Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২২, ২০২৬

শিল্প-বিনিয়োগ টানতে জমি আইনে বদল ! ৭৬-এর ‘নগর ভূমি সীমা আইন’ পুনর্বিবেচনার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শিল্প-বিনিয়োগ টানতে জমি আইনে বদল ! ৭৬-এর ‘নগর ভূমি সীমা আইন’ পুনর্বিবেচনার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর

শিল্পায়নের পথে জমি অধিগ্রহণ সবচেয়ে বড়ো বাধা! অতীতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমিজটেই ৩৪ বছরের বাম জমানার পতন ঘটে বলে মনে করেন বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যদিও এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবু, জমি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েই যে বাংলার মসনদে নিজের বসার পথ আরও সুগম করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। ২৬-এ রাজ্যে আবার পালাবদল ঘটেছে। তৃণমূল জমানার বদ্ধাবস্থা, ব্যাপক দুর্নীতি, কাটমানি, সিন্ডিকেট, লুটেরারাজের বিরুদ্ধে জনমত একাট্টা করে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। নতুন হাওয়ায় প্রতিশ্রুতির ডালি ভরপুর। শিল্প-বাণিজ্যে বাংলা আবার ‘জগৎসভার শ্রেষ্ট আসন লবে’- স্বপ্ন দেখছে ১০ কোটিরও বেশি বঙ্গবাসী। সরকারের তরফেও বৃহৎ আকারে কল-কারখানা, আইটি হাব, ইন্ড্রাস্ট্রি গড়বার কথা জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। পুঁজিপতিরা যে পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তীতে পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করতে উন্মুখ সে তথ্যও দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী, আশাবাদী মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীও।

সোমবার, নবগঠিত বিজেপি সরকারের বাজেট অধিবেশনে, একপ্রকার কল্পতরুর মতো বিবিধ উন্নয়নের সম্ভাবনায়, বিভিন্ন প্রকল্প, শিল্পায়ন, আর্থ-সামাজিক মানয়োন্নয়ন, নতুন নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ মঞ্জুরির কথা ঘোষণা করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বাজেটের অনান্য বিষয় নিয়ে আরম্ভ-র একাধিক প্রতিবেদনে বিশদে আলোচনা হয়েছে। তাই এখানে আপাতত একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকা যাক। কথায় আছে, ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’ –  ২০০৬-২০০৮ সালের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনীর স্মৃতি এখনো ততখানি ফিকে হয়ে যায়নি, ফলত ‘ডরানো’ অমূলক নয়।  ফলে রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ টানতে বড়ো ধরনের ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করবার আগে, বাম জমানার ‘ভুল’ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে বর্তমান সরকার। ‘জোর করে জমি অধিগ্রহণ’- সুজলা-সুফলা বাংলায় এই শব্দবন্ধের একটা ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ এখনো ক্ষমতার ভিত নড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট, তা হাড়ে মজ্জায় জানেন শুভেন্দু-তাপস। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতার সঙ্গী হয়ে খুব কাছ থেকে তাঁরা দেখেছিলেন বাম জমানার শেষের উত্তাল সেই দিনগুলি। ফলত, এখন তাঁরা অনেক বেশি সাবধানী। জোর করে নয়, আইনের ফাঁকফোঁকর বের করেই, জনমুখী প্রকল্পের প্রলেপ, সমঝোতার স্পর্শেই পশ্চিমবঙ্গে জমি অধিগ্রহণ সম্ভব, একথা তাঁরা ভালোই জানেন।

শিল্প সম্ভাবনায় একপ্রকার চিরায়ত বাংলার জমিজট কাটাতে বাজেট অধিবেশনে বড়ো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে রাজ্য সরকার। বিনিয়োগ আকর্ষণবৃহৎ শিল্প ও পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান সহজ করতে ১৯৭৬ সালের নগর ভূমি (সর্বোচ্চ সীমা ও নিয়ন্ত্রণ) আইন পুনর্বিবেচনার ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমবার বিধানসভায় রাজ্য বাজেট পেশ করতে গিয়ে তিনি জানানউন্নয়নযোগ্য জমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে এ আইন নতুন করে খতিয়ে দেখবে সরকার। অর্থমন্ত্রীর দাবিদেশের বড়ো বড়ো রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্যযেখানে এখনো নগর ভূমি সীমা আইন’-এর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। তাঁর মতে, ‘উন্নয়নযোগ্য জমির ব্যবহার বাড়াতে, বিনিয়োগ টানতে এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে ১৯৭৬ সালের নগর ভূমি (সর্বোচ্চ সীমা ও নিয়ন্ত্রণ) আইন পুনর্বিবেচনা করা দরকার’ তিন আরও জানিয়েছেন, আর্থিক ও পরিচালনগত নানা সমস্যার কারণে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে। সে সব সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতেতাদের কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার।

অর্থমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বহুল বিতর্কিত আরবান ল্যান্ড সিলিং’ আইন। প্রায় পাঁচ দশক আগে সামাজিক ন্যায়বিচার ও জমির সুষম বণ্টনের লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত এ আইনই কি আজ পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বিনিয়োগের পথে অন্যতম প্রধান বাধা নাকি শহরাঞ্চলে জমির অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধে এখনো এ আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন  প্রশ্নই। জরুরি অবস্থার আবহে ১৯৭৬ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার প্রণয়ন করেছিল নগর ভূমি (সর্বোচ্চ সীমা ও নিয়ন্ত্রণ) আইন বা ইউএলসিআরএ। সে সময় দেশের বিভিন্ন শহরে দ্রুত নগরায়ণের ফলে অল্প কয়েক জন ব্যক্তিব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং রিয়েল এস্টেট সংস্থার হাতে বিপুল পরিমাণ জমি জমা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছিল। সরকারের আশঙ্কা ছিলমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জমির দাম লাগামছাড়া হয়ে উঠবে, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে আবাসন।

