Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুন ২২, ২০২৬

হাজার পেরোল ইবোলা সংক্রমণের হার, কঙ্গোয় মৃত ২৫৪ । উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘নিখোঁজ’ সংস্পর্শের শৃঙ্খল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হাজার পেরোল ইবোলা সংক্রমণের হার, কঙ্গোয় মৃত ২৫৪ । উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘নিখোঁজ’ সংস্পর্শের শৃঙ্খল

মধ্য আফ্রিকার অশান্ত ভূখণ্ডে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সঙ্কট । কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা সংক্রমণ ক্রমশ উদ্বেগজনক আকার নিচ্ছে । সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যেই হাজারের গণ্ডি পেরিয়েছে । মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ । এখনো পর্যন্ত ১০০ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও, অন্তত ৩৬৫ জন বিভিন্ন হাসপাতাল ও আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন । স্বাস্থ্যকর্তাদের আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের বাইরেও বহু সংক্রমণের ঘটনা অজানা রয়ে গিয়েছে । ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে ।

গত ১৫ মে কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রক আনুষ্ঠানিক ভাবে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা করেছিল । তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তারও কয়েক সপ্তাহ আগে । সে কারণে প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত বিস্তার নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে উঠেছে । পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে, এখনো পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি এই প্রাদুর্ভাবের ‘পেশেন্ট জিরো’ বা প্রথম সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংখ্যা ঘিরে । ‘আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর মহাপরিচালক ড. জ্যাঁ কাসেয়া জানিয়েছেন, ‘ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথম সংক্রমিত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতেই হবে । কিন্তু আমরা এখনো নিশ্চিত নই, এই সংক্রমণ ঠিক কবে, কোথা থেকে শুরু হয়েছিল । কতজনই বা কোনো না কোনোভাবে আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন ।’

কঙ্গোয় বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলার বিরল বান্ডিবুগিয়ো প্রজাতির ভাইরাস । এ স্ট্রেনের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই । কঙ্গোয় অতীতের অধিকাংশ ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘটেছে জাইর প্রজাতির ভাইরাস, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে । কিন্তু এ বার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন । প্রাথমিক পর্যায়ে বান্ডিবুগিয়ো ভাইরাসের জন্য পরীক্ষাও করা হয়নি, যার ফলে সংক্রমণ শনাক্তকরণে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে । যদিও বর্তমানে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক চিকিৎসা তৈরির কাজ চলছে ।

তবে, ‘আফ্রিকা সিডিসি’-র তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের প্রথম মাসেই এই সংক্রমণ ২০০-র বেশি মানুষের প্রাণ কেড়েছে, যা ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে । সংস্থার মেডিক্যাল এপিডেমিওলজিস্ট ড. ওয়েসাম মানকৌলা জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগেও নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৯৪ । ২০০০ সালে উগান্ডায় হওয়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবের একই পর্যায়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৮১ । সে তুলনায় বর্তমান প্রাদুর্ভাব তিন গুণ বেশি গুরুতর । ‘এএফপি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০২, মৃত্যুহার প্রায় ২৩ শতাংশ । তবে, রবিবার গভীর রাতে কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৪-এ পৌঁছেছে ।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেশজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে কঙ্গোয় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে । পূর্ব কঙ্গোর ৩২টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে । সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে ইতুরি প্রদেশ, যেখানে মোট আক্রান্তের ৯০ শতাংশেরও বেশি নথিভুক্ত হয়েছে । সংক্রমণ ছড়িয়েছে উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশেও । সীমান্ত পেরিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী উগান্ডাতেও পৌঁছে গিয়েছে ভাইরাসের মারণ থাবা । সেখানে ১৯টি নিশ্চিত সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২ জনের । স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, উগান্ডায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ তুলনামূলক ভাবে কার্যকর হয়েছে । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা কঙ্গো থেকে যাওয়া যাত্রী ।

তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’ বা আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজ । কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মাত্র ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সংস্পর্শ অনুসন্ধান সম্ভব হয়েছে । গত সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে চিহ্নিত করা যায়নি । বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০০ জন নিশ্চিত আক্রান্তের ক্ষেত্রে অন্তত ১৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মানুষের নাম সংস্পর্শের তালিকায় থাকার কথা । অথচ এই মুহূর্তে মাত্র ৪ হাজার জনকে শনাক্ত করে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা গিয়েছে । যা মোট সম্ভাব্য সংস্পর্শের ১৫ শতাংশেরও কম বলেই মনে করা হচ্ছে ।

