- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬
স্মৃতি, স্বর ও স্বপ্ন আঁকড়ে মাতৃভাষার পুনর্জাগরণ
ভাষা, লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্য— বৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডার আমাদের দেশ। ভিন্নতার রঙিন পালক এক সুতোয় গেঁথে সেজে উঠেছে সার্বভৌম্য গণতন্ত্রের মুটুক। আনুমানিক ১৩৬৯টি ভাষা রয়েছে এই ভূখণ্ডে। রয়েছে নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতি, সংস্কৃতি ও জনজাতির বিশাল সাংস্কৃতিক ধারা। কিন্তু আধুনিকতার কড়াল গ্রাস, আধিকারিক ভাষার প্রাধান্য এবং শিক্ষামাধ্যমের পরিবর্তনের ফলে বহু ভাষা আজ বিপন্ন হওয়ার পথে। এ বাস্তবতার মধ্যে সরকারের পাশাপাশি রাজ্যগুলোতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে পাহাড়, অরণ্য আর নদীখাতের জটিল ভাঁজে নিবিড়তায় মিশে আছে অরুণাচল প্রদেশ। হিমালয়ের পূর্বাংশে অবস্থিত রাজ্যের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, বহু জনজাতির সহাবস্থান আর দীর্ঘকালীন মৌখিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে ভাষার জীবন্ত জাদুঘররূপে পরিগণিত। প্রচলিত ভাষার সংখ্যা পঞ্চাশেরও অধিক; তবে ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান বলছে, উপভাষা ও আঞ্চলিক রূপভেদ মিলিয়ে সংখ্যাটা আরও বিস্তৃত। অরুণাচলের অধিকাংশ ভাষাই তিব্বত–বর্মী ভাষাপরিবারভুক্ত; পাশাপাশি তাই–কাদাই ও ইন্দো–আর্য ভাষার প্রভাবও লক্ষণীয়। ইংরেজি প্রশাসনিক পরিসরে ব্যবহৃত হলেও, জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মাতৃভাষাতেই কথা বলে থাকেন। এ ভূখণ্ডে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা এখানে আকাশের দিকে ওঠা ধোঁয়ার মতো, শিকড়ের মতো গাঁথা স্মৃতির মতো, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান উত্তরাধিকার। ভাষাগুলির অনেকেই আজ বিপন্ন, অনেকেই প্রান্তিক, অনেকেই প্রায় বিলুপ্তির কিনারায়। এই সংকটকালে মাতৃভাষার পুনর্জাগরণের পাহাড়সম দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড’স অ্যানশিয়েন্ট ট্র্যাডিশনস, কালচার্স অ্যান্ড হেরিটেজ (রিওয়াচ)-এর অধিনস্ত সেন্টার ফর মাদার ল্যাঙ্গুয়েজেস (আরসিএমএল)।
অরুণাচলের প্রধান জনজাতিগুলির মধ্যে রয়েছে ন্যিশি, আদি, আপাতানি, মিশমি, তাগিন, গালো, মোনপা, নোক্টে, ওয়ানচো। ন্যিশি জনগোষ্ঠীর ভাষা, যা ন্যিশি নামেই পরিচিত, তিব্বত–বর্মী শাখার অন্তর্গত এবং আজও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মুখের ভাষা। আদি ভাষা ও তার উপভাষাগুলি—যেমন পদাম, মিন্যং, পাশি—একটি বৃহৎ ভাষিক গোষ্ঠী নির্মাণ করেছে। আপাতানি ভাষা তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র জনসমষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও তার ধ্বনিগত ও ব্যাকরণগত স্বাতন্ত্র্য ভাষাবিদদের বিশেষ আগ্রহের বিষয়। মিশমি গোষ্ঠীর অন্তর্গত ইদু, দিগারু ও মিজু প্রভৃতি ভাষা পৃথক উপশাখা নির্মাণ করেছে, যাদের মধ্যে পারস্পরিক বোধগম্যতা সীমিত। পশ্চিম অরুণাচলে মোনপা ভাষাগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এগুলি তিব্বতি প্রভাবিত এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত। তাওয়াং অঞ্চলে প্রচলিত মোনপা ভাষার রূপ তিব্বতি লিপির দ্বারা প্রভাবিত; ফলে অরুণাচলের ভাষাচিত্রে এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে। পূর্বাঞ্চলে নোক্টে ও ওয়ানচো ভাষা তাই–কাদাই ও তিব্বত–বর্মী প্রভাবের সংমিশ্রণ বহন করে। খামতি ভাষা, যা তাই শাখাভুক্ত, নিজস্ব লিপি ও ধর্মীয় পুঁথিপাঠের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে—এটি অরুণাচলের ভাষাসমূহের মধ্যে এক বিরল লিখিত ঐতিহ্যের নিদর্শন।
ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মৌলিক প্রশ্ন হলো—দলিলীকরণ কি যথেষ্ট ? কোনো ভাষার ব্যাকরণ বা শব্দকোষ সংরক্ষিত থাকলেও, যদি ভাষাটি জীবন্ত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তবে তা সাংস্কৃতিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। অতএব প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক উৎসব ও লোকসাহিত্য পুনরুজ্জীবন, ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার নির্মাণ এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য