এ প্রেক্ষাপটেই আইনটির মূল লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। শহরাঞ্চলে জমির মালিকানার উপর সর্বোচ্চ সীমা আরোপঅতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করে তা জনস্বার্থে ব্যবহারসাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলা এবং জমি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও মজুতদারি রোধ চারটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ীদেশের বিভিন্ন শহরকে জনসংখ্যা ও নগরায়ণের মাত্রা অনুযায়ী কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সে ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছিল একজন ব্যক্তি বা সংস্থা সর্বোচ্চ কতটা খালি নগর জমির মালিক হতে পারবেন। শহরভেদে সীমা ছিল সাধারণত ৫০০ থেকে ২,০০০ বর্গমিটারের মধ্যে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত জমিকে উদ্বৃত্ত জমি’ হিসেবে চিহ্নিত করে অধিগ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল সরকারকে।

কাগজে-কলমে আইনটির উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক না কেনবাস্তবে তার প্রয়োগ ঘিরে শুরু থেকেই একাধিক সমস্যা সামনে আসে। জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণজমির পরিমাপআদালতে মামলা-মোকদ্দমামালিকানার জটিলতা এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর আটকে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়উদ্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত জমির উপরে সরকারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দশক কেটে গিয়েছে। সমালোচকদের দাবিআইনটি কার্যকর হওয়ার পর বহু জমির মালিক নানা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে জমি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে ভাগ করে দেন অথবা পৃথক সংস্থা গড়ে মালিকানা ছড়িয়ে দেন। ফলে জমির কেন্দ্রীকরণ রোধের যে লক্ষ্য নিয়ে আইনটি তৈরি হয়েছিলতা পূরণ হয়নি। উল্টে প্রশাসনিক জটিলতা আর দুর্নীতির সুযোগ বেড়েছে।

শিল্পমহলের অভিযোগ ছিল আরও গুরুতর। তাদের মতে, বৃহৎ শিল্প বা পরিকাঠামো প্রকল্প গড়ে তুলতে একসঙ্গে বিস্তীর্ণ ও সংলগ্ন জমির প্রয়োজন হয়। কিন্তু নগর ভূমি সীমা আইনের কারণে সে জমি একত্রিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি পার্কলজিস্টিক হাবশিল্পতালুকবাণিজ্যিক কেন্দ্র কিংবা আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা অন্য রাজ্যের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতেনগর জমির বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বেসরকারি আবাসন ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জমি কেনাবেচার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে ওঠেপ্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে এবং নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে ফ্ল্যাট ও বাড়ির দামের উপরেও।

প্রবল বিতর্কের মুখে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার নগর ভূমি (সর্বোচ্চ সীমা ও নিয়ন্ত্রণ) বাতিল আইন আনে। তবে যেহেতু ভূমি রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়তাই আইনটি প্রত্যাহার করা হবে কি নাসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয় রাজ্যগুলিকে । পরবর্তী সময়ে মহারাষ্ট্রগুজরাতকর্নাটকঅন্ধ্রপ্রদেশতামিলনাড়ু-সহ অধিকাংশ রাজ্য এ আইন বাতিল করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সেই পথে হাঁটেনি। কেন তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের যুক্তি ছিলজমির সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এ আইন এখনো প্রাসঙ্গিক। গ্রামীণ এলাকায় ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও জমির অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করা প্রয়োজন বলে মনে করত তারা। সরকারের আশঙ্কা ছিলআইনটি প্রত্যাহার করা হলে বড়ো বড়ো রিয়েল এস্টেট সংস্থা ও কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে বিপুল পরিমাণ নগর জমি কেন্দ্রীভূত হতে পারেযার ফলে জমির দাম আরও বেড়ে যাবে, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসনের সুযোগ কমে যাবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতেবামফ্রন্টের ভূমি সংস্কার নীতির সঙ্গে এ আইনের আদর্শগত সম্পর্ক ছিল গভীর। জমি যারফসল তার’ নীতির ধারাবাহিকতায় শহরাঞ্চলেও জমির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিল তৎকালীন সরকার। ফলে কেন্দ্রের আইন প্রত্যাহারের সুযোগ থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ সে সিদ্ধান্ত নেয়নি। জমি আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় আসা মমত ব্যানার্জির সরকারও আইন প্রত্যাহারের দিকে যায় নি। শিল্পমহলের একাংশের দাবিবদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূর্ববর্তী দুই সরকারের সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়েছে রাজ্যকে। উদারীকরণের পর দেশের বিভিন্ন রাজ্য যখন শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণে জমি নীতিতে নমনীয়তা আনছিলতখন পশ্চিমবঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতেরাজ্যের শিল্পায়নের গতি বাড়াতে হলে জমির প্রাপ্যতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বৃহৎ উৎপাদন শিল্পইলেকট্রনিক্সগুদামজাতকরণতথ্যপ্রযুক্তি এবং নগর পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একসঙ্গে বৃহৎ জমি পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে দিক থেকে নগর ভূমি সীমা আইন পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত শিল্পমহলে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে, আইন প্রত্যাহারের সম্ভাবনার খবরে, নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশ সতর্ক করে দিচ্ছেন, এ আইন প্রত্যাহার বা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের মতেজমির স্বচ্ছ নথিভুক্তিদ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থাসাশ্রয়ী আবাসন নীতি, সুসংহত নগর পরিকল্পনা ছাড়া শুধুমাত্র আইন বাতিল করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যথায় শহরাঞ্চলে জমির অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও ব্যাপক হারে রিয়েল এস্টেটের থাবা বসানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!