Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুন ২২, ২০২৬

‘জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ : সিন্ধু চুক্তি নিয়ে ফের হুঁশিয়ারি পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ : সিন্ধু চুক্তি নিয়ে ফের হুঁশিয়ারি পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

সিন্ধু জলবণ্টনকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এ আবহেই ফের ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, পাকিস্তানের জলনিরাপত্তা বিপন্ন হচ্ছে বলে মনে হলেই দিল্লির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নিতে পারে ইসলামাবাদ।

রবিবার, এক সাক্ষাৎকারে খোয়াজা আসিফ বলেন, ‘জল আমাদের জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। যে মুহূর্তে আমরা অনুভব করব, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, সে মুহূর্তেই আমরা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাব। অবশ্যই যাব।’ পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র জলসঙ্কটের মুখে রয়েছে পাকিস্তান। এ পরিস্থিতিতে সিন্ধু অববাহিকার জলপ্রবাহে যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ তাদের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাঁর অভিযোগ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও দিল্লি জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বা তার গতিপথ পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে পাকিস্তান ‘উপযুক্ত পদক্ষেপ’ করবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, ভারত নদীর জলকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তাঁর দাবি, কেবল সিন্ধু নয়, চেনাব-সহ একাধিক নদীর জলপ্রবাহে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলছে, পাকিস্তানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে না। তবে একই সঙ্গে আসিফ স্বীকার করে নিয়েছেন, গত এক বছরে জলবণ্টন সংক্রান্ত পরিস্থিতির সবিস্তার তথ্য তাঁর কাছে নেই। অতীতে পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা একাধিক পরিদর্শন করলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন বলেও জানিয়েছেন।

খোয়াজা আসিফের নয়া মন্তব্য ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিশেষত, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকেই দু-দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিদের দায়ী করে ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। পহেলগাঁও হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কড়া বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘রক্ত আর জল একসঙ্গে বইতে পারে না।’ তার পর থেকেই সিন্ধু চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি’। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নদীর জল ভাগাভাগির ক্ষেত্রে এ চুক্তিই প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করে এসেছে।  চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলীয় নদী শতদ্রু, বিপাশা ও ইরাবতীর জল ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার ভারতের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদীর জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানেরও অধিকার স্বীকৃত। সিন্ধু অববাহিকার মোট জলের প্রায় ৮০ শতাংশই পাকিস্তানের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জলপ্রবাহে সামান্য পরিবর্তনের আশঙ্কাও ইসলামাবাদের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বমঞ্চে ভারত অবশ্য বারবার জানিয়েছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো বেআইনি পদক্ষেপ নয়, বরং নিজেদের প্রাপ্য জল সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করাই দিল্লির লক্ষ্য। কেন্দ্রের বক্তব্য, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের মদত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ‘সিন্ধু চুক্তি’ স্থগিতই থাকবে। চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক বার অভিযোগ জানিয়েছে পাকিস্তান। রাষ্ট্রপুঞ্জ-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করলেও তাতে বিশেষ ফল মেলেনি। গত সপ্তাহেই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারস্থ হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে সিন্ধু জলচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। এর আগে ইসলামাবাদ দাবি করেছিল, চেনাব নদীর জল অন্যত্র সরিয়ে নিতে ভারত একটি নদী-সংযোগ প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে।

 এ আবহে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাটিলের একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে এমন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যাতে পাকিস্তানের দিকে সিন্ধুর জলপ্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভারতের প্রাপ্য জলের ‘এক ফোঁটাও’ আর দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। পাটিলের মন্তব্যের পরেই খোয়াজা আসিফের যুদ্ধের হুঁশিয়ারিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বর্ষা, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলে পাকিস্তানের জলসঙ্কট ক্রমশ গভীরতর হয়েছে। বিশেষ করে সিন্ধ ও বেলুচিস্তান প্রদেশে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

এ পরিস্থিতিতে সিন্ধুর জল নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত আর শুধুমাত্র কূটনৈতিক বা আইনি বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জলনিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি আর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তা ক্রমশ বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। আর সে কারণেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি গোটা উপমহাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!