- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ২৫, ২০২৬
মহানায়ক বনাম খলনায়ক
১৯২৫ ও ১৯২৬ সালে বহু কৃতি বাঙালির জন্ম হয়েছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক, মহাশ্বেতা দেবী, সন্তোষ দত্ত, ভূপেন হাজারিকা, বাদল সরকার উত্তমকুমার, মঞ্জু দে প্রমুখ ব্যক্তিত্বের আলোকজ্জ্বল জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। এঁদের মধ্যে সুকান্ত নিয়ে গতবছর থেকে মাতামাতি শুরু হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চুপ, তাঁদের যুক্তি, অদ্ভুত, হাস্যকর। কিন্তু যে কিশোর কবি সহজ-সরল সত্য উচ্চারণ করতে পারেন, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ তাঁকে নিয়ে বাঁধভাঙা আবেগ রোখা যায় না। সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং মঞ্জু দে কে নিয়ে আলোচনা করে করব।
আজ শুধু উত্তমকুমার। খলনায়ক হিসেবে তাঁর অভিনয় কতটা সফল হয়েছিল, আদেও হয়েছিল কি না! আর অমোঘ সে প্রশ্ন, নায়ক থেকে খলনায়কের যাত্রায় ক্লান্তি আর গ্লানি গ্রাস করেছিল কি না বাংলার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার উপর? জরুরি এসব প্রশ্নের উপর সামান্য আলোকপাত করা দরকার।
উত্তমকুমারের শেষ সম্পূর্ণ অভিনয় ‘প্লট নং ফাইভ’-এ। এ ছবির কাজ সম্পূর্ণ করে, বম্বে থেকে ফিরে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে অভিনয়, যা সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি তিনি। পরে ডামি দিয়ে সম্পূর্ণ করা হয়। ‘প্লট নাম্বার ফাইভ’ যোগেশ সাক্সেনা-র সাসপেন্সপূর্ণ হিন্দি ছবি। সিরিয়াল কিলারের কাহিনি
উত্তমকুমারের শেষ সম্পূর্ণ অভিনয় ‘প্লট নং ফাইভ’-এ। এ ছবির কাজ সম্পূর্ণ করে, বোম্বে থেকে ফিরে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে অভিনয়, যা সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি তিনি। পরে ডামি দিয়ে সম্পূর্ণ করা হয়। ‘প্লট নাম্বার ফাইভ’ যোগেশ সাক্সেনা-র সাসপেন্সপূর্ণ হিন্দি ছবি। সিরিয়াল কিলারের কাহিনি । উত্তমকুমারের সঙ্গে ছিলেন অমল পালেকর, প্রদীপ কুমার, শ্রীরাম লাগু, আমজাদ খান, সারিকা, সরিতা, বিদ্যা সিনহা প্রমুখ। সঙ্গীত পরিচালনায় সলিল চৌধুরী, যদিও তাঁর স্বকণ্ঠে কোনো গান এতে নেই। অজয় মেহেরা এবং সঞ্জয় মেহেরা নামের দুই দুই ব্যবসায়ীর গল্প ছড়িয়ে আছে ‘প্লট নাম্বার ফাইভ’-এ। সঞ্জয় মেহেরা-র ভূমিকায় উত্তমকুমার এবং ছোট ভাই অজয় মেহেরার ভূমিকায় অমল পালেকর। তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত আছে বহুজনের। দেখা যায়, ১৯৭৯ সালে পরপর খুন হচ্ছেন উচ্চাকাঙ্খী শহুরে তরুণীরা। অকুস্থূল একটি নাইট ক্লাব। দুই ভাই নৈশ ক্লাবের মালিক। অমল পালেকর অভিনয়ে পাল্লা দিয়েছেন উত্তমকুমারের সঙ্গে। সঙ্গী তাঁর পারিবারিক ডাক্তার বন্ধুর ভূমিকায় প্রদীপকুমার এবং অন্যান্যরা। খুনের তদন্তে নামলেন ইনস্পেকটর আমজাদ খান। কিন্তু ‘শোলে’-র মতো তাঁর ভূমিকা ততটা উজ্জ্বল নয়। খুনের কৌশল প্রতি ক্ষেত্রে আলাদা। অজয় মেহেরা আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে অপরাধী পাকড়াও করতে নামলেন। পরপর কীভাবে একের পর এক তরুণী খুন হচ্ছেন, তিনি তা খুঁজে বের করতে মরিয়া। অবশেষে জানা গেল হুইল চেয়ারে বসে যাঁর জীবনযাপন, যে কোমর থেকে একেবারে পঙ্গু, সেই সঞ্জয় মেহেরা-ই সব অঘটনের নেপথ্যে। পঙ্গু হওয়ায় সুন্দরীদের সঙ্গলাভে অপারগ হয়ে তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে, সে এক রহস্যাবৃত তৃপ্তিতে মেতে থাকে। পঙ্গু হলেও হুইলচেয়ার বসে বাইরে বেরিয়ে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে নিজেই চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় যখন তখন। সরাসরি ধরা না দিয়ে সহোদর ভাইকে চিঠিতে স্বীকার করে, উঁচু পুল থেকে গাড়ি নিচে ফেলে আত্মহত্যা করে।
