হলেন । ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে সেবার জয়ী হন, মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। আমরা ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডে এসে তখন উঠে আসি।
আমরা প্রায়ই দেখি, অনেকেই মন্ত্রিত্বের জন্য দল ত্যাগ করে, আর আমি দেখেছি আমার আব্বাকে যে তিনি সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন, দলের কাজ করতে দেশজুড়ে ছুটছেন।
কোনও সাধারণ নারী যদি হতো, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করত যে, স্বামী মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছে ! এই যে আমার বাড়ি গাড়ি এগুলো সব হারাবে, এটা কখনও হয়তো মেনে নিত না। এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি হতো, অনুযোগ হতো; আমার আম্মাকে কখনও, এ ব্যাপারে একটি কথাও বলতে শুনিনি। বরং আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই তিনি পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতভাবে সমর্থন করতেন।
একসময়,বাড়ির সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি চলে গেলেন ছোট্ট জায়গায়। এরপর আব্বাকে টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান করলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তখন সেগুনবাগিচায় একটা বাসায় থাকতে দেওয়া হলো। এরপরই এলো মার্শাল ল। আইয়ুব খান যেদিন মার্শাল ল ঘোষণা করলেন, আব্বা তখন করাচিতে। তাড়াতাড়ি , ওই দিন রাতেই ঢাকা ফিরে এলেন। ১১ তারিখ দিবাগত রাতে, ১২ তারিখ আব্বাকে গ্রেপ্তার করা হলো। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। গ্রেপ্তার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল, আমাদের গাড়ি ছিল, সব সিজ করে নিয়ে যাওয়া হলো।
অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমার আম্মাকে দেখেছি, সে অবস্থা সামাল দিতে। মাত্র ছয় দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হল। মালপত্র নিয়ে রাস্তার ওপর আমরা ছোট ছোট ভাইবোন। তখন রেহানা খুব ছোট। একজন একটা বাসা দিল। দুই কামরার, বাসাতে আমরা ওখানে গিয়ে উঠলাম। আব্বার বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী সরকার তখন একটার পর একটা মামলা দিচ্ছে, এই মামলা-মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া এবং বাড়ি খোঁজা সব কাজ আম্মা নিঃশব্দে পালন করতেন।
তবে তখন আমাদের পাশে আওয়ামী লীগের লোকজন এবং আব্বার বন্ধুবান্ধব ছিল। আমার দাদ সব সময় চাল, ডাল, টাকা-পয়সা পাঠাতেন। আম্মা কষ্ট পেলেও, মুখ ফুটে কিছুই বলতেন না।
এরপর সেগুনবাগিচায় দোতলা একটা বাসায় আমরা উঠলাম। তখন দেখেছি, আওয়ামী লীগের কোনও নেতা-কর্মীর অসুখ-বিসুখ হলে তাঁকে সাহায্য করা, যাঁরা বন্দী তাঁদের পরিবারগুলো দেখা, কার বাড়িতে বাজার হচ্ছে না সেই খোঁজ খবর নেওয়া সব আম্মা করতেন। এগুলো করতে গিয়ে মা কখনও কখনও নিজের গয়না বিক্রিও করে দিয়েছেন। এ সব করতে গিয়ে কোনও উষ্মা প্রকাশ করতে তাঁকে দেখিনি।
আমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিল, আব্বা যখন আমেরিকা গিয়েছেন তখন ফেরার সময় ফ্রিজ নিয়ে এসেছিলেন। সেই ফ্রিজটা মা একদিন বিক্রি করে দিলেন। আমাদের বললেন, ঠাণ্ডা পানি খেলে সর্দি কাশি হয়, গলা ব্যথা হয়, ঠাণ্ডা পানি খাওয়া ঠিক না। কাজেই এটা বিক্রি করে দিই। কিন্তু এটা কখনো বলেননি যে আমার টাকার অভাব, তাই ফ্রিজটা বিক্রি করে দিলাম। সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে। কে অসুস্থ তাঁকে টাকা দিতে হচ্ছে। তার পরেও কখনও অভাব নিয়ে আক্ষেপ আম্মার