- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ৪, ২০২৬
স্মৃতি-মানসে উদারবন্দ
চিত্রকর্ম: বি প্রভা
বহুচর্চিত সাত বোনের দেশ ভারতের এই উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এই অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্তে এবং মিজোরামের উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট এক ভূখণ্ড— বরাক উপত্যকা। এর পূর্বে মণিপুর, পশ্চিমে ত্রিপুরা আর উত্তরে কার্বি আংলং। বড়াইল, ভূবন, ছাতাচূড়া ইত্যাদি পাহাড়ে ঘেরা এক মনোরম স্থান। বরাক উপত্যকার মধ্যেই অবস্থিত এই উধারবন্দ। পাহাড়ঘেরা মালভূমির মতো মনমুগ্ধকর জায়গা যেন নীরবে সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। চণ্ডীঘাট, লারছিং, ডলু, অরুণাবন্দ, আরকাটিপুর, ইস্টামপুর ইত্যাদি অনেকগুলি সতেজ চা-বাগান এ অঞ্চলের সৌন্দর্যকে আরো প্রবল করে তুলেছে। আমার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো কেটেছে এই উধারবন্দে।
আমাদের গ্রামের নাম ছিল ভাটিগ্রাম। কিন্তু নামটা সুন্দর নয় বলে এখন আর কেউ এই নাম ব্যবহার করে না। এখন বলা হয় দুর্গানগর চতুর্থ খণ্ড। পরগণা উধারবন্দ, জিলা কাছার। উধারবন্দ নামের সাথে এখানকার অধিবাসীদের আত্মিক মমতা ও প্রাণখোলা ভালোবাসার বয়ে চলেছে স্রোতের মতোই। উধারবন্দ নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত। তবে পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছি, এককালে কাছারের রাজারা থাকতেন উধারবন্দের ঘাসপুরে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং গোবিন্দচন্দ্রের রাজধানী ছিল এই ঘাসপুর। সেখানে এখনো রাজবাড়ির চিহ্ন বর্তমান। ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা আজও চলে সেখানে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে উধারবন্দে বিরাট মাঠ ছিল। তখন সেখানে বন কেটে বসতি তৈরি হচ্ছে। বর্ষা-বাদল চলে গেলে রাজার লোকেরা এসে এই মাঠেই খাজনা আদায় এবং উপাধি বিতরণ করতেন। মাঠ বা বন্দেয় তাঁবু খাটিয়ে উপাধি বা উধা বিতরণ করা হতো বলে এই স্থানটির নাম হয় উধারবন্দ।
স্কুলে পঠনপাঠন শুরুর আগে প্রতিদিনের প্রার্থনাসভা, প্রতি শনিবার ছুটির আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুমনের মনন–চেতনাকে সূক্ষ্ম সুতোয় বেঁধে রাখত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্র–শিক্ষক সমবেত হয়ে আবৃত্তি, গান, হাস্যকৌতুকে পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তুলতেন।