ছবিতে উত্তমের হিন্দি উচ্চারণ বেশ সাবলীল। দর্শক বা তদন্তকারীর কেউ-ই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখেননি। এখানেই তাঁর অভিনয়ের মুন্সিয়ানা। তাঁর মৃত্যুর পর রিলিজ হয় ‘প্লট নাম্বার ফাইভ’। কলকাতার এলিট সিনেমা হলে দশ সপ্তাহ চলেছিল। ‘গুরু’র শেষ ছবি বলে কথা। অন্যান্য শহরে অবশ্য তিন-চার সপ্তাহের বেশি চলেনি।
স্বাধীনতার আগে পরে, সবথেকে চাঞ্চল্যকর পাকুড়ের ঘটনায় বহুবছর মজে ছিল বাঙালি। পীযুষ বসু উত্তম কুমারকে বিরাট পরিসর দিয়েছিলেন খলনায়কের ভূমিকায়। দুর্দান্ত অভিনয়ে এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে তিনি মাতিয়ে দিয়েছিলেন দর্শক সাধারণকে
হীরেন নাগের পরিচালনায় ‘অন্ধ অতীত’-এ উত্তমকুমার বিমা কোম্পানির এজেন্ট, নির্মলেন্দু রায়। উচ্ছৃঙ্খল পুরুষ, শেষে একজন খুনি। এখন যদি দেখে নিই, পরিচালক হীরেন নাগের সিনেমা : ‘চেনা অচেনা’, ‘সাবরমতী’, ‘বিগলিত করুণা, জাহ্নবী যমুনা’, ‘টুনি বউ’ ইত্যাদি, তাহলে বোঝা যায় একমাত্র ‘অন্ধ অতীত’- জুড়েই ছিল সাসপেন্স ছিল। এই চলচিত্রে দুভাবে অভিনয় করেছেন উত্তমকুমার। প্রথমে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সংসারে তিনি অমিতব্যয়ী, বিপর্যস্ত এক পুরুষ। আয়ের থেকে ব্যয় বেশি। ধার করতে হয় সুদখোর ও চরিত্রহীন ধনঞ্জয় সাহার কাছ থেকে। স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির সময় জানিয়ে দেন, তিনি এজেন্টের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। হঠাৎ ধনঞ্জয় সাহার একটি চিঠি পেলেন নির্মলেন্দু রায়, যাতে লেখা ১৯৬৯ সালের ১৫ এপ্রিল অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ ধার করা তিন হাজারের কিছু বেশি টাকা নিয়ে আসতে হবে, দেনা শোধ করতে। টাকা ছাড়াই তিনি এলেন ক্রুদ্ধ হয়ে। ধনঞ্জয় তখন দাবি করে, তোমার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দাও। মাথা ঠিক রাখতে পারল না আপাত নিরীহ নির্মলেন্দু। পাশে পড়ে থাকা লোহার ডান্ডা বসিয়ে দিলেন ধনঞ্জয়ের মাথায়। এক আঘাতেই সব শেষ। চলে যাওয়ার সময় সিঁড়ির কাছে রাখাল দাসকে দেখতে পেলেন। একদা ডাকবিভাগের বিশ্বস্ত চাকুরে, টাকা চুরির দায়ে জেলখাটা আসামি। তাঁকেই ধনঞ্জয়ের খুনি বলে চাউর করে দিলেন নির্মলেন্দু।
হীরেন নাগ নিজেই ছবির কাহিনিকার। অসামঞ্জস্য থাকা স্বাভাবিক। কারণ একজন বললেই তাকে স্বাক্ষী করে বিচার হয় না। রাখালের ছেলে দীপক ( স্বরূপ দত্ত) ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ে নির্মলেন্দু রায়ের মেয়ের সঙ্গে। কিন্তু যখনই ভাবী-শ্বশুর তাদের ভালোবাসার কথা জানতে চান, দীপক সরাসরি প্রশ্ন তোলে, ধনঞ্জয় সাহার খুনি কে? কারণ, খুনি বলে যাঁকে দায়ি করা হচ্ছে সে রাখাল সাহা তার বাবা। বরাবর সৎ থেকেও তাকে জেল খাটতে হচ্ছে বারবার। চাপ সহ্য করতে না পেরে নির্মলেন্দু রায় একটি চিরকুটে ‘আমাকে তোমরা ক্ষমা করো লিখে’ স্ত্রীর( সুপ্রিয়া) কাছে পাঠিয়ে, কিছুদূর গিয়ে চলন্ত অবস্থায় গাড়িসহ নিজেকে গড়িয়ে দিলেন খাদে। নায়ক হিসেবে উত্তম কুমারের খ্যাতি তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, পরিচালকগণরাই তাঁর বারোটা বাজিয়ে দিলেন।