মুখে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কোনও দিন বলেননি আমার টাকা নেই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন, আচার দিয়ে বলেছেন প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি ? আজকে আমরা খিচুড়ি খাব। এটা খেতে খুব মজা। একজন মানুষের চরিত্র কতটা দৃঢ় থাকলে, এরকম অবস্থা মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা ধারণ করতে পারে, এটা আম্মাকে দেখে শিখেছি। অভাব-অনটনের কথা, হা-হুতাশ করা, কখনও তাঁর মুখে শুনিনি। আমি তাঁর বড় মেয়ে। আমার সঙ্গে আমার মায়ের বয়সের তফাৎ খুব বেশি ছিল না। তাঁর মা নেই, বাবা নেই, কেউ নেই। বড় মেয়ে হিসেবে আমিই ছিলাম তাঁর মা, আমিই বাবা, আমিই বন্ধু। কাজেই ঘটনাগুলো আমি যতটা জানতাম আর কেউ ততটা জানত না। আমি বুঝতে পারতাম। ভাইবোন ছোট ছোট, তারা বুঝতে পারত না। পদে পদে তিনি সংগঠনকে, আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছেন। প্রকাশ্যে আসতেন না কখনও।
ঠাট্টা করে বলতেন আমি আইয়ুব খানকে ধন্যবাদ দিই, কেন জানিস? আব্বা ১৯৫৮ সালে অ্যারেস্ট হন, ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হেবিয়াস কর্পাস করে মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে এসে মামলা পরিচালনা করেন। তখন তিনি জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু এমবার্গো থাকায় উনি ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না। রাজনীতি করতে পারবেন না। সব রাজনীতি বন্ধ। ওই অবস্থায় আব্বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। তখন সত্যি কথা বলতে কি হাতে টাকা-পয়সা, ভালো বেতন, গাড়ি সব ছিল। একটু ভালোভাবে থাকার সুযোগ আম্মার হলো। তিনি ঠাট্টা করে তাই বলতেন, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় আইয়ুব খান এনে দিয়েছিল। উনি চাকরি করছেন আমি স্থিরভাবে জীবনটা চালাতে পারছি। ওই সময় ধানমণ্ডিতে দু’ই কামরার বাড়ি করেন আব্বা।
১৯৬১ সালের অক্টোবরে আমরা ধানমণ্ডি চলে আসি। এ বাড়িটা তৈরি করার সময় লেবার খরচ বাঁচানোর জন্য আমার মা নিজের হাতে বাড়ির ওয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। আমাদেরকে নিয়ে কাজ করতেন।
তখন বাড়িতে সবকিছু ছিল। আব্বা তখন ভালো বেতন পাচ্ছেন। তারপরেও জীবনের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকা বা সীমিতভাবে চলা, সবকিছুতে সংযতভাবে চলা- এই জিনিসটা সব সময় আম্মা আমাদের শিখিয়েছেন।
এরপরে, দিনের পর দিন পরিস্থিতি উত্তাল হতে থাকলো । ১৯৬২ সালে আবার আব্বা গ্রেপ্তার হলেন, ১৯৬৪ সালে আবার গ্রেপ্তার হলেন, আমি যদি হিসাব করি কখনও আমি দেখিনি দু’টো বছর তিনি একনাগাড়ে কারাগারের বাইরে ছিলেন। জেলখানায় থাকলে সেখানে যাওয়া, আব্বার কী লাগবে সেটা দেখা, তার কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া, মামলা- মোকদ্দমা চালানো সবই আম্মা করতেন। পাশাপাশি সংগঠনের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ তাঁর ছিলই। বিশেষ করে ছাত্রলীগ তো তিনি নিজের হাতেই গড়ে তোলেন। ছাত্রলীগের পরামর্শ, যা কিছু দরকার তিনি দেখতেন।
আব্বার সঙ্গে আম্মা যখন দেখা করতে কারাগারে যেতেন। আম্মার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ, আমরা মাঝে মাঝে বলতাম তুমি তো টেপরেকর্ডার। একবার যা শুনতেন তা ভুলতেন না। আমাদের কতগুলো কায়দা শিখিয়েছিলেন যে জেলখানায় গিয়ে কী করতে হবে। একটু হৈচৈ করা, ওই ফাঁকে বাইরের সব রিপোর্ট আব্বার কাছে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসা, তারপর সেটা ছাত্রদের জানানো। স্লোগান থেকে শুরু করে সবকিছুই বলতে গেলে কারাগার থেকেই নির্দেশ দিয়ে দিতেন আব্বা, সেভাবেই আম্মা ছাত্রলীগকে কাজে লাগাতেন