স্বাধীনতার পর চা-বাগান ও গ্রাম ঘেরা এ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে ছিল বাজার, থানা, পোস্টঅফিস, হাইস্কুল, বেসিক ট্রেনিং সেন্টার ও কাঁচাকান্তি বাড়ি। বেসিক ট্রেনিং সেন্টার বুনিয়াদী শিক্ষাকেন্দ্র নামে পরিচিত। আমরা এই শিক্ষাকেন্দ্রের প্র্যাকটিসিং স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেছি। গান্ধীজী প্রবর্তিত বুনিয়াদী শিক্ষায় হাতে-কলমে শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। সে কারণেই এখানে কৃষিকাজ, সুতোকাটা, কাপড় বোনা ইত্যাদিও যত্ন নিয়ে শেখানো হতো। কেন্দ্রের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এই শিক্ষা-পদ্ধতির উপর বিশেষ জোর দিয়েছিল। সে সময় এই শিক্ষাকেন্দ্র উধারবন্দকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। বহু প্রথিতযশা ব্যক্তির আনাগোনা চলতে থাকে। আমরা যখন পাঠশালায় নিচু ক্লাসে তখন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহরলাল নেহরুও এখানে এসেছিলেন। বিদ্যালয়ের কচিকাঁচাদের জন্য তাঁর সঙ্গে দিল্লি থেকে এসেছিল মিষ্টি খেজুর। প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ও পরে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীও। এই বুনিয়াদী শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়মানুবর্তিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, পরচ্ছন্নতা, সর্বধর্ম সমন্বয়বোধ, চরিত্রগঠন, ইত্যাদি ছিল অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন শিশু বড়ো হয়ে পরবর্তী জীবনে যাতে অলসতার পরিবর্তে কর্মমুখর হয়ে ওঠে সে ব্যবস্থা গোড়া থেকেই এখানে করা হয়েছিল। স্কুলে পঠনপাঠন শুরুর আগে প্রতিদিনের প্রার্থনাসভা, প্রতি শনিবার ছুটির আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুমনের মনন-চেতনাকে সূক্ষ্ম সুতোয় বেঁধে রাখত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক সমবেত হয়ে আবৃত্তি, গান, হাস্যকৌতুকে পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তুলতেন। বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এবং ট্রেনিং নিতে আসা শিক্ষকরা প্রতিবছর নিয়ম করে থিয়েটার করতেন। যার মান নেহাত মন্দ ছিল না। এর পাশাপাশি স্কুলে ছিল ছাত্রদের মন্ত্রীপরিষদ। খুদে মন্ত্রীরা মাসিক এবং বার্ষিক কাজের খতিয়ান দিতেন এবং অন্যরা বিরোধী পক্ষের মতো সমালোচনা করতেন। মোটকথা সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক পাঠও এখানে সবাই রপ্ত করতে পারতেন। স্বাধীনতার প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর পর থেকে বুনিয়াদী শিক্ষার গঙ্গাযাত্রা শুরু হয়েছে সরকারি অবহেলায়।
বাবাকে রাতে সাপে কেটেছে। পা ফুলে ঢোল। দাদা গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললেন, তাঁর কিছু করার নেই, ওঝা ডেকে আনতে। ওঝা এল, ঝাড়ফুঁক চলল বিস্তর। কিন্তু বিষ কিছুতেই নামে না। রাতে অন্য আরেকজন ওঝা এল। এমন সময় পাশের গ্রাম করইকান্দির মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের নিজস্ব ওঝা নিয়ে হাজির।
