- ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
- ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৩
গদ্যের আড়ালে ‘আবৃত প্রতিভা’
চিত্র দেবব্রত ঘোষ
বাংলা গদ্যের, গল্প আর উপন্যাসের তুখোড় অশ্বারোহী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, নিয়মিত কবিতা পড়তেন, সব কবিতা, সমকালের ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর অগ্রজ— অনুজ শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপল কুমার বসু, বিনয় মজুমদার, আল মাহমুদ, তুষার রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী — রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, জয় গোস্বামীদের কবিতা নিয়ে বলাবলি করতেন। জয় গোস্বামীকে বলেছিলেন, ‘যদি একটুও না বানিয়ে বলি তবে স্বীকার করতেই হয়— গদ্য অর্থাৎ যাকে বলে বাংলা গদ্য, তা আমি পড়ি-ই না।’ সন্দীপনের কবিতা যাপনের অভ্যাস কেউ কেউ জানতেন, অজানা ছিল অনেকের; তাঁর বাক চাতুর্য আর গদ্যসত্ত্বার আড়ালে এতদিন ঢাকা ছিল তীক্ষ্ণ কবিস্বভাব। গুণমুগ্ধ সহচর প্রশান্ত মাঝিকে একবার বলেছিলেন সন্দীপন, ‘ কবিদের সংস্পর্শে এসেই গদ্য লিখতে পেরেছি, শুধু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়লে, লিখতে পারতাম না। জীবনানন্দ দাশ পড়েই তবে গদ্য লিখতে পেরেছি।’ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কবিতা নিয়ে তাঁর ভাবনা চিন্তা লুকিয়ে রাখতেন না। কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক, মুখে মুখে কবিতা বলে যেতেন, মনে মনে আওড়ে যেতেন বহু কবিতার পঙক্তি— এসব খবর জানতেন তাঁর ঘনিষ্ঠজন আর একান্ত কবিবন্ধুরা। ‘কবি সন্দীপন’ এখন আর গদ্যের আড়ালে ঢেকে পড়া প্রতিভা নন, মৃত্যুর পর, তাঁর কবিসত্ত্বা বিলম্বিত প্রকাশ্যে আবির্ভাব’ আমাদের বিস্মিত, পুলকিত করছে। সন্দীপন কবিতা লিখতেন ডায়রিতে, জীর্ণ পাতায়, অনেক সময় একই কবিতা লিটল ম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে, ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন শিরোনামে। নানারকম বন্ধু সূত্র আর লিটল ম্যাগের ভিতরে তল্লাশি চালিয়ে এবার এসব প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতার সঙ্কলন প্রকাশ করেছেন প্রশান্ত মাঝি, ‘ঈশ্বর ও জোৎস্না’ নামের আধারে। প্রশান্তর দুঃসাধ্য পরিশ্রমকে কুর্নিশ। সংকলনটিতে ব্যক্তিগত নিবেদন পেশ করেছেন ভারতীয় কবিতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী জয়।
বা. উ
স ন্দী প নে র অ ভ্রা ন্ত স্বা ক্ষ র
এ-কথা সকলেই জানেন, বাংলা গদ্যে একেবারে নতুন স্টাইল আবিষ্কার করেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় । সন্দীপনের আগে এমন গদ্য বাংলা ভাষায় ছিল না । সন্দীপন শুধু গদ্যভাষাকেই ভাঙেননি, তিনি বাংলা গল্প-উপন্যাসের ন্যারেটিভকে দুমড়ে-মুচড়ে এমনভাবে ভেঙেচুরে নিজের পথে এগিয়ে ছিলেন যে, বলা যায় সেই পথে সন্দীপন ছিলেন দ্বিতীয় রহিত। কেবল গল্প আর উপন্যাসই নয়, অজস্র লিটল ম্যাগাজিনে আজীবন তাঁর যেসব ছোটো ছোটো গদ্যলেখা ছাপা হয়েছে সেসব লেখাও তার অনন্যস্বভাবে পাঠককে চমৎকৃত করে। সেইসব ছোটো আকারের স্বাধীন রচনা সংকলিত হয়েছে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের দুই খণ্ডে প্রকাশিত গদ্যসমগ্রে ।