১৯৬৪ সালে রায়ট হল। আব্বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিন্দু পরিবারগুলোকে বাসায় নিয়ে আসতেন, সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের শেল্টারের ব্যবস্থা করতেন। ভলেন্টিয়ার করে দিয়েছিলেন রায়ট থামানোর জন্য। জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আছে, সব আমার আব্বা করেছেন। আদমজী মিলে বাঙালি বিহারি রায়ট হলো, সেখানে তিনি ছুটে গেছেন। এরকম সময় আম্মা কিন্তু ছায়ার মতো তাঁকে সাহায্য করে গেছেন, কখনও এসব নিয়ে কোনও অনুযোগ-অভিযোগ করেননি। একটার পর একটা পরিবার নিয়ে আসতেন, তাঁদের জন্য রান্নাবান্না করা, খাওয়ানো, সব দায়িত্ব পালন করতেন।সব নিজেই করতেন আম্মা।
এর পর অন্য অধ্যায়। আব্বা এর পর শুরু করলেন ৬ দফা। ৬ দফা দেওয়ার পর তিনি সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন, বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবার মুক্তি পেয়েছেন, আবার আরেক জেলায় গেছেন, এভাবে চলতে চলতে ১৯৬৬ সালের ৮ মে আব্বাকে আবার গ্রেপ্তার করা হল। ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করেই বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়।
তারপর তো আর মুক্তি পাননি, এই কারাগার থেকে বন্দী করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল। ৫ মাস আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কোথায় আছেন ? বেঁচে আছেন কিনা ? সে সময় আন্দোলন গড়ে তোলা, ও অন্যান্য কর্মসূচি শুরু। সেই সময় আম্মা আমাদেরকে নিয়ে ছোট ফুফুর বাসায় যেতেন, কেননা সেখানে ফ্ল্যাট ছিল। ওখানে গিয়ে নিজে পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলাতেন, বোরখা পরতেন, একটা স্কুটারে করে, আমার মামা, যিনি ঢাকায় পড়তেন, তাঁকে নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, আন্দোলন চালাবেন কীভাবে তার পরামর্শ মা নিজে দিতেন। তার পর আবার মা ফিরে এসে আবার আমাদের নিয়ে বাসায় ফিরতেন। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সব সময় নজরদারিতে চালাতো। কাজেই গোয়েন্দাদের নজরদারি থেকে বাঁচতে তিনি এভাবেই গোপনে কাজ করতেন। ছাত্রদের আন্দোলনকে কীভাবে গতিশীল করা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং এ হরতালটা যেন সফল হয়, আন্দোলন বাড়ে, সফল হয়, তার জন্য সর্বদা তিনি কাজ করতেন। কিন্তু কখনও পত্রিকায় ছবি ওঠা, বিবৃতি দেওয়া , এ সবের থেকে দূরে থেকেছেন, এ সবে তিনি ছিলেন না। একটা সময় এলো ৬ দফা, না ৮ দফা? পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা চলে এলেন। আমাদেরও অনেক বড় বড় নেতা চলে এলেন। কারণ আওয়ামী লীগ এমন একটা দল যার কর্মীরা সব সময় ঠিক থাকেন, কিন্তু নেতারা একটু বেতালা, দিশাহীন হয়ে যান মাঝে মাঝে, এটা আমার ছোটবেলা থেকেই দেখা। এই সময়ও দেখলাম ৬ দফা, না ৮ দফা? বড়ো বড়ো নেতারা এলেন করাচি থেকে। তখনকার শাহবাগ হোটেল আজকে যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে আম্মা মাঝে মাঝে আমাকে পাঠাতেন যে, যা একটু, নেতারা আসছেন, তাদের স্ত্রীরা আসছেন, তাদের খোঁজ খবর নিয়ে আয়, আর সঙ্গে কে কে আছে দেখে আয়। মানে একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসা আর কী ! তো আমি রাসেলকে নিয়ে চলে যেতাম, মার কাছে এসে যা যা ব্রিফ দেওয়ার সেটা দিতাম। তাছাড়া মা-র একটা ভালো নেটওয়ার্ক ছিল, ঢাকা শহরে, শহরের বাইরেও।