উধারবন্দের কাঁচাকান্তি বাড়ির নামডাক এখনকার তুলনায় তখন তেমন একটা ছিল না। একটা টিনের ছোট্ট ঘরে প্রতি রবিবার পুরোহিত এসে পুজো করতেন। কাঁচাকান্তি বাড়ির সামনে ছিল মহীরুহ বটের ছায়া। আমদের সহপাঠী অনাথবন্ধু প্রায়ই স্কুল পালিয়ে ওই বিশালাকার গাছটির কোঠরে লুকিয়ে থাকত। ঘটনা জানাজানি হতে, একদিন প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের নির্দেশে তিন-চারজন ছাত্র গিয়ে তাঁকে ‘অ্যারেস্ট’ করে এনেছিল। তারপর অনাথবন্ধুর কপালে জুটল কঠোর শাস্তি। শাস্তির কথা যখন উঠলই, তখন হেডমাস্টার, তজমুল আলি বড়লস্কর মহোদয়ের শাস্তির ভয়াবহতার কথা বললেই হয়। তিনি ছাত্রদের শাস্তি দিতেন কালেভদ্রে, তবে তা ছিল মনে রাখার মতো। কোনো ছাত্র মারাত্মক দোষ করলে তিনি তাকে স্কুলবারান্দায় বা উঠনে এনে নিজে পরশ্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দয়ভাবে বেত্রাঘাত করতেন। তিনি সাইকেলে চেপে রোজ স্কুলে আসা-যাওয়া করতেন। একদিন আমার বাবা তাঁকে রাস্তায় বললেন যে, ‘আমার বড়ো ছেলে তো বি এ পাশ করেছে…’। খবরটা শুনেই তিনি বললেন, ‘কালকেই আমার স্কুলে পাঠিয়ে দেবেন।’ ব্যাস, হয়ে গেল দাদার চাকরি। সে সময় তজমুল আলী সাহেবের মতো জনপ্রিয় উধারবন্দে খুব কম লোকই ছিলেন। এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তীকালে তাঁকে অসম বিধানসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিল। যাক, ফিরে আসি শাস্তির কথায়। বাংলার শিক্ষক বসারত আলী সাহেবের শাস্তি দেওয়ার ভঙ্গিটি ছিল বিচিত্র। ছাত্রদের পেটে কাঁকড়া-চিমটি দেওয়া ছিল তাঁর ভীষণ পছন্দের। এ ছাড়াও অদ্ভূত সব খিস্তি ঝাড়তেন তিনি। ‘একটা আস্ত হিপো-পটেমাস’, ‘গর্জনশীল চল্লিশা’, ‘ওরাং ওটাং’— ইত্যাদি মন্তব্য নিত্যদিন ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ছুটে যেত। একবার ‘আপণ’, ‘আপন’— এই দুটি শব্দ দিয়ে একটি বাক্যরচনা করতে গিয়ে এক ছাত্র লিখেছিল— ‘আপণে থাকে মহাজন, সে তো নয় আমার আপনজন, আপনজন তো হাটেবাজারে মিলে’। সে সময় তপন সিংহের ‘আপনজন’, ‘হাটেবাজারে’ ইত্যাদি সিনেমা রমরমিয়ে চলছে। ছাত্রের এহেন রসবোধ দেখে বসারত আলী সাহেব তার খাতায় মন্তব্য করেছিলেন— ‘তুই মানুষ না পায়জামা, তোর মাথা খেয়েছে সিনেমা, তীরে এসে তরী ডুবিয়ে দিলে’। তাঁর শাস্তি এবং খিস্তির মধ্যে আনন্দের খোরাক ছিল। খেলাধূলা, গানবাজনাতেও উধারবন্দের সুনাম ছিল। প্রতিবছর জিলা প্রতিযোগিতায় হাডুডু, ভলিবল আর ফুটবলে উধারবন্দের খেলোয়াররা নজর কারতেন। গানবাজনায় আলো ছড়াতেন ঋষিকেশ ধর, মিহির পাল, চন্দ্রকলা সহ আরো অনেকে।

তখনকার দিনে উধারবন্দের মানুষের মধ্যে ছিল এক আকাশ আন্তরিকতা। দেখে মনে হতো, গোটা অঞ্চলটাই যেন একটা পরিবার। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনোদিন ছুঁতে পারে এ তল্লাট। এখনো ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পর নিশ্চিন্তে সম্প্রীতির বার্তাবাহক হয়ে বসবাস করছেন এখানে। ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার কথা শোনাই, আমি তখন খুব ছোটো। একদিন সকালে দেখি বাড়িতে হইচই, বাবাকে রাতে সাপে কেটেছে। পা ফুলে ঢোল। দাদা গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললেন, তাঁর কিছু করার নেই, ওঝা ডেকে আনতে। ওঝা এল, ঝাড়ফুঁক চলল বিস্তর। কিন্তু বিষ কিছুতেই নামে না। রাতে অন্য আরেকজন ওঝা এল। এমন সময় পাশের গ্রাম করইকান্দির মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের নিজস্ব ওঝা নিয়ে হাজির। অবশ্য, তাঁকে আর প্রয়োজন হয়নি, সে রাতেই বিষ নেমে গেল। অনাহুত স্বজনদের আন্তরিকতা দেখে সে বয়সেই তাজ্জব বনে গেছিলাম। আমার মনে হয়, উধারবন্দের বহমান সম্প্রীতির মূলে হয়তো বা আছে কাঁচাকান্তি দেবী আর পীর মখা শাহের আশীর্বাদ।
মনে পড়ে, আমরা তখন ক্লাস ফোর। উনিশে মে। শিলচর থেকে বয়ে এল ভাষা আন্দোলনের কথা। সেদিন মানুষের মধ্যে সে কি উন্মাদনা! পুলিশের গুলিতে কয়েকজন মারা যাওয়ার পর, চারদিকে দৌড়ঝাঁপ। অগ্নিগর্ভ শিলচর রেলস্টেশন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে ঝাঁপ দিলেন স্টেশনের পুকুরে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে পুকুরে জাল ফেলে উদ্ধার করা হয় কয়েকজনকে। মারা যান একজন। সেদিন বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় মোট এগারো জন শহিদ হয়েছিলেন।
উধারবন্দের কথা বলতে গেলে, এ অঞ্চলের সুসন্তান স্বাধীনতা সংগ্রামী সনৎ কুমার দাসের কথা বলতেই হবে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো বড়ো চোখ আর চুলদাড়ি সমন্বিত সিংহপুরুষ সনৎবাবুকে ‘কাছাড় কেশরী’ বলত সবাই। এর পিছনে একটা গল্প আছে। স্বাধীনতার পর অবিভক্ত কাছাড়, ত্রিপুরা ও মণিপুরকে নিয়ে পূর্বাচল রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছিল। তিনি সে দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন। এ ব্যাপারে অবিভক্ত কাছাড়ের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাথে তিনি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন। বৈঠকে তাঁরা পূর্বাচল প্রস্তাবকে বাস্তবায়িত না করবার বিষয়ে জোরালো সওয়াল করেন। এই কৃতিত্বের জন্যই কাছাড়বাসী তাঁকে ‘কাছাড় কেশরী’ উপাধিতে সম্মানিত করে। সনৎ কুমার দাস আজীবন উধারবন্দ তথা কাছাড়ের খেটে খাওয়া মানুষের পরম বন্ধু ছিলেন। ভাষণ দিতে তাঁর মাইকের প্রয়োজন হতো না। শোনা যায়, বাঁশের তৈরি ছাতা নিয়ে তিনি না কি দিল্লি দিয়েছিলেন।
উধারবন্দের নানান বিষয় নিয়ে, প্রচুর ছড়া রচনা হয়েছে। লোকসাহিত্যে ছড়া রচয়িতারা প্রায়শই, সর্বদেশে-সর্বকালে যবনিকার অন্তরালে থেকে যান, কেবল তাদের ছড়া নিয়ে লোকে মাতামাতি করে। সনৎবাবুদের নিয়ে এমন একটি ছড়া আমরা প্রায়ই আওড়াতাম—
‘সনৎবাবুর লম্বা দাড়ি
পুলিন বাবুর ভাঙ্গা গাড়ি
মহিম পালের দোকানদারি
যোগেশ পালের জমিদারি’
আমি এখানে ছড়াগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন উধারবন্দের সামাজিক আবহাওয়ার সম্যক পরিচয় দিতে চেষ্টা করছি মাত্র। এর ফলে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে মাপ করবেন। কারণ ছড়া অনেক সময় সত্য বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে লঘু হাস্যরসের অবতারণা করে থাকে।