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার একবার আমি গ্রহণ করেছিলাম কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশে। সেই সাক্ষাৎকারের প্রশ্নমালার উত্তর দেওয়া যখন সম্পূর্ণ হয়েছে এবং টেপ রেকর্ডারে সেই উত্তরগুলি ধরে রাখার কাজ পুরোটাই হয়ে গেছে, তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার পথে এগিয়ে দিচ্ছি যখন, তখন আমাকে সন্দীপন জানান ‘গদ্য আমি পড়ি না।’ এটুকু বলে আমার বিস্ময় বিহ্বল অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে সন্দীপন তার পূর্বের বলা কথাটির সঙ্গে আরও একটি বাক্য যোগ করেন সেই অননুকরণীয় বাকভঙ্গিতে: ‘যদি একটুও বানিয়ে না বলি তবে স্বীকার করতেই হয়— গদ্য, অর্থাৎ যাকে বলে বাংলা গদ্য, তা আমি পড়ি-ই না। কবিতা পড়ি। সব কবিতা।”
সকলেই এ কথা জানেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় মেলামেশা করতেন প্রধানত কবিদের সঙ্গেই। উৎপলকুমার বসু ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেমন তারই সমসাময়িক পঞ্চাশ দশকের কবিবন্ধু, তেমনই তাঁর বন্ধুত্ব ছিল পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের সঙ্গেও। যেমন ভাস্কর চক্রবর্তী। তবে সন্দীপন যে কখনো কখনো কবিতাও রচনা করেছেন সে-কথা অনেকেরই অজানা। কারণ সন্দীপনের ঐন্দ্রজালিক সম্ভারের আড়ালে সেসব কবিতা আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছিল।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যরচনা পড়ে, তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়ে এ-কথা বোঝা যায় যে এই লেখকের মর্মে মিশে আছে কবিতা । কিন্তু সে তো গদ্যের অন্তঃসারে মিশ্রিত কবিতা-নির্যাস । এবারে এই ‘ঈশ্বর ও জোৎস্না’ নামক ক্ষুদ্র বইটির মধ্যে সন্দীপনের কবি-প্রতিভার অভ্রান্ত, স্বাক্ষর পাওয়া গেল । বিশেষভাবে আমি বলতে চাই দুটি কবিতার কথা । প্রথমটি হল ‘৩৮ বছরের শোক’ এবং দ্বিতীয় হচ্ছে ‘কুষ্ঠরোগিনীর জন্য এপিটাফ’ । এমন সার্থক কবিতা কেবল একজন সত্যিকারের কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব । পাঠক এই বইয়ে এক নতুন সন্দীপনের খোঁজ পাবেন । যেমন ‘আমার প্রথম স্মৃতি’ কবিতায় ‘তদবিরে’ শব্দটি যে-অর্থ নিয়ে প্রযুক্ত হয়েছে, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা প্রায় আর পাওয়া যাবে না । ‘প্রায়’ কথাটি ব্যবহার করলাম একটি কারণে । শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার চতুর্দশপদী কবিতাবলীর ৩০ সংখ্যক সনেটে এনেছিলেন এমন লাইন: বেশ্যার নিকটে গিয়ে বলিল না : সম্ভ্রম উঠাও / দেখি হে তদবির ভরা দেহখানি…
বাংলা সাহিত্যকে এঁরা দুজনেই অশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন । খুঁজলে এমন দুর্লভ সূত্র আরো পাওয়া সম্ভব কি? মনে হয় না । সন্দীপনের কবিতাও এবার বাংলা কাব্যকে জয়যুক্ত করার পথে অগ্রসর হল । হ্যাঁ, সন্দীপনের মৃত্যুর পরেই ।
জয় গোস্বামী
জানুয়ারি, ২০২০
‘কবিতা লিখি না; কারণ হল কবিতা লিখতে পারি না ।’
‘কোনটা গদ্য কোনটা পদ্য, বুঝব কী করে, এ কি সম্ভব নাকি বোঝা কোনটা কী !’