অরুণাচলের ভাষাগুলির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল মৌখিকতা। অধিকাংশ ভাষার নিজস্ব লিপি ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠেনি; লোককথা, পৌরাণিক কাহিনি, আচার–অনুষ্ঠানের মন্ত্র, লোকগাথা ও সংগীতের মাধ্যমে ভাষা প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়েছে। এই মৌখিক ঐতিহ্য ভাষাকে জীবন্ত রেখেছে বটে, কিন্তু আধুনিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় স্থান না পাওয়ায় বহু ভাষা আজ বিপন্নতার মুখে। ভাষাতাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, অল্পসংখ্যক বক্তা–নির্ভর ভাষাগুলির মধ্যে কিছু ইতিমধ্যেই লুপ্তপ্রায়; নবপ্রজন্ম বিদ্যালয়শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে হিন্দি বা ইংরেজির দিকে ঝুঁকছে। ভাষা–সংরক্ষণে সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষাক্রমে মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস, লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণ, অভিধান প্রণয়ন এবং ধ্বনি–রেকর্ড সংরক্ষণ—এসব প্রচেষ্টা ভাষাগুলির ভবিষ্যৎ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। কিছু ভাষার জন্য রোমান লিপি বা দেবনাগরীভিত্তিক লিপ্যন্তর প্রস্তাবিত হয়েছে, যদিও লিপি–নির্বাচন নিয়ে মতভেদও রয়েছে।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড’স অ্যানশিয়েন্ট ট্র্যাডিশনস, কালচার্স অ্যান্ড হেরিটেজ (রিওয়াচ) গবেষণা কেন্দ্রের জন্ম এমনই সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের ফল। ভাষাকে বাঁচানো মানে শুধু শব্দকে সংরক্ষণ নয়; মানে ইতিহাসকে ধরে রাখা, মানে এক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে রক্ষা করা। সেই উপলব্ধি থেকেই ‘রিওয়াচ’-এর অধিনস্ত সেন্টার ফর মাদার ল্যাঙ্গুয়েজেস ‘আরসিএমএল’ তাদের প্রকল্প ‘অরুণাচল প্রদেশের মাতৃভাষাগুলির প্রসার ও সাহিত্যিক উন্নয়ন’ বাস্তবায়ন করেছে। আর্থিক সহায়তা করেছে নর্থ ইস্টার্ন কাউন্সিল (এনইসি) এবং নোডাল সংস্থা হিসেবে কাজ করেছে অরুণাচল প্রদেশ সরকারের আদিবাসী বিষয়ক দফতর। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বহুমুখী। প্রথমত, বিপন্ন মাতৃভাষাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। দ্বিতীয়ত, সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে ভাষাকে জীবন্ত রাখা। লোকগীতি সংকলন, চিত্রভিত্তিক শব্দকোষ, শিশুদের গল্পের বই— এসব শুধু প্রকাশনার বিষয় নয়, ভাষার ভবিষ্যৎ নির্মাণের ইট-পাথর। বিশেষ করে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর আলোকে প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব যে পুনরায় স্বীকৃত হয়েছে, তার সঙ্গে এ উদ্যোগের সাযুজ্য লক্ষণীয়। ‘আরসিএমএল’ জানে, ভাষা রক্ষার লড়াই কেবল গবেষণাগারে বসে হয় না; তাই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছুটে গিয়েছেন মাঠে-ময়দানে, মানুষের মধ্যে, উৎসবে, আচার-অনুষ্ঠানে। ক্ষেত্রসমীক্ষা হয়েছে লোয়ার দিবাং ভ্যালির ইডু মিশমি গ্রাম থেকে শুরু করে আপার সুবনসিরির তাকসিং সার্কেল পর্যন্ত। ইডু মিশমি, কামান মিশমি, মেয়োর, সিংফো, তাংসা, নাহ, আশিং-আদি, তাওরাঁ মিশমি; ৯টি ভাষা-সম্প্রদায়ের উপর বিস্তৃত গবেষণা এক কথায় অভূতপূর্ব।
ভাষা বাঁচে চর্চায়-চর্যায়, বোধ আর মননে। সে ক্ষেত্র তৈরি করতে ‘আরসিএমএল’ ৪টি কর্মশালা আয়োজন করেছে। শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সেমিনার; সব মিলিয়ে নিবিড় বৌদ্ধিক পরিসর গড়ে উঠেছে, যেখানে মৌখিক ঐতিহ্য, লোক আখ্যান, উত্তর-পূর্ব ভারতের ভাষাসংস্কৃতি নিয়ে গভীর আলোচনা–পর্যালোচনা চলছে। অরুণাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক টোমো রিবা এক উদ্বোধনী ভাষণে এ কেন্দ্রের সূচনাকে ‘শিক্ষাবিদ্যা’র মর্যাদা দিয়েছেন
ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে একাধিক ঘণ্টার অডিও ও অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং সংগৃহীত হয়েছে। শব্দতালিকা, বাক্যতালিকা প্রস্তুত হয়েছে।ভবিষ্যৎ অভিধান, ব্যাকরণ রচনা, এমনকি ডিজিটাল আর্কাইভ নির্মাণের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। আচার-অনুষ্ঠানের দলিলীকরণেও দেখা গেছে অসাধারণ নিষ্ঠা। এতোড় উৎসব, সিজু উৎসব কিংবা ইডু মিশমি জন্ম-আচার— প্রতিটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে বহু ঐতিহ্য তথ্যসমেত সংরক্ষণ করা হয়েছে। আদি লোকগীতির গান রেকর্ডও করা হয়েছে সংস্থার উদ্যোগে। ভাষা বাঁচে চর্চায়-চর্যায়, বোধ আর মননে। সে ক্ষেত্র তৈরি করতে ‘আরসিএমএল’ ৪টি কর্মশালা আয়োজন করেছে। শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সেমিনার; সব মিলিয়ে নিবিড় বৌদ্ধিক পরিসর গড়ে উঠেছে, যেখানে মৌখিক ঐতিহ্য, লোক আখ্যান, উত্তর-পূর্ব ভারতের ভাষাসংস্কৃতি নিয়ে গভীর আলোচনা–পর্যালোচনা চলছে। অরুণাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক টোমো রিবা এক উদ্বোধনী ভাষণে এ কেন্দ্রের সূচনাকে ‘শিক্ষাবিদ্যা’র মর্যাদা দিয়েছেন। ভাষা যে উন্নয়নের অন্তরঙ্গ অংশ, এ উপলব্ধি ক্রমশ প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
‘রিওয়াচ’-এর ৩০টি চিত্রভিত্তিক শব্দকোষ, ১টি লোকগীতি সংকলন, ২টি লোককথা গ্রন্থ এবং ১টি সম্পাদিত গ্রন্থ— সংখ্যার বিচারে এ অর্জন উল্লেখযোগ্য, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাষার অভ্যন্তরে সাহিত্যিক চেতনার উন্মেষ। যখন কোনো শিশু তার নিজের মাতৃভাষায় প্রথম ছবি-সহ বই পড়ে, তখন সে কেবল শব্দ শেখে না; সে নিজের পরিচয়কে চিনতে শেখে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তরুণ গবেষকদের অংশগ্রহণ ভাষা-আন্দোলনকে প্রজন্মান্তরে প্রসারিত করার এক সুস্পষ্ট কৌশল। জুলাই ২০২৫-এ আকা (হ্রুসো), শেরদুকপেন ও সাজোলাং (মিজি) সম্প্রদায়ের মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে নতুন ক্ষেত্রসমীক্ষা ভবিষ্যৎ প্রকাশনার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করছে। পদ্মশ্রী ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ওয়াই.ডি থংচি-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই বিরল প্রকাশনায় উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছেন। বিশিষ্ট জনের আন্তরিক উপস্থিতি আর উদযাপন এ উদ্যোগকে স্থানীয় স্তরেই নয়, সর্বভারতীয় পরিসরেও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলছে।
কেবল অরুণাচল প্রদেশ নয়। গোটা ভারত জুড়েই জনজাতি গোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার গুরুত্ব প্রশাসনিক স্তরেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক ‘ বিপন্ন ভাষা সুরক্ষা ও সংরক্ষণ প্রকল্প’ (এসপিপিইএল) নামে একটি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার লক্ষ্য বিপন্ন মাতৃভাষাগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে দলিলীকরণ ও সংরক্ষণ করা। সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস (সিআইআইএল) বর্তমানে প্রায় ১১৭টি ভাষা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলোর ব্যকরণ, অভিধান, ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট ও মৌখিক দলিল কোন রূপে সংরক্ষণ করা হবে তার কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক গবেষকদের সহযোগীতায় দ্রুত গতিতে চালাচ্ছে ‘এসপিপিইএল’। ভবিষ্যতে প্রায় ৫০০টি ভাষার দলিলীকরণ সম্পন্ন করা হতে পারে বলে সংস্থাটি পরিকল্পনা করেছে। ‘এসপিপিইএল’-এ সাধারণ ক্ষেত্রসমীক্ষা, অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং, অভিধান নির্মাণ ও ভাষা-সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংগ্রহের কাজ করা হয়। সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্ডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস দ্বারা পরিচালিত সিক্কিম–দার্জিলিং হিমালয়ান এন্ডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস আর্কাইভ (সিডহেলা) ভারতের প্রথম বিপন্ন ভাষার ডিজিটাল আর্কাইভ, যা সিকিম ও উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষাগুলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে চলেছে। এ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভাষার দলিলীকরণ, ব্যাকরণ বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের উপযোগী একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গঠনে সহায়ক, যা গবেষক থেকে ভাষাভাষী পর্যন্ত সকলের জন্য তথ্য-সমৃদ্ধ।