কঙ্গো প্রশাসনের মতে, এই ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’-এ ব্যর্থতার পিছনে রয়েছে পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সঙ্কট এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান । ইতুরি প্রদেশ বহু বছর ধরেই সশস্ত্র সংঘর্ষে জর্জরিত । ইসলামিক স্টেট-সমর্থিত অ্যালায়েড ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সের হামলার জেরে বহু গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না । হামলার ভয়ে মানুষ ক্রমাগত এলাকা বদল করছেন । কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অতিরিক্ত ভিড় থাকা শরণার্থী শিবিরে, কেউ আবার জঙ্গলঘেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরে গিয়েছেন ।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সংঘাতের জেরে ইতুরি প্রদেশে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন । বিশাল বনাঞ্চল, ভগ্নপ্রায় সড়ক পরিকাঠামো, প্রত্যন্ত গ্রাম, নিরাপত্তার অভাব — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে । ফলে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীদার সংস্থার কর্মীরা কার্যকর ভাবে কাজ করতে পারছেন না।তার উপর খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের হাজার হাজার খনি শ্রমিক নিয়মিত এক খনি এলাকা থেকে অন্যত্র যাতায়াত করেন । তাঁদের গতিবিধিও সংক্রমণের শৃঙ্খল চিহ্নিত করা কঠিন করে তুলছে ।

ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কঙ্গোর আর্থিক ও মানবসম্পদের ঘাটতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে । ‘আফ্রিকা সিডিসি’-র হিসাব অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৫৪০ জন প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন । বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৮৪ জন । প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য ৯০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ প্রতিশ্রুত হলেও এখনো পর্যন্ত মাত্র ৯ কোটি ডলার মঞ্জুর হয়েছে । প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে, আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলি দ্রুত বাস্তবায়িত করার জন্য সদস্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে । এ পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দিয়েছে ‘রেড ক্রস’। সংস্থার মতে, ১৫ মে ঘোষিত এই প্রাদুর্ভাব এখনো শিখরে পৌঁছয়নি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে ।

উল্লেখ্য, মধ্য আফ্রিকার দেশটিতে এটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব । কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বারের পরিস্থিতি অতীতের সব অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে । কারণ, একদিকে যেমন কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, অন্যদিকে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, আর্থিক সঙ্কট ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দুর্বলতা একযোগে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে । এদিকে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইবোলা পরিস্থিতির জেরে চতুর্থ ভারত-আফ্রিকা ফোরাম শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে । ২৮ থেকে ৩১ মে সম্মেলনটি হওয়ার কথা থাকলেও জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ভারত এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যে আলোচনার পর তা পিছিয়ে দেওয়া হয় ।

তবে এ সিদ্ধান্ত আফ্রিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকেও সামনে নিয়ে এসেছে । কঙ্গো এবং উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া বান্ডিবুগিয়ো ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা তৈরির লক্ষ্যে ‘সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’, ‘কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস’ এবং ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়’ যৌথ ভাবে কাজ করছে । কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে বহুল ব্যবহৃত চ্যাডঅক্স১ ভ্যাকসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ‘সেরাম ইনস্টিটিউট’ দ্রুত পরীক্ষামূলক টিকার ডোজ তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’-এর জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডোজ’ প্রস্তুত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে ।

কোভিড অতিমারির সময় উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সাশ্রয়ী মূল্যের টিকা সরবরাহে ভারতের যে ভূমিকা ছিল, বর্তমান উদ্যোগকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে । পাশাপাশি খাদ্য সঙ্কট এবং বাস্তুচ্যুতির মুখে থাকা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক মানবিক সহায়তাও ভারত জারি রেখেছে । তবে এ প্রাদুর্ভাব আরও এক বার স্পষ্ট করে দিয়েছে, মহাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আফ্রিকার নিজস্ব জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা এবং টিকা উৎপাদন পরিকাঠামোয় বৃহত্তর বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!