মহানগর আওয়ামী লীগের গাজী গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে কখন কী হচ্ছে সমস্ত খবর আমার আম্মার কাছে চলে আসত। তখন তিনি এভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মফঃস্বল থেকেও নেতারা আসতেন, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি যে কত সচেতন ছিলেন, সেটা আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে ছেলেবেলা থেকেই। কাজেই সে সময় ৬ দফা থেকে এক চুল এদিক-ওদিক যাবেন না এটাই ছিল তাঁর সিদ্ধান্ত। এটা আব্বাকে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নেতারা সব উঠে পড়ে লাগলেন, বলতে শুরু করলেন, ৮ দফা খুবই ভালো। ৮ দফা মানতে হবে, আমার নিজেরও অভিজ্ঞতা আছে। আমি তখন কলেজে পড়ি, তারপর আমি ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলাম, সে সময় আমাদের নামীদামী নেতারা ছিলেন, কেউ কেউ বলতেন তুমি মা কিছু বোঝ না। আমি বলতাম কিছু বোঝার দরকার নেই, আব্বা বলেছেন ৬ দফা। ৬ দফাই দরকার, এর বাইরে নয়। আমার মা’কে বোঝাতেন, ‘আপনি ভাবী বুঝতে পারছেন না।’ তিনি বলতেন, ‘আমি তো ভাই বেশি লেখাপড়া জানি না, খালি এইটুকুই বুঝি ৬ দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ। এটা উনি বলে গেছেন, এটাই আমি মানি এর বাইরে আমি কিছু জানি না।’এভাবে তাঁরা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, আমাদের বাসায় ওয়ার্কিং কমিটির তিন দিনের মিটিং। রান্নাবান্না, তখন তো এত ডেকোরেশন, আড়ম্বর ছিল না, অত টাকা-পয়সাও পার্টির ছিল না। আমার আম্মা নিজের হাতেই রান্না করে খাওয়াতেন, আমরা নিজেরাই চা বানানো, পান বানানো- এগুলো করতাম। তখন আবার পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার পড়া পড়ব, না বক্তৃতা শুনব। একটু পড়তে গিয়ে আবার দৌড়ে আসতাম কী হচ্ছে, কী হচ্ছে? চিন্তা একটাই, নেতারা ৮ দফার দিকে নিয়ে যাবে না তো ? কিন্তু সেখানেও দেখেছি আমার আম্মার সেই দৃঢ়তা, মিটিংয়ে রেজুলেশন হলো যে ৬ দফা ছাড়া হবে না।
তখন নেতারা বিরক্ত হলেন, রাগ করলেন। আব্বার সঙ্গে আম্মা যখন দেখা করতে কারাগারে যেতেন, তখন সব বলতেন। আর একটা বিষয় বলি, আম্মার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ, আমরা মাঝে মাঝে বলতাম তুমি তো টেপরেকর্ডার। একবার যা শুনতেন তা ভুলতেন না। আমাদের কতগুলো কায়দা শিখিয়েছিলেন যে জেলখানায় গিয়ে কী করতে হবে। একটু হৈচৈ করা, ওই ফাঁকে বাইরের সব রিপোর্ট আব্বার কাছে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসা, তারপর সেটা ছাত্রদের জানানো। স্লোগান থেকে শুরু করে সবকিছুই বলতে গেলে কারাগার থেকেই নির্দেশ দিয়ে দিতেন আব্বা, সেভাবেই আম্মা ছাত্রলীগকে কাজে লাগাতেন। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ওঁকে নিয়ে গেল ক্যান্টনমেন্টে। আমরা কোনও খবর পেলাম না। তখন মায়ের যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যখনচাপিয়ে দেওয়া হল, আম্মাকেও ইন্টারোগেশন করেছে, এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে উনি কী জানেন ? উনি খুব ভালোভাবে উত্তর দিয়ে যেতেন।
স্বাধীনতা আমাদের দরকার, এই বিষয়টা সবাই তখন বুঝে গেছে। ভুট্টোকে যখন আইয়ুব খান তাড়িয়ে দিল মন্ত্রিত্ব থেকে, ভুট্টো তখনকার দিনের ইস্ট পাকিস্তানে এসেই ছুটে গেলেন আমাদের ৩২ নম্বর বাড়িতে, আম্মার সঙ্গে দেখা করতে।