সম্প্রতি, মহারাষ্ট্র সরকার ‘মাদিয়া’ ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে রিধাপুরের মারাঠি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাডিয়া ভাষা প্রকল্প প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকার অনুদান পেয়েছে। যা দিয়ে ভাষাটির শব্দভাণ্ডার, অভিধান ও লিখিত তথ্য সংগৃহীত হচ্ছে। শুধুমাত্র উত্তর-পূর্ব নয়, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও ট্রাইবেল বা আঞ্চলিক ভাষা দলিলীকরণের উদ্যোগও বাস্তবায়িত হচ্ছে। ঝাড়খণ্ড-এ শিক্ষামাধ্যমে ভাষার ভূমিকা জোরদার করার উদ্দেশ্যে ‘পলাশ’ নামে একটি শিক্ষা কর্মসূচি চালু করতে ইউনিসেফ ও ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং ফাউন্ডেশন-এর সহায়তায় বার্গাঁও, সাঁওতালী, মুন্ডারি, খাড়িয়া ও হো ভাষার ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ্যক্রম তৈরি ও প্রয়োগ করা হয়েছে। যা শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় ভিত্তি করে শিক্ষা পেতে সাহায্য করছে।
বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ ও রক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এ ভাষার শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণগত কাঠামো এবং মৌখিক আখ্যান সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ভাষাটিকে অন্তত গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখবে। বিরজিয়া ভাষাও অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি। ছোটনাগপুর অঞ্চলে এর মূল বিস্তার হলেও পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে এই ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে। এক্ষেত্রেও বক্তাসংখ্যা অল্প এবং বাংলা ভাষায় স্থানান্তরের প্রবণতা স্পষ্ট
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে ধিমাল ভাষা, ভাষাভিত্তিক বিপন্নতার অন্যতম উদাহরণ। দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে কথিত এই তিব্বত-বর্মীয় ভাষার বক্তা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বাংলা ও রাজবংশী ভাষার প্রভাব, বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে বৃহৎ ভাষার দিকে ঝোঁক— সব মিলিয়ে ধিমাল ভাষা প্রজন্মান্তরে সঞ্চারের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ ও রক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এ ভাষার শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণগত কাঠামো এবং মৌখিক আখ্যান সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ভাষাটিকে অন্তত গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখবে। বিরজিয়া ভাষাও অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি। ছোটনাগপুর অঞ্চলে এর মূল বিস্তার হলেও পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে এই ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে। এক্ষেত্রেও বক্তাসংখ্যা অল্প এবং বাংলা ভাষায় স্থানান্তরের প্রবণতা স্পষ্ট। ভাষাটি দৈনন্দিন জীবনে ক্রমশ সীমিত ব্যবহারে পর্যবসিত হচ্ছে। নৃভাষাতাত্ত্বিক তথ্যসংগ্রহ এবং মৌখিক ঐতিহ্যের নথিভুক্তিকরণ এ ভাষাকে দলিলভিত্তিক অস্তিত্ব দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক ব্যবহারের পুনর্জাগরণ এখনো বড়ো চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে উত্তরবঙ্গের ‘টোটো’ ভাষা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলিপুরদুয়ার জেলার টোটোপাড়া অঞ্চলে সীমাবদ্ধ এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা অতি বিপন্ন পর্যায়ে রয়েছে। ভাষাটির বক্তা সংখ্যা এতটাই কম যে প্রজন্মান্তরে সঞ্চার ভেঙে গেলে ভাষাটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
