Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুন ২২, ২০২৬

সম্পদের সুষম বণ্টনে জোর: আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন জরিপে ৩১ নতুন সূচকের প্রস্তাব রাষ্ট্রপুঞ্জের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সম্পদের সুষম বণ্টনে জোর: আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন জরিপে ৩১ নতুন সূচকের প্রস্তাব রাষ্ট্রপুঞ্জের

বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশেই অর্থনীতির বিপুলতা বাড়ছে। সংবাদের শিরোনামে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অবিশ্বাস্য অর্থের কথা। কে কোন নম্বরে থাকবে সে সমীকরণ ঘিরেই আমেরিকা-চিন-রাশিয়া-ভারত সহ বিশ্বশক্তিদের যাবতীয় তামঝাম। কিন্তু এ দৌড়ে দেশের সাধারণ মানুষ কি সত্যিই ভালো থাকছে জাতীয় আয়ের পরিমাণ বাড়লেও কি কমছে বৈষম্য উন্নয়নের দৌড়ে এগোতে গিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের কতটা ক্ষতি হচ্ছে বহু দশক ধরে এমন সব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে। এবার সে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির বাইরে উন্নয়ন মাপার জন্য ৩১টি নতুন সূচকের প্রস্তাব দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে গঠিত স্বাধীন হাই-লেভেল এক্সপার্ট গ্রুপ অন বিয়ন্ড জিডিপি’-র তৈরি রিপোর্ট ‘কাউন্টিং হোয়াট কাউন্টস: আ কম্পাস অব প্রোগ্রেস ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট প্রকাশিত হয়েছে গত ৭ মে। ২০২৪ সালে গৃহীত প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এর অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তৈরি এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছেকেবল জিডিপির উপর নির্ভর করে কোনো দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা সম্ভব নয়। কারণঅর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও একই সময়ে বৈষম্যদারিদ্র্যপরিবেশ দূষণ কিংবা সামাজিক অনিরাপত্তা বাড়তে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ভারতের জিডিপি প্রতিবছর বাড়লেও, সাধারণ নাগরিকদের জীবন উন্নয়নের মান নিম্নগামী। রাষ্ট্রের হাত থেকে পুঁজিপতিদের হাতে সম্পদের অধিকাংশ চলে যাওয়া বৈষম্য আরও প্রকট করছে।

বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ দিন ধরেই অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জিডিপি। উৎপাদনবিনিয়োগকর্মসংস্থান ও বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এই সূচকের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতেজিডিপি মানুষের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে আসতে দেয় না। কোনো দেশে আয় ও সম্পদের বণ্টন কতটা ন্যায়সঙ্গতপরিবেশ কতটা সুরক্ষিতস্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান কতটা উন্নতকিংবা নাগরিকরা কতটা নিরাপদএ সবের কোনো প্রতিফলন জিডিপিতে নেই। আলোচ্য রিপোর্ট কমিটির সহ-সভাপতি, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু জানিয়েছেনঅর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অস্বীকার করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং উন্নয়নের সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করা এবং মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসাই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।

রিপোর্ট কমিটির অন্য সহ-সভাপতিটিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ নোরা লুস্টিগের কথায়, ‘জিডিপি বৈষম্য ও দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করে। পরিবেশগত অবক্ষয়ের হিসাব রাখে না। স্বাস্থ্যশিক্ষা কিংবা শান্তির মতো অ-আর্থিক বিষয়গুলিও এর আওতার বাইরে থেকে যায়।’ রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যজিডিপি কখনোই সমাজের সামগ্রিক সাফল্য মাপার জন্য তৈরি হয়নি। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রভাবশালী সূচকে পরিণত হয়েছে এটি। সে কারণেই উন্নয়নের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে নতুন পরিমাপ পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত ড্যাশবোর্ডে চারটি প্রধান ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— বর্তমান কল্যাণসমতা ও অন্তর্ভুক্তিস্থায়িত্ব ও স্থিতিস্থাপকতাএবং মানবাধিকারশান্তি ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক নীতি।