আমাদের বসার ঘরটার নিচে যে ঘরটা আছে ওখানে আগেকার দিনের গৃহসজ্জা অনুযায়ী এ রকম হতো যে ড্রয়িং রুম, এরপর ডাইনিং রুম, মাঝখানে একটা কাপড়ের পর্দা। যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা আসতেন, পর্দাটা টেনে ভিতরে বসে কথা বলতেন।এটাকে মা বলতেন আমি পর্দা করি। আমাদের বলতেন ওদের সঙ্গে থাকব না, দেখা করব কেন? আমার আব্বা যে মিনিস্টার ছিলেন, এমপি ছিলেন, এমএলএ ছিলেন, করাচিতে যেতেন। আম্মা কিন্তু জীবনে একদিনও করাচিতে যাননি, কোনও দিন যেতেও চাননি। মা জানতেন, সবার আগে জানতেন যে, এদেশ স্বাধীন হবেই । এই যে স্বাধীনতার চেতনায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা, এটা মায়ের ভিতরে তীব্রভাবে ছিল। আগরতলা মামলার সময় আব্বার সঙ্গে প্রথম আমাদের দেখা জুলাই মাসে। যখন কেস শুরু হলো, জানুয়ারির পর জুলাই মাসে প্রথম দেখা হয়, তার আগ পর্যন্ত আমরা জানতেও পারিনি। ওই জায়গাটাতে আমরা মিউজিয়াম বানিয়ে রেখেছি। ক্যান্টনমেন্টে যে মেসে আব্বাকে রেখেছিল এবং যেখানে মামলা হয়েছিল সেখানেও একটি মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে।
মা বলেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই বিবাহিত। মামলা না তুললে উনি যাবেন না।’ আম্মার যে দূরদর্শিতা ছিল, সেটাই আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। সেদিন যদি আব্বা প্যারোলে যেতেন, তাহলে কোনও দিনই আর বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। এরপর অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি আম্মার দৃঢ় ভূমিকা।
আমাদের নেতারা আবার উঠেপড়ে লাগলেন। আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকল, সেখানে যেতে হবে, না গেলে সর্বনাশ হবে। মা খবর পেলেন। আমাকে পাঠালেন, বললেন- ‘আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনও সিদ্ধান্ত যেন উনি না নেন।’ আমাদের বড়ো বড়ো নেতারা সবাই ছিলেন, তাঁরা আমাকে নিয়ে যাবেন। আমার উপস্থিতি দেখেই আব্বা বুঝে যেতেন যে মা কিছু বলে পাঠিয়েছেন। আম্মা খালি বলে দিয়েছিলেন আব্বা কখনও প্যারোলে যাবে না, যদি মুক্তি দেন তখনই যাবে। সে বার্তাটাই আমি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম, আর তার জন্য আমাদের নেতারা বাসায় এসে বকাঝকা- ‘তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাওনা তোমার আব্বা বের হোক জেল থেকে ?’ মাকে বলতেন ‘আপনি তো বিধবা হবেন।’ মা শুধু বলেছিলেন, ‘আমি তো একা না, এখানে তো ৩৪ জন আসামি আছে, তাদের স্ত্রীরা যে বিধবা হবেন, সে চিন্তা আপনারা করেন না ? আমার একার কথা চিন্তা করলে চলবে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই বিবাহিত। মামলা না তুললে উনি যাবেন না।’ আম্মার যে দূরদর্শিতা ছিল, সেটাই আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। কারণ সেদিন যদি আব্বা প্যারোলে যেতেন, তাহলে কোনও দিনই আর বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। এরপর অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি আম্মার দৃঢ় ভূমিকা।
৭ মার্চের ভাষণের কথা বারবারই আমি বলি। বড়ো বড়ো বুদ্ধিজীবীরা লিখে দিয়েছেন এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। কেউ কেউ বলছেন- ‘এটাই বলতে হবে, না বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’এ রকম বস্তা বস্তা কাগজ আর পরামর্শ। গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে যেতে হলে আম্মা কিন্তু আব্বাকে বলতেন ‘কিছুক্ষণ তুমি নিজের ঘরে থাক।’ তাঁকে ঘরে নিয়ে তিনি একটা কথা বললেন যে, ‘তোমার মনে যে কথা আসবে, তুমি সে কথা বলবা। কারণ লাখো মানুষ সারা বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছে— হাতে বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা নিয়ে।’ পাকিস্তানি শাসকরাও অস্ত্র-টস্ত্র নিয়ে বসে আছে এই বলে যে, বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশ দেন। তারপর মানুষগুলোকে আর ঘরে ফিরতে দেবে না। নিঃশেষ করে দেবে। স্বাধীনতার স্বাদ বুঝিয়ে দেবে, এটাই ছিল পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত। আর সেখানে আমাদের কোনও কোনও নেতা বলে দিলেন যে, এখানেই বলে দিতে হবে যে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। কেউ বলে, এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে।