কুম্ভীরগ্রাম বিমানবন্দর থেকে উধারবন্দের বুক চিরে ভি.আই.পি রাস্তা চলে গেছে শিলচরে। রাস্তার অবস্থা তখন ভালো ছিল না। শিলচরের সাথে যোগাযোগ বর্তমানের মতো অনায়াসসাধ্য ছিল না। মুষ্টিমেয় কয়েকটা বাস-সার্ভিস যোগাযোগ রক্ষা করতো। উধারবন্দের জনজীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে নদী মধুরা। প্রাক্-স্বাধীনতা যুগে যাতায়াতের মাধ্যম রূপে ব্যবহৃত হয়েছে এই নদী। আমাদের পূর্বপুরুষ প্রতিবন্ধী শম্ভুনাথ দেশমুখ্য এই নদীপথে যাত্রা করে কাশী পর্যন্ত গিয়েছিলেন। যাত্রাপথের বর্ণনা আর মানচিত্র তিনি লিখে গেছিলেন নিজের হাতে। এ এক বিখ্যাত দলিল। মধুরার জল মিষ্টি, মধুরার ঘোড়ামাছ সুস্বাদু, মধুরার বালি বিখ্যাত।
উধারবন্দে প্রথম সাময়িকপত্র আমরা পাই ১৯৬২-৬৩ তে। বেসিক ট্রেনিং নিতে আসা পাঠসালার শিক্ষকরা মিলে প্রকাশ করেন তাঁদের মুখপত্র। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। উৎসাহের সঙ্গে পড়েছি সেসব। তাতে কী কী পড়েছিলাম এখন আর তা মনে নেই, থাকার কথাও নয়। তবে রমা পালের লেখা একতা ছড়ার ধাঁধাঁ কিছুটা মনে আছে—
‘অর্ধেক লম্বা কোন্ শহরটি
সাগর লম্বা কোন্ স্থানটি?
কোন্ স্থানটি বাঙালিরা ব্যঞ্জনেতে খায়
পরোক্ষেতে পয়সা দিয়ে রোগ কিনে তায়
কোন্ পাহাড়ের চূড়ায় ছাতা, কোথায় দুধের নদী…’
মধ্যের অংশ আর মনে নেই। শেষ দু-লাইন এরকম—
‘কোন্ নদীটির মাথা কাটলে লেখকের নাম পাই
বিভিত্র এ কোন্ নদী বলো দেখি সবাই।’
এই মুখপত্রের আগে আর কোনো সাময়িকপত্র ছাপার অক্ষরে উধারবন্দে প্রকাশিত হয়নি।
উধারবন্দে চাহিদার তুলনায় ডাক্তারের অভাব সবসময় ছিল। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে কৃষ্ণকুমার ভট্টাচার্য এখানকার বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। তিনি নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রোপচার করতে পারতেন। তারপর নীলকান্ত লোধ এবং আরো অনেকে এখানে চিকিৎসা করে গেছেন। ডাক্তারবাবুদের নিয়েও উধারবাসী ছড়া তৈরি করেছিল—
‘ননী ডাক্তার সাজে
লোধ ডাক্তার কাজে
ঘোষাল ডাক্তার যেমন তেমন
আর সব বাজে।’
আমরা আজঅ জানিনা ছড়াগুলো কে লিখেছে। কোনোদিন জানার চেষ্টাও করিনি । কিন্তু যখন-তখন যেখানে-সেখানে বলে গেছি মনের আনন্দে।
আজ উধারবন্দ জমজমাট শহর। যাতায়াতের পথ মসৃণ। সারাবছর কাঁচাকান্তি মন্দিরে আর শালগঙ্গা আশ্রম ভক্তদের সমাগমে মুখর। উধারবন্দের জুমের কুমড়া, আদা, হলুদ, চিড়া-মুড়ি কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোক ছুটে আসেন। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর অন্যদিকে শহরের ব্যস্ততা উপভোগ করতে হলে উধারবন্দই হবে ভবিষ্যতে পর্যটকদের আকাঙ্কার ভূখণ্ড।
♦♦•♦♦♦♦•♦♦♦♦•♦♦
লেখক ভূতপূর্ব অধ্যাপক, লালা রুরাল কলেজ, অসম।
❤ Support Us