স ন্দী প ন চ ট্টো পা ধ্যা য়
পুষ্প প্রদর্শনী
১.
আমার ধারণা ছিল বারান্দার গ্রিলে জুঁই গাছটা মরে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে অনেকগুলো ডাল শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেল। শেষের গুঁড়ির দিকে সবুজটুকুও সরিয়ে যখন খয়েরি হতে শুরু করল, আশা বলতে আর কিছুই রইল না। কিন্তু অবাক কাণ্ড। আজ সকালে অনেক নতুন মুখ দেখি ডালে ডালে। যদিও ফুল ফলে না, আপাতত পাতা। ওহো, অধিকারবোধ কী ভয়ঙ্কর জিনিস। এত যে উৎফুল্ল লাগল, গাছটি আমার বলেই তো। অন্যের টবেও তো এ-জিনিস ঘটে। লক্ষ্য তো করি না ।
২.
কালীঘাটে সঞ্জয়ের বাড়ি যেতে দেড়হাত চওড়া গালি।
রাত্রে বৃষ্টি হয়েছিল। এখন সকাল ৮টা। গলির হ্যালোজন আলো দুটি এখনো নেবানো হয়নি। আকাশ আবার ঝুলে পড়ছে মেঘে। এবড়ো-খেবড়ো গলির অন্ধকারে গোষ্পদ জলের ওপর পড়ে আছে ক-টি
আলোর ভূঁইচাপা। এরা ফুল নয় এ-কথা সত্যি না। যে কারণে এদের একটিকেও
আমি মাড়াতে পারি না ।
অদৃশ্য মানুষ
আমরা সব অদৃশ্য মানুষ ।
কারো কোনো অভিজ্ঞতা হয় না ।
ওর অভিজ্ঞতা কী আমি জানি না ।
আমার অভিজ্ঞতা ও জানে না ।
আমরা জানি যে এই না-জানা এও নয় অভিজ্ঞতা ।
অভিজ্ঞতা হয় না ।
যখন লাখে লাখে
মহাভারত ইত্যাদি লেখা হচ্ছে তখন নীরবতা হতে পারে একমাত্র জ্ঞানী নীরবে হাসতে পারে ।
ভাষা । মূর্খের ভিড়ে একজন
জ্ঞানী নীরব হাসতে পারে।
কুষ্ঠরোগিনীর জন্য এপিটাফ
দাঁড়াও পথিকবর;
চুম্বনরহিত এই ওষ্ঠ ও অধর ।
কাছে এসে চলে যাও কে প্রিয় যুবক
মান্য করো এ স্মৃতিফলক ।
মাটির ভিতরে আছে মুখশ্রীর ছাপ
বালিকার অভিমান
নীরবতা
চুম্বন, নিষ্পাপ
কে নেবে এ-সব ?
তুমি অন্ধকার হলে
জোনাকির মাল্য গলে
দাঁড়াও অদুরে এসে
একাকী বৃক্ষের অবয়ব ।
পাখির দানার বাটিটা
পাখির দানার বাটিটা
জলের বাটি থেকে একটু দূরে সরিয়ে রেখো, মেয়েরা,
ওরা চান করে
ও দানা ভিজিয়ে ফ্যালে ।
দানা ভিজে গেলে ওরা খায় না ।
ডায়েরি থেকে
১
মেঘের দিকে পিঠ দিয়ে হাসছি…..
পিঠ পুড়ে যাচ্ছে ।
সন্দেহহীন চোখে তাকিয়েছি ফুটপাথে
কুকুরছানা, নেড়ি, বাদামি-কালোর সংসার
আলুর চোকলা
অপেক্ষা করছে ময়লা ফেলার গাড়ির
গাড়িওয়ালা হাসছে….