টোটো ভাষার সাহিত্যিক ধনীরাম টোটো ২০০৫ সালে সচেষ্ট হন টোটো ভাষার লিপি ও হরফ তৈরিতে। নিজে প্রশিক্ষিত ভাষাবিদ না হওয়ায়, সাহায্য নেন অস্ট্রেলিয়ান ভাষাবিদ টোবি অ্যান্ডারসনের। দীর্ঘ ১০ বছরের প্রচেষ্টায় সৃষ্টি করেন টোটো ভাষার সম্পূর্ণ বর্ণমালা। ২২ ব্যঞ্জনবর্ণ, ৯ স্বরবর্ণ এবং ৬টি ডিফথং সহ মোট ৩৭টি লিপি নিয়ে বর্ণমালাটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ -এর ২২ মে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্থাৎ আইএসও কোড-ও পেয়েছে টোটো লিপিটি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ত্রিভাষিক শব্দসংগ্রহ প্রকাশ, প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষার প্রচেষ্টা এবং সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের চেষ্টার মাধ্যমে টোটো সমাজ ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এ উদ্যোগ প্রমাণ করে যে ভাষা সংরক্ষণ কেবল প্রশাসনিক প্রকল্প নয়, বরং সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
কুরুখ ভাষা পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী ভাষাগুলির মধ্যে তুলনামূলকভাবে অধিক বিস্তৃত। ওরাঁও সম্প্রদায়ের এ ভাষাকে ২০১৭ সালে রাজ্য সরকার স্বীকৃতি দেয়। ফলে ভাষাটির সামাজিক মর্যাদা কিছুটা বৃদ্ধি হয়েছে। তবে নগরায়ন, আন্তঃরাজ্য অভিবাসন এবং বাংলা ভাষার প্রাধান্যের ফলে কুরুখ ভাষার ব্যবহার শহরাঞ্চলে হ্রাস পাচ্ছে। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো দুর্বল। একইভাবে, মুন্ডা ভাষা-পরিবারভুক্ত কোডা বা কোরা ভাষা, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া অঞ্চলে যা কথিত হয়। বক্তাসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও ভাষান্তরের প্রবণতা এখানে সুস্পষ্ট। ভাষা আধিপত্যের কবলে পড়ে কোডা ভাষা অনেকাংশে ঘরোয়া ব্যবহারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। লিখিত ঐতিহ্যের অভাব এবং প্রমিত লিপির অনুপস্থিতি ভাষাটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মৌলিক প্রশ্ন হলো—দলিলীকরণ কি যথেষ্ট ? কোনো ভাষার ব্যাকরণ বা শব্দকোষ সংরক্ষিত থাকলেও, যদি ভাষাটি জীবন্ত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তবে তা সাংস্কৃতিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। অতএব প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক উৎসব ও লোকসাহিত্য পুনরুজ্জীবন, ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার নির্মাণ এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সাম্প্রতিক কালে সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সংস্থাগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, শব্দ-দৃশ্য সংরক্ষণ এবং অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী নির্মাণ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবুও প্রধান সংকট রয়ে গেছে প্রজন্মান্তরে ভাষা সঞ্চারের ভাঙন। সমাজে নির্দিষ্ট একটি ভাষার ব্যবহার কমে গেলে বিদ্যালয় বা প্রশাসনিক স্বীকৃতি একা ভাষাকে রক্ষা করতে পারে না। স্মৃতি, জ্ঞানব্যবস্থা, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার বাহক ভাষা, এর সংরক্ষণকে সাংস্কৃতিক ন্যায়বিচারের পরিসরে বিবেচনা করা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী ভাষাগুলির বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে দ্বৈত চিত্র উপস্থাপন করে। একদিকে রয়েছে সরকারি উদ্যোগ, গবেষণা ও দলিলীকরণ; অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বাস্তবতায় ভাষার ক্রমশ সংকুচিত ব্যবহার। এই দ্বন্দ্ব অতিক্রম করতে হলে নীতি, শিক্ষা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
তথ্য সংযোজন : সোমনাথ শর্মা এবং রিওয়াচ
❤ Support Us