প্রস্তাবিত ৩১টি সূচকের মধ্যে রয়েছে মাথাপিছু পরিবারের ব্যবহারযোগ্য আয়গড় আয়ুশিশুদের পড়াশোনায় দক্ষতাগ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণবাতাসে ক্ষুদ্র কণার ঘনত্বনারীদের বিরুদ্ধে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার হার এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার মাত্রা ইত্যাদি। সূচকগুলির মধ্যে ১৫টি ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রপুঞ্জের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবেদননে বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, একটি দেশের উন্নয়নকে কেবল তার নিজস্ব অর্থনৈতিক সূচকের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। কারণএক দেশের উৎপাদন ও ভোগের প্রভাব অন্য দেশের পরিবেশসম্পদ ও মানুষের জীবনে পড়তে পারে। এই আন্তর্দেশীয় প্রভাব’-এর বিষয়টিকেও নতুন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জিডিপির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭২ সালে ডোনেলা মেডোজের নেতৃত্বে প্রকাশিত দ্য লিমিটস টু গ্রোথ রিপোর্টে প্রথম বার শিল্পসভ্যতার সীমাহীন প্রবৃদ্ধির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সে রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছিলঅনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এরপর, ১৯৮৭ সালে ব্রান্ডটল্যান্ড কমিশন’-এর আওয়ার কমন ফিউচার  রিপর্টে টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। ২০০৯ সালে জোসেফ স্টিগলিটজঅমর্ত্য সেন এবং জঁ-পল ফিতুসির নেতৃত্বাধীন কমিশনও জিডিপির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে কল্যাণ ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।

২০০৯ সালেই পৃথিবী-ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা প্ল্যানেটারি বাউন্ডারিজ’ বা গ্রহগত সীমারেখার ধারণা সামনে আনেন। তাঁদের মতেজীববৈচিত্র্যের ক্ষয়জলবায়ু পরিবর্তনমিঠাজলের সংকট ও প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার মানবসভ্যতাকে  বিপজ্জনক সীমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদে পেশ করা এক রিপোর্টে দাবি করা হয়প্রচলিত জিডিপি-কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির মডেল বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়গত চার বছরে বিশ্বের পাঁচ জন ধনীতম ব্যক্তি তাঁদের সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করলেওপ্রায় ৫০০ কোটি মানুষ আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছেন। তবে প্রস্তাবিত নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণআন্তর্জাতিক ঋণব্যবস্থাসার্বভৌম ঋণের মূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণে জিডিপির ভূমিকা গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে নতুন সূচককে কার্যকর করতে হলে পরিসংখ্যান ব্যবস্থা শক্তিশালী করাতথ্য সংগ্রহের পরিকাঠামো উন্নত করা  দীর্ঘমেয়াদি  রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ প্রক্রিয়ার পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে সদস্য দেশগুলির মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। স্পেন এবং গায়ানা যৌথভাবে এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্ব নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জিডিপির বাইরে নতুন পরিমাপ কাঠামো তৈরির দাবিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন জানিয়েছিল ভারতও। কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের পাশাপাশি ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। তবে প্রশ্ন উঠছেআন্তর্জাতিক মঞ্চে জলবায়ু ন্যায়বিচার  টেকসই উন্নয়নের পক্ষে সরব ভারত দেশের ভিতরে সে লক্ষ্য পূরণে কতটা সফল হবে ? বিশেষত যখন বিগত এক দশকে ভারতে পুঁজি বনাম সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতেসামাজিক অগ্রগতিপরিবেশগত ন্যায়বিচারমানব উন্নয়ন এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ও আস্থা গড়ে তুলতে না পারলে প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় নেতৃত্ব দেওয়া ভারতের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠবে। তবে ভবিষ্যৎ যাই হোক, রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাবিত নয়া উদ্যোগ একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে বিশ্বকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, নতুন করে প্রশ্ন উঠছে উন্নয়ন বলতে আমরা ঠিক কী বুঝব? শুধু অর্থনীতির আকার বড়ো হওয়াকেই কি অগ্রগতি বলা যায়না কি মানুষের সুস্থতাসামাজিক ন্যায়পরিবেশের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ায় মানব সভ্যতার অগ্রগতির আসল সূচক ?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!