যে নেই তারজন্য পিঠ পুড়িয়ে কী লাভ
গুরুতর হয়ে উঠবে
সব দৃশ্য ভেঙে যাবে
যদি না বেজে ওঠে
ডিং ডং…..
২
হরিণের শিং সুন্দর ।
পা কুৎসিত ।
কিন্তু পা-ই বাঁচায় ।
শিং-এ লাতাপাতা জড়িয়ে যায় ।
আটকে যায় । পালাতে পারে না ।
৩
কিছুই জানতাম না । না-জানার জন্য
কোনো ক্ষতি হয় না,
বেঁচে থাকা বুননের একটু সুতোয়
ছিঁড়তে পারে না ।
শুধু একটিমাত্র না-জানাই হচ্ছে
নিজের প্রতি ক্রিমিনাল আচরণ করা
তাহল আমি কতদূর শারীরিকভাবে
নষ্ট তা না জানা ।
গুঁড়ি মটমট করার আগে,
গাছের মত, আমি কোনোদিন
জানতে পারব না যে পড়ে যাচ্ছি।
A POEM
সবসময় পিছনে টিকটিক করো কেন
এখন ঘড়ির টিকটিক শোনার সময় নয়
এখন ঘড়িতে শুধু ঘন্টা বাজবে ।
এপিটাফ
ভুল নামের সেই ঢ্যাঙা ছেলেটা
যাকে বামনের সামনে আর
নতমাথায়
দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না ।
ঘুম-বিষয়ে দুটো-চারটে কথা
১
মানুষ যে-সময়টা চুপ করে বসে
থাকে, সেটাই তারা সারাদিনের
শ্রেষ্ঠ সময় । যে যতটা চুপ করে
বসে থেকেছে সে জীবন উপভোগ
করেছে তত বেশি । কেউ কেউ
বলতে পারেন, কেন, তাহলে তো
যে যত ঘুমিয়েছে সে তত….
না-না, ঘুম নয় । ঘুম
নয় । ঘুম নিঃশর্ত নয় ।
ঘুমে আছে স্বপ্নের অতর্কিত হানা ।
তার নিঃশব্দ কোলাহল ।
২
যারা ঘরে ঘুমোয় প্রতিরাতেই
তাদের ঘরবাড়ি খোয়া যায়, যখন
তারা ঘুমিয়ে পড়ে
এ-ভাবে প্রতি রাতে তারা ঘর-সংসার
হারায়, আবার ভোরে ফিরে পায়
যে কেড়ে নেয়, সে-ই
আবার ফিরিয়ে দেয় ঘরবাড়ি
দিতে দিতে তারপর একদিন আর দেয় না
৩
এখন, শেষ জীবনে, স্বপ্নে, জীবিতের
তুলনায় মৃতদের আনাগোনাই বেশি ।
জীবনের আজো জীবিতদের
দু-একজন যারা স্বপ্নে আসে, তারা যেন
আসে মৃতদের বিশ্বাসযোগ্যতা দিতেই ।
তারা চুপ করে থাকে ।
৪
ঘুমের দিকে অবিরাম
অবিরাম ভারে
নত
হয়ে
পড়ে
সমস্ত জীবন
জীবনের একমাত্র সফলতা
মনে
হয়
ঘুম
শ্লথ ও নীতিবল্গাহারা ঘুমের ভিতর
ঘুমিয়ে
থাকা
আরো ঘুম
যা ঢলে পড়ছে ঘুমেরই বুকে…
ভালোবাসা
ভালোবাসা জেগে উঠলে নির্বুদ্ধি স্তূপাকার হতে থাকে । আজ
সেই পরিত্রাতা নির্বোধ আর নেই, আজ সিংহাসন জুড়ে বসে আছে ভারি ও বৃহৎ
মস্তিষ্ক, হৃদয়ের সাধ্য নেই তাকে নামায় ।
আজ কে কার আসনে বসে আছে ।
কৃতজ্ঞতা প্রশান্ত মাঝি, ভালো বই
❤ Support Us