আম্মা আব্বাকে বললেন যে, ‘সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল-জুলুম খেটেছ।’ দেশের মানুষকে নিয়ে যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, সে কথাই তিনি ওই ভাষণে বলে এলেন। যে ভাষণ আজকে সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যত ভাষণ আছে, যে ভাষণ মানুষকে উজ্জ্বীবিত করেছে সে-সব ভাষণের সেরা একশটি ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ স্থান পেয়েছে। যে ভাষণ এদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার শক্তি যুগিয়েছে। এরপর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা করে যখন তিনি এলেন, ফোনে বলেছিলেন ‘খসড়াটা ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চলে যাবে।’ ব্যবস্থাটা সবই করা ছিল, সবই উনি করে গিয়েছিলেন।
আব্বা ভাবতেন না যে বাঙালি কোনও সময় তাঁকে গ্রেপ্তার বা হত্যা করতে পারে। আম্মা সব সময় আব্বার স্মৃতির সঙ্গে অভিন্ন, কখনও তাঁর মধ্যে ভয়ভীতি দেখিনি। যে মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন, তারপরই সেনাবাহিনী এসে বাড়ি আক্রমণ করল, ওনাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, পরের দিন এসে আবার বাড়ি আক্রমণ করল, আম্মা পাশের বাসায় আশ্রয় নিলেন। তারপর এ বাসা ও বাসা করে মগবাজারের একটা বাসা থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাসায় রাখা হলো। খোলা বাড়ি। কিছু নাই, পর্দা নেই। রোদের মধ্যে আমাদের পড়ে থাকতে হয়েছে, দিনের পর দিন। আম্মাকে কিন্তু কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। সব সময় একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, সাহস ছিল সে সাহসই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উৎস। যেদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার করে, আমরা সেদিন মুক্তি পাইনি, আমরা পেয়েছি এক দিন পরে ১৭ ডিসেম্বর।ধানমন্ডীর বাড়িতে একটা ছবি আছে, মা দাঁড়িয়ে আছে মাঠের ওপর। মানুষের দিকে হাত দেখাচ্ছেন, ওটা একটা বাংকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ বাড়িতে মাটির নিচে বাংকার করেছিল, কাজেই ওই বাংকারের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ইন্ডিয়ান আর্মি এসে পাকিস্তান আর্মিকে স্যারেন্ডার করিয়ে নিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষ ওখানে চলে এলো, মা হাত নেড়ে সেটাই দেখাচ্ছেন।
স্যারেন্ডার করার সময় গেটে যে সেন্ট্রি ছিল, আমরা ভিতরে বন্দী, আমরা তো বের হতে পারছি না, জানালা দিয়ে আম্মা হুকুম দিচ্ছেন। ওই সিপাহিটার নামও জানতেন, বলছেন যে ‘হাতিয়ার ডালদো’। ওই যে ‘হাতিয়ার ডালদো’ এ কথা শুনে বেচারা ভ্যাবাচেকা খেয়ে ‘জ্বি, মা জি’বলে অস্ত্রটা নিয়ে বাংকারে চলে গেল। কাজেই ওঁর যে সাহসটা, তা আগেও ছিল ওই সময়েও ছিল। ওই দিন রাতেও আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়, যেভাবেই হোক আমরা বেঁচে গেছি।

মা এবং পুত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