উত্তমকুমারকে খলনায়কের ভূমিকায় সব থেকে বেশি দেখা গেছে পীযূষ বসুর পরিচালনায়। ‘জীবন জিজ্ঞাসা’, ‘রাজবংশ’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘দুটি মন’ এবং ‘বাঘবন্দি খেলা’-র মতো ছায়াছবিতে, পরপর একই ধরণের অভিনয় তাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়া হলো।
‘রাজবংশ’ পীযুষ বসুর নিজের লেখা কাহিনি। সম্ভবত এতে প্রভাব পড়েছে পরাধীন ভারতের পাকুড়ের জমিদারের মর্মান্তিক বৃত্তান্তের।
ময়নামতী এস্টেটের জমিদার লক্ষ্মীনারায়ণ। কলকাতায়ও তাঁদের বাসাবাড়ি আছে। যখন যেখানে থাকেন বাঈজির সঙ্গলাভ চাই। তিনি স্বীকার করেন না বড় ছেলে প্রতাপনারায়ণকে। কারণ তিনি ময়নামতিরই এস্টেটের আশ্রয়ে থাকা এক রক্ষিতার ছেলে। জমিদার তাঁর বেশির ভাগ সম্পত্তি উইল করে রেখে যেতে চান ছোট ছেলে রামনারায়ণকে। সামান্য কিছু দেবেন প্রতাপনারায়ণকে। বেঁকে বসেন প্রতাপনারায়ণ।
অভিনয়ে প্রতাপনারায়ণ উত্তম কুমার এবং রামনারায়ণ দিলীপ রায়। ছোট ভাই খুব ভালবাসে বড়ভাইকে। কিন্তু সম্পত্তি ভাগে তাঁর হাত নেই। এই ঝামেলায় ঢুকে পড়েন পারিবারিক ডাক্তার। সে ভূমিকায় বিকাশ রায়। একদিন ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে, তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাঁর স্ত্রীকে বলাৎকার করে জমিদার। ডাক্তারের স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। তাঁদেরই ছোট্ট মেয়ে ( আরতি ভট্টাচার্য)। জমিদারকে শায়েস্তা করার জন্য ডাক্তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন প্রতাপনারায়ণের। ডাক্তারের সাহায্য নিয়ে প্রথমে লক্ষ্মীনারায়নকে নাপিতের খুরে বিষ মিশিয়ে হত্যা করে প্রতাপনারায়ণ। পরে ডাক্তার তাঁর অবাধ্য হলে তাকেও খুন করে। সবশেষে ছোট ভাই রামনারায়াণকে। এই বিষ প্রতাপনারায়ণ আনিয়েছিলেন উড়িষার জঙ্গল থেকে। পাকুড় জমিদারেরও ছিল দুই ছেলে অমরেন্দ্র এবং বিজয়েন্দ্র। সম্পত্তির ভাগ ছোটকে দেবেন না বলে, বড় ভাই অমরেন্দ্র প্লেগ রোগের বিষ আনিয়েছিলেন বোম্বের আর্থার রোডের হপকিনস ইনস্টিটিউট থেকে। তখন কলকাতাসহ সমস্ত পূর্বাঞ্চল থেকে চলে গেছে প্লেগ রোগের প্রার্দুভাব। তাই কষ্ট করে পেতে হয়েছে রোগের বীজাণু। হাওড়া স্টেশনে ট্রেনে ওঠার সময় বিজয়েন্দ্রের শরীরে ইনজেক্ট করা হয়, মৃত্যু হয় এক সপ্তাহের মধ্যে। স্বাধীনতার আগে পরে, সবথেকে চাঞ্চল্যকর পাকুড়ের ঘটনায় বহুবছর মজে ছিল বাঙালি। পীযুষ বসু উত্তম কুমারকে বিরাট পরিসর দিয়েছিলেন খলনায়কের ভূমিকায়। দুর্দান্ত অভিনয়ে এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে তিনি মাতিয়ে দিয়েছিলেন দর্শক সাধারণকে। এইভাবে, সাফল্য আর দক্ষতার জোড়ে, মহানায়ক একদিন খলনায়ক হয়ে উঠলেন, এটা তাঁর অন্যধরণের নিয়তিরই মর্মান্তিক যাত্রা। শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরি’ সুম্পূর্ণ করে যেতে পারলেন না, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক, ঢলে পড়লেন মহাপ্রকৃতির কোলে।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