আমার আম্মার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আমরা দেখেছি। স্বাধীনতার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর গৃহিণী হিসেবে বিলাসী জীবনযাপনে ফিরে যাননি, ধানমণ্ডির বাড়িতেই থেকেছেন। বলেছেন, ‘না, আমার ছেলেমেয়েরা বেশি বিলাসিতায় থাকলে ওদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে।’
ওঁর জীবনে যেভাবে চলার ঠিক সেভাবেই উনি চলেছেন, স্বাধীনতার পর যেসব মেয়ে নির্যাতিত ছিল, নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য করা, তাদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া, বোর্ডের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের তখন ব্যবস্থা তখন হয়। ওই মেয়েদের যখন বিয়ে দেওয়া হত, আম্মা নিজেও তখন উপস্থিত থেকেছেন। নিজের গহনা দিয়ে দিয়েছেন, আমি আমারও গহনা খুলে ওদের পরিয়ে দিয়ে বলতাম, তুমি যাকে যা দরকার তা দেবে।আমার তোমার সন্তান, তোমাকে দেখেই উৎসাহ পাই, তুমি শুধু আমাদের নও, সারা দেশের জননী।
আম্মা প্রচারবিমুখ ছিলেন, আমাকে একদিন বললেন, মাত্র ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে তাকে যেভাবে অত্যাচার করেছে, তা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতেন, যে এসে যা চেয়েছে হাত খুলে তা দিয়ে দিয়েছেন; দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। দিয়ে আনন্দ পেতেন, নিতে নয়, অন্যকে বিলিয়ে দিতেই তাঁর সব আনন্দ।
অনেকেই ভাবতে পারেন আমি এত স্মৃতির কথা কেন বলছি ? বলার কারণ, আমি মারা গেলে অনেক কিছুই অনেকের অজানা হয়ে থাকবে। একজন যখন একটা কাজ করে তার পেছনে যে প্রেরণা, শক্তি, যে সাহস লাগে, আম্মা সব সময় সে প্রেরণা দিয়েছেন, কখনও পিছে টেনে ধরেননি। বলেননি, এতে আমার কী হবে, কী পাব? নিজের জীবনে তিনি কিছুই চাননি, কেউ বলতে পারবেন না যে, তিনি কখনো কিছু চেয়েছেন।
স্বাধীনতার পর অনেক সময় আব্বার সঙ্গে তাঁকে আলোচনা করতে দেখেছি, নানা বিষয়ে, নানা সময়ে দুজনে মিলে কথা বলতেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কি ভয়াবহ পরিস্থিতি ! সেই অবস্থায়ও তিনি সব খোঁজ খবর রাখতেন। তথ্যগুলো আব্বাকে জানাতেন।
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন, যখন ঘাতকরা আমার বাবাকে হত্যা করল, তিনি একবারও বাঁচার আকুতি করেননি। তিনি বলেছেন, ‘ওঁকে যখন মেরে ফেলেছ, আমাকেও মেরে ফেল।’ এভাবে নিজের জীবনটা উনি উৎসর্গ করে দিয়ে গেছেন, দেশের জন্য। তারপর সবাইকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আমরা দুই বোন থেকে গেলাম, বিদেশে চলে গিয়েছিলাম মাত্র ১৫ দিন আগে। মাঝে মাঝে মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকা যে কী কষ্টের, যাঁরা আপনজন হারায়, এই যন্ত্রণা,দুঃখ-বেদনা শুধু তারাই বোঝে।
আমাদের আম্মা দেশকে, দেশের মানুষকে যেভাবে ভালোবাসতেন, যেভাবে দুর্বৃত্তের হাতের বন্দুক দেখেও একটুও ঘাবড়াননি, সে সাহস, দুর্বিসহ রাতের সেই সজল দৃঢ়তা যেন আমাদের চলার, আমাদের দেশপ্রেমের, আমাদের স্বাধীন ভাবাবেগের, অনিঃশেষ ত্যাগের খোরাক হয়ে থাকবে, এ শুধু আমার নয়, দেশের কোটি কোটি মানুষের। তাঁর সব স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি।অসমাপ্ত কাজগুলি আমাদের করতেই হবে, দেশকে ভালোবেসে, মানুষকে ভালোবেসে, দেশগড়ার সুসঙ্কল্পকে চাঙ্গা করে আমাকে, আমাদের দেসবাসীকে বলতে হবে, জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমানের যোগ্য গৃহিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা কেবল আমার জননী নন, তিনি গোটা দেশের এবং মানবজাতির সকাতর আর অসাধারণ স্নেহশীল একজন জননী।
♦–♦ ♦–♦♦–♦
❤ Support Us








